বিপুল সংখ্যক অচল বাস নিয়ে বিপাকে বিআরটিসি

88

gourbangla logo

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি) বিপুলসংখ্যক অচল বাস নিয়ে বিপাকে পড়েছে। আর্থিক সংকটে এসব অচল বাস মেরামতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। অচল বিআরটিসির বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে সাধারণ বাস, ডাবল ডেকার, আর্টিকুলেটেড ও এসি বাস। রাজধানীর পরিবহন সমস্যা কমাতে সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যে ২০১০ সাল থেকে কয়েক দফায় প্রায় এক হাজার বাস কিনে বিআরটিসি। বিআরটিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করে ১০ থেকে ১৫ বছরের যাত্রী সেবা নিশ্চিত করতে চীন, ভারত ও কোরিয়া থেকে বিআরটিসির বাস সংগ্রহ করে। কিন্তু ৪-৫ বছরের মধ্যেই অধিকাংশ বাস নষ্ট হয়ে বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে পড়ে রয়েছে। পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যে কোরিয়া সরকারের ঋণে ২০১১ সালে ২৫৫টি বাস ক্রয় করে বিআরটিসি। এর মধ্যে ১০০টি এসি ও ১৫৫টি নন-এসি। তাতে খরচ হয় প্রায় ২৪৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৪০টি বাস বিকল হয়ে পড়েছে। বাকিগুলোও চলছে নানা সমস্যা নিয়ে। তাছাড়া হরতাল-অবরোধসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অসংখ্য বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়ে আছে।
সূত্র জানায়, প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণে (এলওসি) ২০১৩ সালে কেনা হয় ২৯০টি দ্বিতল, ৫০টি আর্টিকুলেটেড (দুই বগির জোড়া লাগানো) ও ৮৮টি এসি বাস। গতবছর এসব বাসের ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়। ইতিমধ্যে বিকল হয়ে পড়েছে ২২টি বাস। তার মধ্যে ডাবল ডেকার বিকল হয়েছে ১৪টি, এসি বাস ৫টি ও আর্টিকুলেটেড ৩টি। এসব বাস নারায়ণগঞ্জ, মতিঝিল, মিরপুর, জোয়ারসাহারা ডিপোতে রয়েছে। আর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালীর সোনাপুর, নরসিংদী, বগুড়া ও রংপুরে ডিপোতেও রয়েছে বেশ কিছু অচল বাস। কোরিয়া ও ভারত থেকে কেনা বেশির ভাগ বাসই বিকল হয়েছে গত এক বছরে। এগুলোর সঙ্গে কেনা খুচরা যন্ত্রাংশ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আর বাস মেরামত করা যাচ্ছে না। আর ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ায় ভারতের অশোক লেল্যান্ড কোম্পানিও এগুলো মেরামত করে দিচ্ছে না। ফলে বাসগুলো বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে এসব বাস ক্রমেই কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে বিআরটিসির যেসব বাস চলাচল করছে সেগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক। বিআরটিসির প্রায় সব দ্বিতল ও আর্টিকুলেটেড বাসেরই পাখা নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া দ্বিতল বাসগুলোর কয়েকটির চেয়ার ভেঙে গেছে। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ না থাকায় মেরামত করা যাচ্ছে না। আর এগুলো মেরামতের পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ আরো নতুন ২০০টি দ্বিতল ও ১০০টি আর্টিকুলেটেড বাস কেনার চেষ্টা করছে।
এদিকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের আমলে চীন থেকে কেনা ২৭৫টি বাসের মধ্যে ১১৫টি বাসই সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। এজন্য নরওয়ে থেকে ৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়। আর সরকারের অর্থায়ন ছিল ২৭ কোটি টাকা। চীন থেকে কেনা এসব বাস ছিল নিম্নমানের। ফলে অধিকাংশ বাস এখন অচল। বাসগুলো কিনে বড় অঙ্কের অর্থ অপচয় হয়েছে সরকারের। অথচ ১০ থেকে ১৫ বছর নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়া যাবে এমন শর্তেই নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (এনডিএফ) ঋণের টাকায় এসব বাস চীন থেকে কেনা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণদানকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের ঋণের টাকায় কেনা বাসগুলো পরিদর্শনে আসার ঘোষণা দিয়েছে এনডিএফ।
অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যে বিআরটিসি সিএনজিচালিত বাস কিনতে এনডিএফ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ১’শ বাস ইউরোপ থেকে কেনার শর্ত জুড়ে দেয়। কিন্তু ইউরোপের বাসের দাম বেশি হওয়ায় নির্ধারিত ঋণে ৯০টি বাস সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়া যায়। এ অবস্থায় বিআরটিসি শর্ত পরিবর্তন করে চীনকেও দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। তারপর চীনের ডংফেং ইয়াংস্টেজ মোটরস কোম্পানি লিমিটেড গাড়ি সরবরাহ বি আরটিসিকে অস্বাভাবিক কম দর প্রস্তাব করে। পরে ২০১০ সালে ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় চীন থেকে ২৭৫টি বাস কেনা হয়। ১৯৮৯ সালে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনের সমন্বয়ে এনডিএফ গঠিত হয়। এ সংস্থাটি মূলত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে।
তাছাড়া এর আগে ২০০২ সালে সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) আর্থিক সহায়তায় সুইডেন থেকে ৫০টি ভলভো বাস আমদানি করে চার দলীয় জোট সরকার। প্রতিটি বাস এক কোটি তিন লাখ টাকায় ক্রয় করা হয়। ১৫ বছর যাত্রী সেবা দেয়ার কথা থাকলেও ৮ বছরেরই সবগুলো বাসের জায়গা হয়েছে বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া বাসগুলো মেরামতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথমদিকে প্রায় তিন মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিআরটিসির আয় অনেক কমে গেছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধই কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ পাওয়া গেলে বাসগুলো মেরামতে কিছু অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে বিআরটিসির কিছু বাস অনেক পুরনো ও অকেজো হয়ে পড়েছে। সেগুলো প্রতিস্থাপনে নতুন বাস কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে।