বিমানকে ঢেলে সাজানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে

132

7286495_f1024বাংলাদেশ বিমানের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। সেজন্য বিমানে কর্মরত প্রত্যেকের বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সংস্থাটির সব শ্রেণীর চাকরি অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। তাছাড়া বিমানের সব কাজ নিবিড়ভাবে তদারক করচে টাস্কফোর্স। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই টাস্কফোর্স গঠন করবে। বিমানের এসব উদ্যোগের বিষয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী তাতে সায় দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে ওসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে নির্দেশ দিয়ে চিঠি দিয়েছে। বাংলাদেশ বিমান সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশ বিমানকে ঢেলে সাজানোর জন্য নানা সময় নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন বিমানকে কোম্পানি করা হয় তখনো তৎকালীন সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদনের আলোকেই বিমানে সংস্কার করা হয়। জনবল প্রায় ছয় হাজার থেকে নামিয়ে আনা হয় তিন হাজার ৪০০ জনে। এবারও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি বিমানে সংস্কারের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সেই প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করা হবে। আর প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত সারসংক্ষেপেই রয়েছে কাদের সমন্বয়ে ওই কমিটি করা হবে। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মহাপরিচালক থাকবেন, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই, এনএসআই, কাস্টমস (শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর), বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিমানের ওপর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারপরও মন্ত্রণালয়কে বিমানের জন্য সর্বত্র জবাবদিহি করতে হয়। এখন টাস্কফোর্স গঠন করা হলে মন্ত্রণালয়ের হাতে বিমানের নিয়ন্ত্রণ আবার কিছুটা ফিরে আসবে। তবে টাস্কফোর্সের পরও ঝামেলা থেকেই যাবে। যদি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীকে বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা না হয়। কারণ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিলের হাতে বিমানের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পরে তাঁর হাতে বিমানের নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়। তারপরই মাহবুব জামিল বিমানের জন্য অত্যাধুনিক ১০টি এয়ারক্রাফট কেনার জন্য বোয়িং কম্পানির সাথে চুক্তি করতে পেরেছেন। বিমানের এয়ারক্রাফট কেনার ক্ষেত্রে ওই চুক্তিই একমাত্র চুক্তি যা কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেনি।
সূত্র আরো জানায়, সরকার বাংলাদেশ বিমানকে অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিস ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তাতে সংস্থাটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এখন অনেকেই ওভারটাইম না করেও বিল নিয়ে যাচ্ছে। অফিসে না থেকেও হাজিরা দিয়ে চলেছে। কথায় কথায় ধর্মঘট ডেকে বিমানবন্দর অচল করে দেয়। ওসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আসবে। বিমানের দৈনন্দিন কাজে যে অব্যবস্থাপনা তওা দূর করার জন্য এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা করা হচ্ছে। তাছাড়া সোনা চোরাচালানের সাথে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা, সিবিএ নেতারাসহ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নেতিবাচক কর্মকা-ের বিষয় বিবেচনা করেই এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা করা হচ্ছে। মূলত বিগত ২৭ নভেম্বর হাঙ্গেরী যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ার পরই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনেও বিষয়টি মনুষ্যসৃষ্ট বলে চিহ্নিত করা হয়। আর তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতেই কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশ বিমানের অনেক সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে। কারণ বিমানকে এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন থেকে আলোচনা হচ্ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না। এবার ওই দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সবাই নড়েচড়ে বসায় সমস্যা সমাধানের পথ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ত্রুটি মনুষ্যসৃষ্ট তা তিনটি তদন্ত প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়। ওসব প্রতিবেদনের মতামতের আলোকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চার দফা সুপারিশ করে। সব সুপারিশই প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। ওসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে বিমানের সব কাজ নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে টাস্কফোর্স গঠন, বিমানের সব শ্রেণীর চাকরি অত্যাবশ্যকীয় বা এসেনশিয়াল সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করা, বিমানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করা এবং বিমানের সংস্কার ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা।
এদিকে বর্তমানে বিমানের ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী পুলিশি রিমান্ডে রয়েছে। পাশাপাশি চলছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিমানের সব শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ কার্যক্রম। বিমানের জন্য এমন সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিমানে চাকরি করে নানা অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিমানে এমন কর্মকর্তা-কর্মচারী পাওয়া মুশকিল যাদের রাজধানীতে বা বড় শহরগুলোতে অঢেল সম্পত্তি নেই। আর কর্মকর্তাদের প্রায় সবারই বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে থেকে পড়ালেখা করে। তাদের সম্পদ নিয়ে কখনো তদন্ত হয় না। তাছাড়া বিভিন্ন ঘটনা ঘটলে সেসব ঘটনার তদন্ত হয় তার প্রতিবেদনে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার খুব বেশি উপাদান রাখা হয় না। এবার সবার গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হলে সবার থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন যেন নিরপেক্ষভাবে করা হয়। তা নাহলে হয়রানির অভিযোগ উঠবে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিইও এএম মুসাদ্দিক আহমেদ জানান, আমি এখনো চিঠিটি পড়িনি।
একই বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জানান, তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ওসব প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে প্রধানমন্ত্রীকে বিমানে কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে টাস্কফোর্স গঠন ও এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণার বিষয়টিও রয়েছে।