বিশেষ সম্পাদকীয় : পিএফটিআই’র পথচলার ১৫ বছর

65

হাসিব হোসেন

সময় এবং নদীর স্রোত কারো জন্যই অপেক্ষা করে না। এই স্রোত তার আপন গতিতেই এগিয়ে চলে। স্রোত যেমন বহমান, মানুষও তেমন তার নিজস্ব গতিতে বহমান বা এগিয়ে চলে। সময়ের গতিতে আমার হৃদস্পন্দন প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটও ১৫ বছর অতিক্রম করে ফেলল। আজ ১৬তম জন্মদিন এই প্রতিষ্ঠানটির। শুভক্ষণে সকলকেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
মানুষ মাত্রই সৃষ্টিশীল একথা সর্বজনবিদিত। প্রায় প্রত্যেকের মধ্যেই সৃষ্টিশীলতার কোনো না কোনো প্রতিভা লুকায়িত থাকে। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগের অভাবে সে সৃষ্টিশীলতা খুব কমই বিকশিত হয়। অথচ সৃষ্টিশীলতা মানুষের মধ্যে চিন্তার উদ্রেক ঘটায়, মনে ভাবের সৃষ্টি করে। এখনো খুঁজলে অনেক শিল্পীই পাওয়া যাবে, যারা নীরবে নিভৃতে তার চর্চাটা নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন; বিকশিত না হয়েই।
আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজধানী শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় অতীতে এখানকার সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গাটা ঠিক সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। অথচ একসময়ের গৌড়ের এই অঞ্চলে অনেক লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। যেগুলো আছে, সেগুলোও হারাবার পথে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকজ সংস্কৃতিকে দেশের শিল্পাঙ্গনে টিকিয়ে রাখতে মনের মধ্যে তাগিদ অনুভব করি, সচেতনতার জায়গা থেকেই। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট’র। যাকে সংক্ষেপে পিএফটিআই হিসেবেও ডাকা হয়।
আজ ১ সেপ্টেম্বর প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ১৬তম জন্মদিন। ২০০৭ সালের এই দিনে পথচলা শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। দেখতে দেখতেই ১৫ বছর অতিক্রম করে ফেলল। অথচ চোখ বন্ধ করলে এখনো মনে হয়, এই তো সেদিন গঠন করা হলো পিএফটিআই। তবে এতটা সময় পাড়ি দেয়া পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। শুরুর দিকে বন্ধুর পথ পেরোতে হয়েছে। কেননা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জায়গায় শিল্পীদের ‘সম্মানি’ দিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন এগিয়ে নেয়া যাওয়াটা ছিল সেই সময়ে দুঃসাহসও বটে। গর্ব এই যে, আমরা পেরেছি। আর এই পারার নেপথ্যে অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে, আজ তাদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে অভিবাদন জানাই।
দেশের বিভিন্ন জেলায় ইস্যুভিত্তিক উন্নয়নমূলক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে উন্নয়ন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে গম্ভীরা, লোকনাট্য, লোকগান ও বিকল্পধারার নাটক প্রদর্শন করে চলেছে পিএফটিআই। অংশ নিয়েছে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে। এ সময়ে আমরা সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছি কিংবা কতটুকু দিতে পেরেছি, তার বিচার সাধারণ মানুষই করবেন। আমি শুধু বলতে পারি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মাধ্যমে আনন্দময় পরিবেশে লোকশিক্ষা প্রদান করার লক্ষেই ফোক থিয়েটারের পথচলা শুরু হয়। লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধারণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, গবেষণা ও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার চেষ্টা ছিল আমাদের। এর অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা সংরক্ষণ করার জন্য ইউনেস্কোর সহায়তায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে আমরা পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩২টি গম্ভীরা দল বাছাই করি। এদের নিয়ে ২০১৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহায়তায় ৩২টি দলের মধ্যে থেকে সেরা ২০টি দল বাছাই করা হয়, যার মধ্যে পিএফটিআইও ছিল।
পরবর্তীতে ২০টি দলকে প্রয়াসের প্রধান কার্যালয়ের নকীব হোসেন মিলনায়তনে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তাদের দিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে ও ঢাকায় গম্ভীরা পরিবেশন করা হয়। ইউনেস্কোর সহায়তায় “বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গম্ভীরা” বিষয়ক বই প্রকাশ করা হয়। গম্ভীরা বিষয়ক এসব ডকুমেন্টেশন নিয়ে ইউনেস্কোর প্রধান কার্যালয় প্যারিসে সরকার ও সকলের সহায়তা নিয়ে আমরা আবেদন জানাতে চাই গম্ভীরাকে ওয়ার্ল্ড কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করার। এটি করতে পারলে যা হবে আমাদের অনেক সম্মানের ও গর্বের।
আমি বলব, পুরোপুরি সফল না হলেও আমরা ঝিমিয়ে যাইনি; আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এভাবেই আগামীতে আমাদের প্রয়াস বা চেষ্টা সফলতা পাবে। কেননা পিএফটিআই’র টিম মেধা ও সফলতার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনের দিকে ছুটে চলছে।

হাসিব হোসেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট