বিচারক নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

132

supreme-court-of-bangladeshবিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। রিটে আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, স্পিকার ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে রিটের বিষয়ে শুনানি হতে পারে। মো. ইউনুছ আলী আকন্দ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় আনা চতুর্থ সংশোধনী এবং ২০১১ সালে শেখ হাসিনার সময়ে করা পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৫ এর ১ ও ২ এর বি এবং ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন। বর্তমান সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও যোগ্যতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ৯৫ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ করবেন। আর ৯৫ এর ২ (বি) ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নূন্যতম দশ বছর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে দায়িত্ব পালন না করলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্য হওয়া যাবে না। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে। এসব ধারা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে রুল চেয়েছেন ইউনুছ আলী। স্পিকার, আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে এতে বিবাদী করা হয়েছে। রিট আবেদন জমা দেওয়ার পর ইউনুছ আলী সাংবাদিকদের বলেন, রোববার এ আবেদনের ওপর শুনানির চেষ্টা করব। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে ৩১ অক্টোবর এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি ১১৬ অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগরে ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি এবং শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে এককভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বৈত শাসনের ফলে বহু জেলায় শূন্য পদে সময়মত বিচারক নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিচার কাজে বিঘœ ঘটে এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা ছিল, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরের বিধান আর ফেরেনি; অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই থেকে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃপ্রবর্তন করা ‘সময়ের দাবি’ বলে মত দেন প্রধান বিচারপতি। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পরদিন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রস্তাব ‘স্ববিরোধী’ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ বদলানোর ‘দরকার নেই’। এর ব্যাখ্যায় উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের বিষয়ে বাহত্তরের সংবিধানের বিধান ফিরিয়ে আনার পর হাই কোর্টের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সামনে আনেন আইনমন্ত্রী। ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি রিট আবেদনে চলতি বছরের ৫ মে হাই কোর্ট ওই সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করে। বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে আছে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন। আনিসুল হক বলেন, একদিকে বলা হচ্ছে ওইটা (৯৬ অনুচ্ছেদ) হিস্টরিক্যাল মিসটেক। আবার বলা হচ্ছে ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরে যা আছে তাতে ফিরে যেতে হবে। এটা তো স্ববিরোধী কথা!