বাবু বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ : চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংস্কৃতি জগতের বিস্ময়কর কিংবদন্তি

11

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বীরেন ঘোষ একজন কিংবদন্তি বলা যায়। লোকসংগীতের কিংবদন্তি এজন্যই তাকে বলা হয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের হাতেখড়ি আলকাপ গান দিয়েই। আলকাপ গানের ছোকরা হিসেবে তার প্রথম আবির্ভাব হয়। তার গায়ের রং এবং শারীরিক গঠন ছিল খুবই চমৎকার, যা আলকাপ গানের ছোকরা হিসেবে তাকে বেশ মানিয়ে যেত। তিনি অনেকের কাছ থেকেই আলকাপ গানের দীক্ষা নিয়েছিলেন। তবে তার সরাসরি আলকাপ গানের শিক্ষক ছিলেন খোশ মোহাম্মদ। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা এলাকার মানুষ। আলকাপের ছোকরা থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় এবং বলা যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেতে থাকেন। তিনি জ্ঞানী-গুণী শিল্পীদের ভালোবাসা এবং অফারের সহযোগিতা পেয়েছেন। এই সহযোগিতাই তাকে একজন গুণী শিল্পী হিসেবে তৈরি করতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল।
আলকাপ গানে খেমটা লাগে। এই খেমটা গানের প্রয়োজনেই বাবু বীরেন ঘোষকে গান শিখতে হয়। তবে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে তাকে কখনো গান শিখতে হয়নি। আবার হারমোনিয়ামের জন্যও কোনো দীক্ষা তিনি নেননি। তারপরও তাকে হারমোনিয়ামের মাস্টারপিস বলা হতো। কারণ হারমোনিয়াম বাজানোর সময় হারমোনিয়ামের রিডের যে শব্দ হয়, সে শব্দ তিনি যখন বাজাতেন তা কখনোই পাওয়া যেত না। তিনি মসৃণভাবে এবং রিডের শব্দ ছাড়াই হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন। হারমোনিয়ামে তার দক্ষতা এরকম পর্যায়ে ছিল। তার গানের নেশা ছিল। তিনি যখন আলকাপ গানের ছোকরা হিসেবে অভিনয় করা শুরু করেন, তখন তার বয়স মাত্র বার-তের বছর।
বাবু বিধান ঘোষ তবলা শিখেছেন বিশিষ্ট তবলাবাদক সামসুদ্দিন আহমেদ শোভা স্বর্ণকারের কাছ থেকে। ওস্তাদ আব্দুল আজিজ ছিলেন তার সরাসরি প্রশিক্ষক। তাদের সাহচার্য পেয়েছেন খুব ছোট থেকেই। যার ফলে তার জগৎটা শুধু আলকাপ আর খেমটা গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পুরনো হিন্দি, ভোজপুরি এবং উর্দু গানের ক্লাসিক্যালে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি এসব ক্লাসিক্যাল ব্যাকরণগতভাবে শেখেননি, নিজে নিজেই শিখেছেন; চর্চা করেছেন। এবং একপর্যায়ে এসে দেখা গেল যে, তিনি গান করতেন তার কোনো সময় ছিল না। তিনি নেশার মতো গান করতেন। শহীদ সাটু হলের পাশে যে ললিতকলা একাডেমি ছিল সেখানে তিনি সন্ধ্যের সময় বসে রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত গান করতেন। তার কোনো গানের খাতা ছিল না। তিনি গান লিখে রাখতেন না। বা লেখার প্রয়োজন হতো না। তিনি তার স্মৃতি দিয়েই গান গেয়ে যেতেন নির্ভুলভাবে। একটা গান দুই-তিনবার শোনার পর তিনি নির্ভুলভাবেই গাইতে পারতেন। তিনি অল্পশিক্ষিত ছিলেন। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু তার মেধা এবং স্মৃতিশক্তি ছিল অবিস্মরণীয়।
আলকাপ গান তার কাছে এক ধরনের নেশার মতো ছিল। তিনি একাধারে আলকাপের ছোকরার অভিনয় করতেন। আবার যখন প্রয়োজন হতো তখন তিনি হারমোনিয়ামও বাজাতেন। একজন মানুষ একাধারে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন, আবার ছোকরার অভিনয় করছেন। কি অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। আলকাপ গানে তার এতই নেশা ছিল যে, একবার তিনি বাড়িতে কিছু না বলেই আলকাপ গান গাইতে চলে গেছেন। দুই দিন কোনো খবর নেই। বাড়িতে তার চাল-তরকারিও নেই। তার স্ত্রী ক্ষুধার্ত সন্তান নিয়ে দিন যাপন করছিলেন অতিকষ্টে। বীরেন পেশায় সাধারণ একজন ঘোষ ছিলেন। অর্থাৎ দুধ বিক্রি করে তার সংসার চলত।
তিন দিন পর তার ওস্তাদ খোশ মোহাম্মদ তার বাড়িতে এসে বীরেন ঘোষের খবর জানতে চান। তার স্ত্রী জানান যে, তিন দিন থেকে বীরেন ঘোষ নিখোঁজ। তার স্ত্রী তাকে এও জানান যে, বাড়িতে রান্না করার মতো চাল বা তরকারি নেই। আবার ওদিকে ওস্তাদ খোশ মোহাম্মদের পকেটেও টাকা নেই। তখন খোশ মোহাম্মদ বীরেন ঘোষের স্ত্রীর কাছ থেকে বীরেন ঘোষের ছাতাটি চেয়ে নেন। এরপর সেই ছাতা বিক্রি করে খোশ মোহাম্মদ বীরেন ঘোষের স্ত্রী-সন্তানের জন্য চাল, কিছু তরকারি, কিছু ডাল কিনে দিয়ে যান। এভাবেই চলত বীরেন ঘোষের সংসার।
এ ঘটনার দুই তিন দিন পর বীরেন ঘোষ আলকাপ শেষ করে বাড়িতে ফেরেন। বউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার উত্তর দিতেন না, মাথা নিচু করে থাকতেন। পরে একদিন বীরেন ঘোষ তার স্ত্রীর কাছে ছাতা চাইতে গেলে তার স্ত্রী জানায়, তার ছাতাটা খোশ মোহাম্মদ নিয়েছেন এবং জানতে পারেন, ওই ছাতা বিক্রি করেই খোশ মোহাম্মদ তার পরিবারের জন্য চাল-ডাল কিনে দিয়ে গেছেন।
বীরেন ঘোষের কণ্ঠের লেভেল এত উপরে ছিল যে, হারমোনিয়ামের উপরে লেভেলের দুই তিনটা আঙ্গুল দিতে হতো, সেখানে রিড নাই। এত হাই লেভেলের ছিল যে, মানুষ অবাক হয়ে যেত। তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি অনায়াসে মেয়ে কণ্ঠ করতে পারতেন। রকিবউদ্দিন এবং কুতুবুল আলম যখন গম্ভীরা করতেন, সেই সময়ে গানের মাঝে একটা উচ্চ লেভেলের মেয়ে কণ্ঠ ভেসে আসত। সবাই অবাক হয়ে যেত, এই মেয়ে কণ্ঠটা কার! সেটা ছিল বীরেন ঘোষেরই কণ্ঠ। আলকাপে তিনি ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনবদ্য এক গায়ক। এছাড়াও তিনি ছিলেন মজলিসী গায়ক। তিনি মজলিস জমাতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কারো বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে একাই সেই বাড়ির অনুষ্ঠান গানের মাধ্যমে সংলাপের মাধ্যমে জমিয়ে রাখতেন।
স্বাধীনতার পর উত্তরায়ন সংগীত একাডেমির সাথে তিনি গান পরিবেশন করতেন এবং সেখানে ওস্তাদ শম্ভুনাথের সাহচর্য পেয়েছিলেন। সেখানে তারা সারারাত ধরে সংগীত চর্চা করতেন। এখানে এমন মজলিস বসত যে বীরেন ঘোষ গান করতেন, ওস্তাদ শম্ভু তবলা বাজাতেন আর সবাই শুনতে আসতেন। যখন মনে হতো এবং চলে যেত; আর বীরেন ঘোষ গান গেয়ে যেতেন। সাধারণভাবে যারা তবলার টিউনিং করে তারা হারমোনিয়ামের উপরে সা-ধরে টিউনিং করে থাকে। কিন্তু বীরেন ঘোষ কখনোই এটা করতেন না। তিনি শুধু জানতে চাইতেন কিসে দেব? কেউ হয়তোবা বলেছে ‘ড’-এ দেন। তিনি আঙ্গুল দিয়ে একটা বাড়ি দিয়ে দিতেন। এরপর তিনি টিউনিং ঠিক করে দিতেন। মাঝে আর হারমোনিয়াম বাজানোর প্রয়োজন হতো না। তিনি এতটাই হারমোনিয়াম এবং তবলার ব্যাপারে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলেন। যে কোনো স্কেল ঠিক করতে বললে তিনি এভাবেই ঠিক করতেন।
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু যখন নাটোরে আসলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে তখন সাংস্কৃতিক টিম সেখানে যাবে। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গম্ভীরা টিম ঠিক করা হলো। সেসময় অভিনয়ের জন্য ঠিক করা হলো যেহেতু অভিনয় করেন কুতুবুল আলম, তখন পর্যন্ত তার সিনেমায় অভিনয় এবং নাটকে অভিনয় করা হয়ে গেছে; যেহেতু কুতুবুল আলম নাটক করেন তাই কুতুবুল আলমকে নানা হিসেবে ঠিক করা হলো। আর কুতুবুল আলমের কথাবার্তাই ছিল একটু ব্যঙ্গাত্মক। আর গভীর রাতে যেহেতু একটু ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তা দরকার সেহেতু সেই হিসেবে কুতুবুল আলম ছিল সব থেকে ফিট। আর নাতি কে হবে? রকিবুদ্দিন ছিলেন পাতলা এবং ছোটখাটো মানুষ। তাকে নাতির অভিনয় করার অফার দেয়ার সাথে সাথেই তিনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই কুতুবুল আলম এবং রকিবউদ্দীন গম্ভীরা টিমের নানা-নাতি হয়ে গেলেন। গম্ভীরার কথা লিখতেন মোহিত কুমার দা। সেসময় মূলত সোলেমান মুকতার গান লিখতেন। মূল স্ট্রাকচার তৈরি করেছিলেন সোলেমান মুকতার আর বাকি কাজগুলো করেছিলেন মোহিত কুমার দা।
গম্ভীরার মূল বিষয় হারমোনিয়াম এবং তবলা। সে সময় যেসব সিনিয়র গায়ক ছিলেন বা সংস্কৃতির সংগঠক ছিলেন তাদের সবার একই কথা ছিল, হারমোনিয়াম বাজাবে বীরেন ঘোষ। জুড়ি বাজিয়েছিলেন মিস্ত্রীপাড়ার সনৎ কুমার, দোহার বাজিয়েছিলেন শিবতলার ফোটকাবাবু। গম্ভীরার নতুন ফরম দেয়ার জন্য অর্থাৎ সুফি মাস্টার যে আদলে গম্ভীরা করতেন সে আদলকে একটু আধুনিক করার জন্য নাতিকে একটু রসের গান গাইতে হবে এইটা সংযোজন করা হলো। কিন্তু সেই গান কে গাইবে বা সুর কে করবে? এই নতুন গান এবং নতুন সুরের দায়িত্ব দেয়া হলো বীরেন ঘোষকে। তিনি “ওহে নানা হোইসন্যা কানা কথা শুনিস ন্যা”, “ডাকিস ন্যা কোকিল রে” গান দুটো সিলেক্ট করে দিলেন। এছাড়াও তিনি গম্ভীরার জন্য খেমটা গান তৈরি করতেন। এসব গানগুলো মূলত খেমটা গানের সুরে এবং আলকাপ গানের সুরে থাকত। কিন্তু রকিব উদ্দিন তো খেমটা গানের সুরে গান করতে পারতেন না। তাই সে সুরকে রকিবউদ্দিনের উপযোগী করে দিতেন বীরেন ঘোষ নিজেই।
বীরেন ঘোষ এতই মেধার অধিকারী ছিলেন যে, তিনি যে কোনো গানকে যে কোনো সুরে গাইতে পারতেন এবং উপস্থাপন করতে পারতেন। সুর তৈরি করার বিশাল এক ক্ষমতা ছিল তার। যে কোনো সময় যে কোনো গানকে যে কোনো সুরে তিনি রূপান্তরিত করতে পারতেন এবং গাইতে পারতেন। এবং তিনি নিজে সুর করে স্টেজে গানও করেছেন।
শিল্পকলার উদ্যোগে হরিমোহন স্কুলের অডিটোরিয়ামে একবার রবীন্দ্র এবং নজরুলজয়ন্তী উৎসব একসাথে পালন করা হচ্ছিল। সাধারণত এইসব প্রোগ্রামে দর্শক খুব কমই হয়। যার কারণে ঘণ্টাখানেক নজরুল এবং রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রোগ্রাম হবার পরেই তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ডক্টর জাফর আহমেদ খান বলেন যে, আমরা এখন রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীর ব্যানারটা সরিয়ে দিয়ে আরো ঘণ্টাখানেক বাবু বীরেন ঘোষের গান শুনি।
বীরেন ঘোষ অনায়াসে নজরুল সংগীত, লোকসংগীত এবং আধুনিক গান গাইতে পারতেন। বাবুকে স্টেজে উঠিয়ে দেয়া হলো। তিনি গান গেয়ে যাচ্ছেন। মুগ্ধ শ্রোতা তন্ময় হয়ে বাবু বীরেন ঘোষের গান শুনছেন দুই ঘণ্টা ধরে। এ ধরনের এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক মেধার অধিকারী ছিলেন বাবু বীরেন ঘোষ। অন্য একটা গানের সুরকে তিনি আরেকটা গানের সুরের সাথে বেঁধে দিতে পারতেন বা যে কোনো গানের মিউজিকের সাথে যে কোনো গানকে সেই মিউজিক দ্বারাই গাইতে পারতেন। কুতুবুল আলম এবং রকিবউদ্দিনের পরেই গম্ভীরার জগতে দল পরিচিতি লাভ করে বীরেন ঘোষ এবং মাহবুবুল আলমের।
আলকাপের আসর বসলেও তিনি পূর্ব থেকে কোনো প্রস্তুতি নিতেন না বা তার পূর্ব থেকে কোনো প্রস্তুতি প্রয়োজন হতো না। তিনি তাৎক্ষণিক নির্ধারিত যে কোনো বিষয়-আশয় নিয়ে একের পর এক সংলাপ ও গান তৈরি করতেন এবং তা পরিবেশন করতেন। আলকাপের সংগঠক হিসেবে তিনি কাজ করতেন। তিনি লোকজন জোগাড় করে আলকাপ দল গঠন করে ফেলতেন। যখন আলকাপের আসর বসত তখন তিনি দুই দলেরই আলকাপের হারমোনিয়াম বাজাতেন।
বীরেন ঘোষ ছিলেন খুবই উদার মনের মানুষ। কুতুবুল আলম অসুস্থ হলে রকিবউদ্দিন মাহবুবুল আলমকে সাথে নিয়ে গম্ভীরা দল পরিচালনা শুরু করেন। যদিও প্রথমে মাহবুবুল আলম ঘোষের সাথেই অভিনয় করতেন। রেডিওতে মাহবুবুল আলম-বীরেন ঘোষ; আবার মাহবুবুল আলম-কুতুবুল আলম এভাবে গম্ভীরা অভিনয় করতে থাকেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে বেতার থেকে মাহবুবুল আলমকে বলা হয় যে কোনো একটা গ্রুপের সাথে গম্ভীরা করতে হবে। সরাসরি বেতার থেকে যখন মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বীরেন ঘোষের সাথে জুটি বাঁধবেন বলেছিলেন। কিন্তু পরে একদিন মাহবুবুল আলম বীরেন ঘোষের কাছে একটি কাগজ ধরিয়ে দেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বলেন। তাতে লেখা ছিল, আমি বীরেন ঘোষ স্বেচ্ছায় মাহবুবুল আলমকে কুতুবুল আলমের সাথে গম্ভীরা দল গঠন করার অনুমতি দিচ্ছি।
বাবু বিনাবাক্য ব্যয়ে সেই কাগজে স্বাক্ষর করে দেন। এ ধরনের ব্যক্তি হিসেবে এক উদার ব্যক্তিত্ব ছিলেন বাবু বীরেন ঘোষ। তিনি নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে তার দল সংকটে পড়বে জেনেও তিনি স্বাক্ষর করে দেন। সে সময় এসব শিল্পীর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র বাহন ছিল রেডিও। সেখানে কাজ করে কিছু পয়সা রোজগার করা। আর তা দিয়েই সংসার চালানো। গম্ভীরায় তার দল ভেঙে গেলে তার সংসার চালানো কষ্টকর হবে জেনেও তিনি নির্দ্বিধায় মাহবুবুল আলমের আনা স্বীকারোক্তিমূলক কাগজে স্বাক্ষর করে দেন। পরে অবশ্য বাবু বীরেন ঘোষ ফাইজার রহমান মানিকে নিয়ে গম্ভীরা দল গঠন করেন। এবং গম্ভীরা চর্চা শুরু করেন। সে সময় আলকাপ গান তেমন একটা হতো না, যার কারণে বাবু বীরেন ঘোষকে আলকাপ ছেড়ে দিয়ে গম্ভীরার চর্চা শুরু করতে হয়। তিনি গম্ভীরারও এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনি শুধু আলকাপ এবং গম্ভীরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বা ছিলেন না। গম্ভীরা গানের প্রায় পনের-ষোলটা সুর ছিল। বাবু বীরেন ঘোষ সবগুলো সুরেই গান গাইতে পারতেন।
বীরেন ঘোষ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই সেই সুরগুলো হারিয়ে গেছে। এখন দুটো বা তিনটে সুর দিয়েই গম্ভীরা গান গাওয়া হয়। সে সময় শব্দযন্ত্রের বা রেকর্ডিংয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বীরেন ঘোষের সেই সুরগুলো রেকর্ড করে রাখা সম্ভব হয়নি। যার ফলে বলা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ হারিয়েছে এক অসাধারণ মেধাবী মানুষের তৈরি করা গম্ভীরা গানের সুরগুলো। এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী শুধু নয় গোটা দেশবাসী গম্ভীরা গানের পনের-ষোলটা সুরের রস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ড. ইমদাদুল হক মামুন : শিক্ষক, লেখক ও গবেষক