বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার

69

indexবাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রীসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিফলন দেখা গেলেও পারিবারিক ক্ষেত্রে তা অনেক পিছিয়ে আছে। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই জীবনের কোনো না কোন পর্যাযে নিজের স্বামীর মাধ্যমে অথবা অন্য কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক, যৌন কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইন্সট উইম্যান-২০১৫’ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্যই উঠে এসেছে। ২০১১ সালে দেশে বিবাহিত নারীদের ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এ হিসাবে চার বছরে বিবাহিত নারীদের ওপর নির্যাতন কমেছে। তবে নির্যাতনের কথা কাউকে জানায়নি এ রকম নারী রয়েছে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ। বিবিএস বলছে, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে তারা দেখেছে, বিবাহিত নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন কমে এলেও শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। সমাজে সম্মানহানি ও হেয় হওয়া থেকে রক্ষা পেতে তারা আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। নির্যাতনের পর বেশির ভাগ নারীই মামলা করেনি। এতে করে শারীরিক নির্যাতন আরো বাড়ছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অবিবাহিত নারীদের ওপরও নির্যাতন বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ শতাংশ নারী জানিয়েছে, তারা পরিবার থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২৭ শতাংশ স্ত্রীর দাবি, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার। ১১ শতাংশ স্ত্রী বলেছে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, কনট্রোলিং বা নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্তৃত্ব করেছে স্বামী। বিবিএস বলেছে, গ্রামে নারী নির্যাতনের হার বেশি। গ্রামাঞ্চলে ৭৫ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়।বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রংপুর ও খুলনা বিভাগে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন বেশি হচ্ছে। এই দুই অঞ্চলের ৩৪ শতাংশ নারী বলেছে, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আর ৬০ শতাংশ বলেছে শারীরিক নির্যাতনের কথা। সিলেট অঞ্চলে যৌন নির্যাতনের হার তুলনামূলক কমÑ২০ শতাংশ। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রীর ওপর স্বামীরা নির্যাতন করেন আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীরা নির্যাতনে শিকার হওয়ার কথা বলেছেন সবচেয়ে বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া গ্রামের বিবাহিত নারীদের ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। শহরে এই হার ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ; আর জাতীয় পর্যায়ে ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক নির্যাতনের ক্ষেত্রেও জাতীয় ও গ্রামীণ চিত্র প্রায় অভিন্ন। গ্রামের ১২ শতাংশ বিবাহিত নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। শহরে এই হার ১০ দশকি ২ শতাংশ; জাতীয় পর্যায়ে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, স্বামী ও স্ত্রী শিক্ষিত হলে নির্যাতন করার প্রবণতা এবং নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা কম ঘটেছে। জরিপে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৫- এই চার বছরে বিবাহিত নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন কমলেও শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। ২০১৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, সারাজীবনে কখনও না কখনও ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিবাহিত নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা ২০১১ সালে ছিল ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এই সময়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৭ দশমিক ২ শতাংশ বিবাহিত নারী, যা ২০১১ সালে ছিল ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ। জরিপে বলা হয়, যে কোনো ধরনের ইমোশনাল নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী, যা ২০১১ সালে ছিল ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫ সালের ১২ মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বিবাহিত ২০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ইমোশনাল নির্যাতন ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থনৈতিক নির্যাতন ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বামী ছাড়া অন্য যে কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সারা জীবনে যে কোনো সময় ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। অন্য কোনো পুরুষের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ দশমিক ৯ শতাংশ, গর্ভাবস্থায় এবং বাচ্চা প্রসবের চার সপ্তাহের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ নারী এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ দশমিক ১২ শতাংশ নারী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এমন উত্তরদাতার হার ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী। উপার্জনের টাকা স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারেন এমন নারীর শতকরা হার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। নির্যাতনের পর আইনি সহায়তা নিয়েছিলেন ২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। নারী নেত্রীরা বলছেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী  নির্যাতন কমছে না। এখন পর্যন্ত দেশে একটি দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয়নি যে পুরুষরা স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করার পর বড় ধরনের শাস্তি পেয়েছে। যত দিন অপরাধীদের শাস্তি না হবে, তত দিন নারী নির্যাতন চলতেই থাকবে বলে মনে করেন তাঁরা। এ প্রসঙ্গে মহিলা আইনজীবী সমিতির নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী সালমা আলী বলেন, নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। পুরুষের হাতে আছে অর্থনৈতিক শক্তি। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষরা স্ত্রীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আসছে এবং পরিবারের প্রধান কর্তা হিসেবে ভেবে আসছে। এসব কারণে নারী নির্যাতন কমছে না, বরং বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন আছে। তাতে পারিবারিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সে আইনের কোনো বাস্তবায়ন নেই। উল্লেখ্য, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপেও দেখা গেছে, দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি করা ওই জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ব্র্যাকের তথ্য মতে, নারীর প্রতি সহিংস ঘটনার ৬৮ শতাংশই নথিভুক্ত হয় না। একারণে সম্পূর্ণ বাস্তব চিত্রটি সামনে আসছে না।