বেড়েছে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের আসবাব

27

গোলাম কবির, ভোলাহাট

একটা সময় ছিল, যখন গৃহস্থালি কাজে বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্রের বিকল্প খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর ছিল। এখন সময়ে বদলেছে। বর্তমান আধুনিক সমাজে এসবের ব্যবহার কমেছে। বেড়েছে প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদাও কমতে বসেছে। নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া গৃহস্থালি কাজে বর্তমানে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। আর তাই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প এখন ধুঁকতে বসেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে একসময় বাঁশশিল্পের সঙ্গে অনেকেই জড়িত ছিলেন। জীবিকা নির্বাহ করতেন বাঁশের তৈরি বানা, চাটাই বুনে। বংশপরম্পরায় চলে এসেছিল এসব পেশা। কিন্তু বাপ-দাদার পেশা বদল করছেন অনেকেই; ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। এর মধ্যেও কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পথ ধরে এই পেশা ধরে রেখেছেন। তবে তাদের জীবনযাপন চলছে অত্যন্ত কষ্টে।
উপজেলার উপর ময়ামারী গ্রাম। এই গ্রামে এক সময় অর্ধশত পরিবার বাঁশের তৈরি চাটাই বোনার পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। এখন হাতেগোনা কয়েকজন পেশাটি ধরে রেখেছেন।
সরেজমিন কথা হয় ওই গ্রামের বাঁশশিল্প কারখানার মালিক মো. আব্দুল্লাহ মিন্টুর সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমার দুটি কারখানা রয়েছে। একটি বাড়ির পাশে। এখানে বানা তৈরি করা হয়। অন্যটি হলিদাগাছীতে। সেখানে চাটাই বোনানো হয়। এই দুই জায়গাতে প্রায় অর্ধশত লোক কাজ করতেন।” তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, “এখন ভোলাহাটে বাঁশ নেই। দিন দিন বাঁশ উজাড় হয়ে যাওয়ায় তা আর পাওয়া যায় না। ফলে কয়েকশ’ কিলোমিটার দূর দিনাজপুর থেকে বাঁশ কিনে আনতে খরচ পড়ে যায়।” বর্তমানে তার দুটি কারখানায় মাত্র ১২ জন কারিগর কাজ করছেন এবং এই ১২ জনের মধ্যে তার কলেজপড়–য়া দুই ছেলেও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মো. আব্দুল্লাহ মিন্টু বলেন, সরকার যদি বাঁশ চাষে উৎসাহিত করেন এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দেন তবে এ শিল্পটি ধরে রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ শিল্পটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, ভোলাহাট উপজেলায় আগে প্রায় ঘরেই চাটাই তৈরি করা হতো। এখন আমি ছাড়া খালেআলমপুরে আরো একজনের কারখানা রয়েছে। তিনি জানান, এখন বাঁশের তৈরি আসবাবপত্রের চাহিদা অনেক কমে গেছে। তাই যে কোনো সময় তার কারখানা বন্ধের আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
চরধরমপুর গ্রামের রেশমচাষি মো. সমুরুদ্দিন জানান, রেশম চাষে চাটাইয়ের দরকার হয়। আগে কম দামে খুব সহজেই পাওয়া যেত চাটাই। কিন্তু এখন আর সহজে পাওয়া যায় না। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে রেশম শিল্পের ওপর। এ শিল্পটি ধরে রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নেয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলার পোল্লাডাঙ্গা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব চাটাই বুনন শিল্পী মো. গরিবুল। তিনি জানান, আগে এই শিল্পের বেশ কদর ছিল। এখন কেউ আর গৃহস্থালি কাজে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করে না। এজন্য এই গ্রামের অনেক বাঁশশিল্পী পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যোগ দিলেও এখনো তিনি বাপ-দাদার এই পেশাটি আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি বলেন, শোবার খাট ও ঘরের তালাই (কোঠা) এবং রেশম পোকার জন্য একসময় বেশ চাটাই ব্যবহার হতো। এখন আর সেটা হয় না। তিনি আরো বলেন, এখন বাঁশের মূল্য অনেক বেশি হলেও এর তৈরি জিনিসপত্রের দাম পাওয়া যায় না। তাই এই পেশায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
বাঁশশিল্পী মো. আব্দুর রহিম বলেন, আজকাল অনেকেই গৃহস্থালির কাজে বাঁশের আসবাবপত্রের স্থানে প্লাস্টিক ব্যবহার করছে। ফলে বাঁশের তৈরি আসবাবপত্রের চাহিদা কমে গেছে। তাছাড়া ভোলাহাটে বাঁশ চাষ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তা পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তাও আবার চড়া দামে কিনতে হয়। একমাত্র সরকারের সদিচ্ছায় পারে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে, জানান তিনি।