বাবুরঘোন গ্রামে নবান্ন উৎসব ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি ভাবনা

4

জাহাঙ্গীর সেলিম

বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব হলো নবান্ন উৎসব। উৎসব প্রাচীন কিন্তু স্থিতিস্থাপক সাংস্কৃতিক রূপ। স্থিতিস্থাপকতার গুণে কোনো কোনো উৎসব যেমন আদিরূপ হিসেবে বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা ধর্ম সম্প্রদায় আদিম ইচ্ছাপূরণের বা কল্যাণ কামনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তেমনি ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা করণ-ক্রিয়ার (Ritual) অংশও হতে পারে। বাংলাদেশে নবান্ন উৎসবের রূপান্তরে তেমনটাই লক্ষ করা যায়। বহু বৈচিত্র্য সত্ত্বেও উৎসবের কতকগুলো স্বকীয়তা রয়েছে যেমন- কোনো কোনো উৎসব বর্ষপঞ্জি, ঋতু বা চন্দ্রসূর্যের আবর্তনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উৎসব প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্র কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বা কমিউনিটির যেমন হতে পারে, তেমনি তা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বহু মানুষের বা সর্বজনীনও হতে পারে। উৎসবের নবায়ন ও নব বিন্যাসের কারণ হলো আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, জাতিগত বা সাংস্কৃতিক নিপীড়নজাত প্রক্রিয়া।
ড. এনামুল হকের লেখায় পাওয়া যায়, ‘বাংলাদেশের উৎসব প্রধানত আর্তব উৎসব বা কৃষি উৎসব। আর্তব আদিম কালের উৎসব। আদিম অবস্থায় মানুষ যখন যাযাবর জীবন যাপন করত, তখন তারা স্বাভাবিক নিয়মেই ঋতু পরিবর্তনের সময় কালোপযোগী উৎসব পালন করতো। মানুষ যখন কৃষি আবিষ্কার করে এক স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল, তখন সে হলো গৃহী। উপযুক্ত ঋতু দেখেই গৃহীকে শস্য ঘরে তুলতে হয়। তবে ঋতু ধর্মী উৎসব বা আর্তব উৎসবের নজির হিসেবে নববর্ষের কথা বলা যায়।’
মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কবিতায় অগ্রহায়ণ বর্ণিত হয়েছে এ ভাবে, ‘ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস। বিফল জন্ম তার, নাই যার চাষ।’ কবির অগ্রহায়ণ বন্দনার কারণ, যতদূর জানা যায়, অগ্রহায়ণ মাসে নববর্ষ ছিল। ফলে এক কালে নতুন ধানের মাস অগ্রহায়ণে বাংলা নতুন বছর শুরু হতো।
কৃষির আবিষ্কার মেয়েদের হাত ধরে। তাই বাংলার কৃষিভিত্তিক উৎসবে মেয়েদের প্রাধান্য দেখা যায়। বাংলা নববর্ষের ‘আমানি’ এবং নতুন ফসলের উৎসব নবান্নে মেয়েদের কর্তৃত্ব লক্ষণীয়। কেননা কৃষি আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে নারীদেরই প্রাধান্য ছিল। নবান্ন ধর্মীয় উৎসব না। এর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ, তিথি নক্ষত্রের বা চাঁদের বা অমাবস্যা পূর্ণিমার ব্যাপার নেই। ফসল সম্পর্কিত এই হৈমন্তিক উৎসবটি অগ্রহায়ণ মাসের যে কোনো দিন উদ্যাপন করা যায়। এ অনুষ্ঠানে আনন্দই প্রধান। অনেকে বলেন- নবান্ন রন্ধনের উৎসব, কেননা নবান্নকে ফসল উৎপাদনের সংস্কৃতি থেকে রন্ধনকলায় বিকশিত করার একটা প্রক্রিয়া হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়। নবান্ন বাঙালি কৃষকের খাদ্যোৎসব। হতদরিদ্র কৃষকের জীবনে সমবেত উৎসবের আনন্দে মেতে উঠার দিন। ভালো ফসল উৎপাদিত হলে অগ্রাহয়ণের এ উৎসব পৌষেও বিস্তারিত হয়। পৌষপার্বণ বাঙালিকে পিঠাপুলি খাওয়ার সুযোগ করে দেয়। পৌষপার্বণে মেলা ও পিঠা-উৎসব যেন নবান্নের বর্ধিত রূপ। নব আঙ্গিকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ পৌষমেলা আয়োজন করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌষে পিঠা উৎসব মহাউল্লাসে ধুমধামের সাথে পালন করা হয়।
প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের কোনো এক দিনে ঢাকায় সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। আয়োজনের স্থান হিসেবে চারুকলা ইনস্টিটিউটকে বেছে নেয়া হয়। এছাড়াও ধানমন্ডিস্থ রবীন্দ্র সরোবর, লালমাটিয়া কলেজ ও অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি বেশ জাঁকজমকের সাথে গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। ঢাকায় নাচগান, আবৃত্তির পাশাপাশি ঘরে বানানো নানা ধরনের পিঠাপুলির পশরা সাজিয়ে আয়োজন দিনব্যাপী চলে। লোক সমাগমের কমতি থাকে না। তবে এসব আয়োজনে শহুরে কালচার প্রাধান্য পায়। অবশ্য বিশ্বায়নের প্রভাবে সবখানেই আধুনিকতার রমরমা উপস্থিতি। ফলে নানাধরনের পিঠাপুলির আয়োজন হলেও সেই অকৃত্রিম পরশ/ছোঁয়া দেখা যায় না। ঠিক একইভাবে পহেলা বৈশাখ আমাদের যাপিত গণজীবনে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে প্রধান উৎসবের দিন, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার দিন এবং দেশে বেশ সাড়ম্বরে পালিত হয়। তবে রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান ঘিরে পুরো এলাকায় যে জনসমুদ্র ও অন্যান্য আয়োজন এবং পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম মেকি শহুরে কালচারে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক দশক থেকে এ কালচার গড়ে উঠেছে। কেননা সমসাময়িক কালেই দেশ কৃষি অর্থনীতির পরিবর্তে ভোগবাদী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, ইলিশ-পান্তার সংযোজন সে সূত্রে গাঁথা। বিগত নব্বই দশকের শুরু থেকে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতীয় ও একইসঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা UNESCO-র Intangible Cultural Heritage হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
নবান্ন প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। এই সর্বজনীন উৎসবটি একসময় দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হতো। সনাতনধর্ম অনুসারীদের মধ্যে উদ্দীপনা এখনো বিদ্যমান তবে পরিবারকেন্দ্রিক, নতুন ধানের ভাত, পিঠা, পায়েস খাওয়া এবং একইসঙ্গে খাদ্যদ্রব্য কাক-পক্ষীদের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নতুন ধানের আগমনে গেরস্ত পরিবারে ঘরে ঘরে চিতইপিঠা, আইখা, পায়েস ও অন্যান্য খাওয়া-দাওয়ার প্রচলন আজও বিদ্যমান, কেননা এ সময় আখের নতুন গুড় বাজারে আসে। উত্তর জনপদের চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিতইপিঠা গেরস্ত বাড়িতে বছরব্যাপী খাওয়া হয়। তবে নতুন গুড়ের সাথে নতুন ধানের পিঠার স্বাদ বরাবরই আলাদা। এ চিতইপিঠা সকালের নাস্তা হিসেবে খাওয়ার প্রচলন। সাইজে অনেক বড়, গরম গরম খেতে বেশ মুড়মুড়ে, আমিষ বা নিরামিষযোগে খাওয়া হয়। শহরের অলিতে গলিতে যে পিঠা পাওয়া যায় তার থেকে ৫-৭ গুণ বড় এবং কাগজের মতো পাতলা। তবে অনেক ধরনের পিঠা এখন আর দেখা যায় না। বিশ^ায়নের প্রভাব, ঘরে খাদ্যদ্রব্য তৈরি থেকে গৃহিণীদের মুক্তি দিয়েছে। পাড়ার দোকানে বা ভ্যানে ফেরি করে নানা পদের শুকনো খাবারের প্রতি আগ্রহ বেশি। তবে ঘটা করে নবান্ন পালন করা এখনো হারিয়ে যায়নি শুধু আঙ্গিক পাল্টেছে এবং গ্রামবাংলায় নবান্ন চালু রয়েছে।
এবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী নবান্ন উৎসব পালনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর সংলগ্ন শীর্ণকায়া পুনর্ভবা নদীর ধার ঘেঁষে বাবুরঘোন গ্রামে সূর্য ওঠার আগে কাকডাকা ভোরেই (১ ডিসেম্বর, ২০২৩) দলে দলে লালপাড়-হলুদ শাড়ি পরে মেয়েরা স্কুল শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের বাড়ির পথে হেঁটে চলেছে। আমাদের গন্তব্যস্থলও ওখানেই, অচেনা গ্রামে শিক্ষিকার বাড়ি চিনতে কষ্ট করতে বা কাউকে জিজ্ঞেস করতে হলো না। একটা দলের পেছনে চলতে চলতে কাক্সিক্ষত বাড়িটি পেয়ে গেলাম। বাড়ির সামনে ছেলে ও মেয়েদের জটলা এবং বিভিন্ন বয়সী লোকজনের আগমন। জটলা অতিক্রম করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে চোখ ছানাবড়া, উঠানে প্রায় ৬০-৭০ জন বিভিন্ন বয়সী মহিলাÑ স্কুল কলেজ পড়–য়া কিশোরীদের সাথে গ্রাম্য বধূ, খালা, ফুপু, চাচি, শাশুড়ি, দাদি, নানিদের সরব উপস্থিতি এবং প্রায় সকলে পিঠা বানানোর কাজে ব্যস্ত। সকলের পরনে লালপেড়ে হলুদ শাড়ি। কিশোরী ও অল্পবয়সী বধূদের মাথা ও খোঁপায় হলুদ গাঁদা ফুলের মালা, চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি এবং আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরা। বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর পেয়ে গেলাম, প্রত্যেকেরই একটা করে এ রঙের শাড়ি রয়েছে এবং উৎসবের দিন পরে থাকে। তবে এখানেও মৌলবাদীদের সরব উপস্থিতি রয়েছে, অনেক কিছুতে বাধা দেবার চেষ্টা করে। এ সংকট উত্তরণের জন্য মেয়েরা সহাবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে, কোনো তর্কে লিপ্ত হয় না, মানিয়ে চলতে হয়। নানা বিষয় এখন উভয়পক্ষের কাছে এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে, কেননা দীর্ঘ বার বছর ধরে দলবদ্ধ হয়ে নবান্ন পালন ছাড়াও অন্যান্য অনুষ্ঠান আয়োজন একইভাবে পালন করা হচ্ছে। তবে মানিয়ে চলার ব্যাপারে এক অভিনব উপায় হলো, অনেক বধূ/বয়স্কা মহিলা লালপাড় হলুদ শাড়ি পরে গ্রামের রাস্তা ধরে আসে, কিন্তু কিছু মেয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা ডিঙ্গিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে ঐ সব মেয়েরা আগের দিন কোনো একসময় মমতাজ বেগমের বাড়িতে শাড়ি রেখে আসেন।
লাল-হলুদ শাড়িপরা মেয়েদের দল মাদুর, পিঁড়ি, মোড়ায় বসে প্রত্যেকেই নানা উপকরণ হাতে নিয়ে কাজে ব্যস্ত। উদ্দেশ্য পিঠা বানানো। তবে এক ধরনের পিঠা নয়, ১০/১২ ধরনের পিঠা। কেউ আটা গুলাচ্ছে, কেউ ছোট ছোট আটার বল তৈরি করছে, কেউ আটা গোল করে নতুন গুড়ের সাথে তিল মিশ্রিত ঘন হালুয়া পুরে নান্দনিকতার সাথে মুখ মুড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ গনগনে চুলায় ফুটন্ত পানির ভাপে পিঠা সিদ্ধ করতে ব্যস্ত। এ ধরনের পিঠা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এ কাজের আকর্ষণ আরো বেড়েছে, কেননা গোল হয়ে বসে মেয়েদের হাতের কাজে যেমন বিরাম নেই, তেমনি মুখেও বিরাম নেই। সমান তালে সমবেত কণ্ঠে একের পর এক গীত গেয়ে চলেছে।

ধান ভাঙ্গার গীত
সোলাহ কাঠের ঢিকি মারে ভ্যান্না কাঠের পুয়ারে মারে বদলারে (২)
সেনা ঢেকিতে বাহানে মারে বাঁশফুল ধানের চাইলো রে মারে বদলারে (২)
সেনা চাইল যাইরে মারে রহনপুর বাজারে (২)
মারে চাইল এর সুন্দর মারে ভানি কতই সুন্দর রে (২)
ভানি দেখ্যা আসিব রে॥

উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের মধ্যে গীত গাওয়ার ঐতিহ্য বহু শতাব্দী ধরে বিরাজমান ছিল, বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি। এই তো কয়েক দশক আগেও কী হিন্দু-কী মুসলমান পরিবারে গীত গাওয়ার রমরমা উপস্থিতি ছিল। গীত ছাড়া বিয়ে কল্পনা করা যেত না। উচ্চবিত্ত, গেরস্ত বা গরিব বিয়েতে ১০-১৫ দিন আগে থেকে মেয়েরা থুবড়ার চাল তৈরি করতে দলগতভাবে ঢেঁকিতে পা চালানোর সাথে একটানা গীতও চলতে থাকত। এছাড়াও প্রতি বিকেল বা সন্ধ্যায় বসত গীত গাওয়ার আসর, এমন কি গীত গাওয়ার প্রতিযোগিতাও চলত। জেলাজুড়ে যেখানে প্রতিকূল অবস্থা সেখানে মমতাজ বেগমের ছত্রছায়ায় গীতের পুনর্জন্ম! এর থেকে বিস্ময়কর কী হতে পারে? না, বিস্ময়ের আরো বাকি রয়েছে। উঠানের এক কোণে একচালা ঘরে গীতের সাথে ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গা এবং অন্য কোণে কুলায় চাল ঝেড়ে জাঁতা ঘুরিয়ে আটা তৈরি করা হচ্ছে। সেই আটা দিয়েই পিঠা তৈরি। এ যে এক প্রাণবন্তÍ জাদুঘর। কিন্তু, আমরা জানি বর্তমানে ঢেঁকি স্বর্গে চলে গেছে!

পিঠার গীত
আরশের নানি নিমনমুখী
কিছু নাহি জানেরে, কিছু নাহি জানে রে
পাঞ্জর ভিজিল ঘামে॥
বড় বড় পিঠাগালা
কোনা তে লুকাইল রে
পাঞ্জর ভিজিল ঘামে॥
আরশের দাদি বিষনী মুখী
কিছু নাহি জানে রে
পাঞ্জর ভিজিল ঘামে॥
বড় বড় আন্দেশাগালা
কোনাতে লুকাইল রে
পাঞ্জর ভিজিল ঘামে॥
ছোট ছোট আন্দেশাগালা
দশকে বিলাইল রে
পাঞ্জর ভিজিল ঘামে॥

সেই সকাল থেকে বিরামহীনভাবে পিঠা বানানো অধ্যায় একসময় শেষ হলো। কিন্তু চলতে থাকা ঢেঁকি-জাঁতা ও গীতের আওয়াজ তন্ময় হয়ে শুনছি, কেননা ষাট বছরের পুরানো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই নস্টালজিয়ার ঘোরে হঠাৎ সম্বিত ফিরে আসে, এক কিশোরী আহ্বান জানাচ্ছে- পিঠা খান। বড় রেকাবিতে নানা ধরনের পিঠার সমারোহ, কোনটা খাব আর কোনটা খাব না, কেননা রেকাবিতে থরে থরে সাজানো প্রায় অর্ধেক পিঠা কয়েক যুগ থেকে খাওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বর্তমান প্রজন্মের বধূদের পিঠা বানানো এবং মা-বোনেরাও সেসব পিঠা বানানোর কলা কৌশল বোধকরি ভুলে গেছে। ফলে পুরানো সেকালের পিঠা বেশি খাওয়া হলো এবং পিঠার স্বাদ ষাট বছর আগের মতই মনে হলো। আমার মতো প্রায় চল্লিশ জন বাইরের অতিথি সেই সব পিঠার অমৃত স্বাদ গ্রহণ করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। দুপুরে খাবার ব্যবস্থা করতেও কমতি ছিল না, যদিও খুব সাধারণ খাওয়া-দাওয়া।
এক ফাঁকে মমতাজ বেগমের সাথে কিছুক্ষণ আলাপচারিতায় জানা গেল, বার বছর আগে স্বল্প সংখ্যক গৃহবধূদের সাথে করে নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। সে সময় ধান মাড়াইয়ের মাঠ থেকে মেয়েরা ২-৩ কেজি করে ধান সংগ্রহ করে আয়োজন করা হতো, তবে বেশি দিন এ অবস্থা টিকেনি। পরবর্তী সময় থেকে আয়েজনের সব খরচপত্র আজ অবধি মমতাজ একাই বহন করে চলেছেন। এসব কাজের ইন্ধন মা নুরজাহান বেগমের কাছ থেকে পেয়েছেন এবং এখনো তিনি উৎসাহ ও প্রেরণাদাত্রী। গ্রামের মেয়েদের অবহিত, একত্রিত করা ও বিভিন্ন খোঁজ বর আনা-নেয়ার কাজটি গৌরবের সাথে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র নীরব করিম (বোনের ছেলে) পালন করে থাকে, একই সাথে সে নাচ-গান-আবৃত্তিতে সিদ্ধহস্ত। শুধু নবান্ন উৎসব নয়, প্রতি মাসে একদিন ৩০-৪০ জন মহিলা মিলিত হয়ে পোষালুর (চড়–ইভাতি) আয়োজন। পোষালুর জন্য প্রায় সব মেয়ে ২৫০-৩০০ গ্রাম চাল, একটা করে ডিম ও দু-একটা করে আলু সঙ্গে আনে। এ দিয়েই হাসি-আনন্দ ভাগ করে খাওয়া দাওয়া, গল্প গুজব করা, মনের ভাব ব্যক্ত করা, কথিকা পাঠ ও অভিনয়, গান গাওয়া, কিছু খেলাধুলাও অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরাও জড়িত। বিকেলবেলা গ্রাম্য বধূ/মেয়েদের গান, তাদের সুখ-দুঃখের কথা এবং ছোট ছেলেমেয়েরা নবান্নের গানের সাথে নাচ পরিবেশন করে। মমতাজ বেগমের কৃতিত্ব ধর্মান্ধ সমাজের বাধা উপেক্ষা করে গ্রামের মেয়েদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অন্ধগোঁড়ামির অবগুণ্ঠন থেকে বাহির করে আলোর সন্ধান করে দিয়েছেন।
সম্প্রতি দেশের ঐতিহ্যবাহী রিকশা ও রিকশাচিত্র এবং বাহারি ইফতার সামগ্রী (ডিসেম্বর, ২০২৩) টঘঊঝঈঙ-র ঈঁষঃঁৎধষ ঐবৎরঃধমব হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এসব প্রাপ্তির মূলে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং শত শত বছর ধরে বহমান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নবান্ন উৎসব প্রতিটি বাঙালির জীবন ও সমাজ ব্যবস্থায় রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ফলে নবান্ন উৎসবের জন্য ইউনেস্কো স্বীকৃতির প্রচেষ্টা চালানো জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে বস্তুনিষ্ট তথ্যচিত্র নির্মাণ করে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ, যেভাবে রিকশাচিত্র ও ইফতারির ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কাজে জমিন প্রস্তুত রয়েছে বাবুরঘোন গ্রাম এবং পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ। ঢাকাস্থ জাতীয় নবান্ন উদযাপন কমিটির এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা উচিৎ। বাবুরঘোন গ্রামের গৃহবধূরা সম্মিলিতভাবে হাজার হাজার বছরের শস্যভিত্তিক লোকউৎসবকে মহিমান্বিত করে চলেছে। এ আয়োজন হাজার হাজার গ্রাম বাংলারই মুখচ্ছবি। আর হ্যাঁ, আগামী নবান্নে মমতাজ বেগম বাবুরঘোন গ্রামে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

লেখক ও গবেষক এবং সাধারণ সম্পাদক, লেখক পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ