দৈনিক গৌড় বাংলা

রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

বাবা দিবসে ‘‘বাবা-কথিকা’’
ড. আকন্দ মো. রফিকুল ইসলাম

প্রাক কথনঃ
মায়েদের ত্যাগের কথা সর্বজনবিদিত। বাবাদের ত্যাগ অনেক সময় অবহেলিত। সকলের নালিশ বাবার কাছে, বাবার নালিশের জায়গা নেই। বিশেষত: মধ্যবিত্তের বাবাদের সংসার চালাতে গিয়ে কত পেরেশান-কত হয়রানির সম্মুখিন হওয়া, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ করে সংসার চালানো, পয়সা বাঁচাতে বাজারে দর কষাকষি করতে গিয়ে অপ্রিয়ভাজন হওয়া, ইত্যাকার বহুবিধ গঞ্জনা সহ্য সংবলিত চরম ত্যাগের উদাহরণের অভাব নেই। সংসারের শান্তি রক্ষার্থে এ গুলো বেশীর ভাগই গোপন রেখে বাবারা হন নীলকন্ঠ। মুখ বুঝে সংসারের ঘানি টেনে যাওয়াই হচ্ছে বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবাদের আদর্শ। অতি সজ্জন, সৎ, মধ্যবিত্ত বাবা হলে তো আরও ত্রাহি অবস্থা। আমার বাবা ছিলেন সে রকম মধ্যবিত্ত পরিবারের সৎপথে চলা একজন সাদাসিধে সুফি মানুষ।
বাবার বেঁচে-বর্তে যাওয়া সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান হওয়ায় আমি বাবার অতি আদরের ছিলাম। অপরদিকে বাবার অবসর জীবনে সন্তানদের মধ্যে আমিই বেশী সময় কাছে ছিলাম (তাঁর অন্য কোন সন্তান তাঁর কাছে এতটা বেশী সময় সরাসরি থাকতে পারেন নি)। গ্রামের স্কুলের ছাত্র হওয়ায় ১৪/১৫ বছর যাবৎ বাবার সরাসরি সঙ্গ পেয়েছিলাম। তাই বাবা তাঁর জীবনের কষ্ট মিশ্রিত সততার সুন্দর গল্পগুলো আমার সাথেই বেশী করতেন বলেই আমার মনে হয়। আমার ধারণা আমাকে তাঁর ধাঁচে মানুষ করার মানসে নৈতিক শিক্ষার অংশ হিসেবে এ গল্পগুলো আমার সাথে করতেন। তার সুফলও আমি পেয়েছি। আমার ভিতরে বাবার নৈতিকতা বলা যায় আমার হয়ে আমার সন্তান পযর্ন্ত পৌঁছেছে। যা হোক, আমরা প্রায় সবকটা ভাইবোন বাবার সাদাসিধে-সৎ চরিত্র কিছুটা হলেও পেয়েছি, তবে বাবার মত অতটা ভাল মানুষ বোধ করি কেউই হতে পারি নি। এক্ষণে বাবা দিবসে বাবার স্মরণে ‘‘বাবা-কথিকা’’ তুলে ধরছি। বাবাকে নিয়ে আমার একমাত্র লেখা। তাই বাবার সাথের সব স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করা যাক্।
আমার বাবা পৃথিবির সেরা বাবাঃ
‘‘আমার বাবা পৃথিবির সেরা বাবা’’-এ শিরোনামটি বেশ সন্দিগ্ধ। তার কারণ প্রায় সবাই এ আপ্ত বাক্যটি ব্যবহার করেন। তবে এটির সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে-বাবার মত মুরুব্বীদেরকে উচ্চ আসনে আসীন রাখার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, যা আমাদের ধর্ম ও দেশের সংস্কৃতিরও অংশ বটে। ‘‘প্রত্যেকের বাবাই প্রত্যেকের কাছে শ্রেষ্ঠ”-এর চেয়ে ভাল খবর আর কি হতে পারে? যা হোক, আমার বাবার ক্ষেত্রে এ টুকু নিশ্চিত করে বলা যায যে, আমার বাবার অবস্থান সেরাদের কাতারের উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। আমার বাবার মত ব্যক্তিদের ম্মৃতিচারণ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষার জন্যও জরুরী বলে এ লেখার প্রয়াস। আমার বাবাকে গ্রামের লোকজন ভালোবেসে শ্রদ্ধার সাথে নাম দিয়েছেন আকনজী (আগের দিনে শ্রদ্ধাভরে নামের সাথে ‘জী’ লাগানো হতো, গ্রামের মানুষ সেটাই অনুসরণ করেছেন)। বাবা গ্রামের সকলের নিকট সমাদৃত ছিলেন।
অদ্যবধি বাবার পরিচয়ে পরিচিত (বাবাকে ছাড়িয়ে যাওয়া কখনও সম্ভব নয়):
অনেকে বাবাকে ছাড়িয়ে যান। আমাদের পক্ষে আমাদের বাবাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি খোলসা করার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক। এক দিন সরকারের উচ্চ পদে আসীন আমার এক বন্ধু (স্কুল জীবনের সতীর্থ, একই গ্রামের বাসিন্দা ও আত্মীয়ও বটে)-এর দপ্তরে গিয়েছিলাম। তখন সে তার সহকর্মীদের নিকট আমার পরিচয় এভাবে তুলে ধরলেন যে, রফিক হলো আমার অন্যতম দোস্ত, ওর নিজের পরিচয় যাই থাকুক, সেটা বড় কথা নয়, ওর বড় পরিচয় হলো ওর বাবা আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সৎ ও শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন। তখন আমার বোধদোয় হলো এবং গর্বে বুকটা ভরে গেল যে, আল্লাহ্র কত বড় নেয়ামত যে আমাকে আল্লাহ্ এমন এক বিরল-সৎ-বাবার সন্তানরুপে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন যে, তাঁর মৃত্যুর আটাশ বছর পরেও প্রজন্মান্তরে দেশের সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ের পদস্ত বিজ্ঞ লোকের মুখেও তাঁর সুনাম শোনা যাচ্ছে। এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কি হতে পারে? অপর দিকে চোখে পানি এসে গেল এই ভেবে যে, আমাদের ৭ ভাই-বোনকে মানুষ করতে বাবা তাঁর সহযোদ্ধা-সহধমির্নী-কে নিয়ে কত কষ্টই না করেছেন। হে আল্লাহ্, বাবা-মা’র সদকায়ে জারিয়া হিসেবে আমাদেরকে তুমি কবুল করে নাও। আল্লাহ্ তুমি আমার মা-বাবাকে বেহেস্ত নসীব করো। “রব্বির হাম হুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগীরা’’(হে আমাদের পালনকর্তা! তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করুন; যেমনিভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন)।
আমার বাবা ছিলেন মূলত মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকঃ
আল্লাহ্ তা’আলা ‘‘সুরা সিজদা”র ২৪ নং আয়াতে যা ইরশাদ করেন তার অর্থ-‘‘ওরা যেহেতু ধৈর্যশীল ছিল তার জন্য আমি ওদের মধ্য হতে নেতা (ইমাম) মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। ওরা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী”। স্কুলের ইসলামিয়াত বইতে পড়েছিলাম- ‘‘ইমাম হয় আল্লাহ্র ইচ্ছায়”। আমাদের প্রিয় নবীজী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) নিজে ইমামতি করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মিশকের কস্তুরির স্তূপের ওপর থাকবেন-তার মধ্যে এক ব্যক্তি হলো যে কোনো কওমের ইমামতি করে আর তাঁরা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট” (তিরমিজি)। যেহেতু ইমাম সাহেবকে সকলে আদর্শ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাই ইমাম সাহেবকে ইমামতির যোগ্য হওয়ার জন্য ধর্মের মৌলিক নীতিমালা জানা ও এর অনুসারী হওয়ার পাশাপাশি আরো কিছু মহৎ গুণের অধিকারী হতে হয়। যেমন- সত্যবাদি, ন্যায়পরায়ণ, আমানতদার ও বিশ্বস্ত/আস্থাভাজন হওয়া ইত্যাদি। এ গুণগুলো আমার বাবার মধ্যে ছিল। তাই তাঁর প্রতি তাঁর কওমও সন্তুষ্ট ছিল। কয়েক বছর আগে আমার চাচাত ভাই জনাব গোলাম মোর্শেদ পলাশ ফোন করে জানান যে, আমাদের মসজিদ কমিটির আয়োজনে বার্ষিক মাহফিলে দাওকাঠি সিনিয়র মাদ্রসার প্রিন্সিপাল মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, আকনজী হুযুর (আমার বাবা)-এর মত এত ভাল মানুষ এ তল্লাটে আর দেখি নাই বা আর জীবনে দেখবো বলেও মনে হয় না। বাবার সুনাম এভাবে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা থেকে শুনতে কার না ভাল লাগে, বলুন।
সেচ্ছাসেবক আর কাকে বলেঃ
একজন ইমাম শুধু মসজিদের ইমাম নন বরং তিনি তাঁর কওমেরও ইমাম। বাবা ছিলেন তাই। ধর্মীয় বিষয়ে মাসালা-মাসায়েল জানার জন্য অনেকেই বাবার কাছে আসতেন। মৃত্যু পথযাত্রিকে তওবা পড়ানো, জানাজার নামাজ পড়ানো, শিশুদের হাতে-খড়ি, ব্যবসা/শুভ কাজের উদ্বোধনে মিলাদ পড়ানো, বিয়ে-পড়ানো, ধর্মীয়-সামাজিক কাজ ছিল বাবার রুটিন কাজ। রোজার মাসে বাবা প্রতি দিন অসংখ্য মিলাদের দাওয়াত পেতেন (বাবার সাথে মিলাদের দাওয়াতে আমরা সব ভাই-ই গিয়েছি)। কি সুন্দর কিয়াম, কি সুন্দর মোনাজাত, যা শুনে চোখে পানি এসে যেত। বাবার বেশীর ভাগ সময় যেহেতু ম্বেচ্ছাসেবী কাজে ব্যয় হতো, সেহেতু স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে ইমামতি-শিক্ষকতার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের কাজও তাঁকে করতে হতো। বাবার শতভাগ হালাল রুজি-রোজগারে আমরা মানুষ হয়েছি, এটা প্রণিধানযোগ্য। অভাবের মধ্যেও বোয়ালিয়া হাট (বরিশাল হতে বাকেরগঞ্জ যাওয়ার পথে এ হাটটি অবস্থিত) নির্মাণের জন্য প্রায় ৭৫ শতাংশ জমি সামাজিক কাজে বাবা বিনামূল্যে ত্যাগ করেছিলেন। ডযধঃ ধ াড়ষঁহঃধৎু ড়িৎশ?
বাবা সবার আস্থাভাজন ছিলেন (সততার পরাকাষ্ঠার উদাহরণ রয়েছেঃ
আমার বাবার প্রতি মানুষের আস্থাভাজনের একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমাদের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় গ্রামের এক জনের নিকট হতে এক খন্ড জমি ক্রয় করেছিলেন। বিক্রেতার মৌখিক আবদার ছিল যে, যখনই তিনি বা তাঁর ওযারিশ অর্থ জোগাড় করতে পারবেন, তখনই যেন তাঁকে/তাঁর ওয়ারিশকে একই দামে জমিটা ফেরত দেয়া হয়। এ আলাপের সময় উপস্থিত ছিলেন আমার বাবা। বেশ কয়েক বছর পরে (মূল ক্রেতা জান্নাতবাসি হওয়ার পরে) ক্রেতার ছেলে (আমাদের আত্মীয়) জমি ফেরত দিতে অস্বকিার করে বলেন যে, জমি ফেরত দেয়ার কোন কথা ছিল না। তখন বিক্রেতারা বলেন যে, আকনজী (আমার বাবা) সাক্ষি ছিলেন, তিনি একজন সৎ ও আস্থাভাজন মানুষ, তিনি যদি অস্বীকার করতে পারেন, তাহলে জমি চাই না। এ সময় আমার বাবাকে মিথ্যা বলার জন্য ঐ আত্মীয়রা পিড়াপিড়ি করতে থাকে। কিন্তু বাবা কোন ভাবেই রাজী হন নি। সে সময় মজলিসে সত্য কথা বলায় আমাদের আত্মীয় জমিটা হারায়। ফলে বুঝতেই পারছেন যে, বাবার কাছে সততার জন্য আত্মীয়তা ত্যাগ করা কোন ব্যাপারই ছিল না। ছোট বয়সে এ দৃশ্য দেখে আমার মনে যে সততার ছাপ পড়েছে, তা আজও জাজ্বল্যমান। সততার জন্য গ্রামের অনেকই বিভিন্ন চুক্তিতে বাবাকে সাক্ষি হিসেবে রাখতেন। উল্লেখ্য যে, আমি আমার জীবনে বাবাকে কখনও মিথ্যা কথা বলতে দেখিনি।
অসম্প্রদায়িক আলেম ও মুক্তি যুদ্ধে ভুমিকা:
আমার বাবা ছিলেন অসম্প্রদায়িক, উদার পন্থি, রাজনৈতিক সচেতন দেশপ্রেমিক আলেম। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের লোক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সাহসের সাথে তখনকার এক প্রভাবশালী রাজাকারের আদেশ অমান্য করে বাবা তাঁর এক ছেলেকে (আমার সন্নিহিত বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সালাম আকন্দ) বদর বাহিনীতে যোগদান না করতে দিয়ে মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে আনেন। উক্ত রাজাকারের ভয়কে পরওয়া না করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-এর অনুষ্ঠান আমরা শুনতাম। উল্লেখ্য, আমার সেজ ভাইয়ের দোস্ত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার মরহুম জনাব তৈয়ব আলী মুন্সি। তাই আমাদের ঘরে মুক্তি যোদ্ধাদের ভাত রান্নাও হয়েছে (আমি ছিলাম মুক্তি যোদ্ধাদের ক্ষুদে খাদ্য পরিবেশনকারী)। অধিকন্তু, আমার মেজভাই যুদ্ধ চলাকালে বড় বোনকে নিয়ে চট্রগ্রাম থেকে এক মাস যাবৎ পায়ে হেঁটে আমাদের গ্রামের বাড়ি পৌঁছান। পথিমধ্যে তাঁকে মিলিটারীররা বেয়োনেট দিয়ে আঘাত করেছিল, রক্তাক্ত জামা নিয়ে বোনসহ তিনি মা-বাবার বুকে ফিরে আসেন। আমরা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাহত পরিবার। যা হোক, এ সবই সম্ভব হয়েছিল বাবার দেশ প্রেমজনিত শিক্ষা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে।
বাবা ছিলেন শিক্ষানুরাগীঃ
ছোট বেলায় দেখেছি আমাদের ঘরটি ছিল যেন একটা ফ্রি মক্তব। ফজরের নামাজের পর থেকে এক বা দুই ঘণ্টাব্যাপী প্রায় অবৈতনিক কুরআন শরীফ শিক্ষার আসর বসতো। প্রায় ১৫-২০ জন ছেলে-মেয়েকে বাবা একাই কুরআন শরীফ শিক্ষা দিতেন। তবে মাঝে মাঝে বাবার বিশেষ অনুপস্থিতে প্রতিস্থাপকের কাজ করতেন আমার সেজ ভাই (অনেকে তাকে কুট্রি বলে ডাকতো)। সেজ ভাই সহজে ছুটি দিতে চায়তেন না বলে ছাত্র-ছাত্রিরা শুর করে বলতো-
কুট্রি স্যার,
ছুট্রি দেন,
ক্ষিদা লাগছে, বিদায় দেন।
যা হোক, তখন আমাদের পাড়ায় যারা কুরআন শরীফ শিখেছেন তাদের মনে হয় ৮০ শতাংশই বাবার ছাত্র-ছাত্রী। আমরা ভাই বোনরা সবাই বাবার নিকট থেকেই কুরআন শরীফ পড়া শিখেছি। নামাজ শিক্ষা, হাতে খড়ি, প্রাথমিক পাঠ, ধারা পাত, মানসাংক ইত্যাদি বিষয়গুলো বাবার নিকট হতে আমরা শিখেছি।
বাবা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাই তাঁর গলায় একটি গজল শুনতাম-
শিক্ষা মোদের দেশ উন্নতি,
শিক্ষা ছাড়া, উপায় নাই
ঐ যে শূন্যে জাহাজ চলে,
শিক্ষার গুণে দেখরে ভাই, (ঠিক মত মনে নেই-বহু বছর আগের কথা)।
এ সব গেয়ে তিনি আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। নিজে যেমন অনেক কষ্টে লেখা পড়া করেছেন, তেমনি বিলাসিতা পরিহার করে (আমার বাবা-মা দু জনেই কৃচ্ছ্র সাধন করেছেন), সন্তানদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন। একটা বিষয়ের উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো-আমার বড় ভাইকে পড়াতে গিয়ে অর্থ সংকটের কারণে বাবা তাঁর এক আত্মীয়ের নিকট জমি বিক্রি করতে চায়লে তারা বলেছিল যে, ছেলে মরে গেলে জমিও গেল ছেলেও গেল। এর চেয়ে খারাপ কথা আর কি হতে পারে? আসলে তারা চাচ্ছিলেন না আমরা লেখা পড়া করে তাদেরকে টপকে যাই। বাবার কথা ছিল যে, ছেলে না থাকলে জমি দিয়ে কি হবে? তাই বাবা আরও অভিমান করে অন্যদের নিকট জমি বিক্রি করে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ফলে বাবার বড় ছেলে গ্রামের প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হন। এ বিয়য়টিতে বাবার দূর দৃষ্টির প্রমাণ মেলে। বাবা, তাঁর বড় ছেলেকে পড়িয়ে অন্য ছেলে-মেয়েদেরকে পড়ানোর দায়িত্ব তাঁকে দেন। এটিও ছিল তাঁর আর এক বুদ্ধিমত্তার পরিচয়, যার ফলে বড় ভাইও আমাদেরকে দায়িত্ব নিয়ে মানুষ করেছেন বৈকি।
আমরা সংকটকালে বিশেষত: পরীক্ষার সময় বাবা-মায়ের কাছে দোয়া চাইতাম। এতে ফল পেতাম। ১৯৬৯ সনে সেজভাই মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। এ সময় বাবা মসজিদে বসে বসে সেজ ভাইয়ের জন্যে দোয়া করেছেন এই বলে যে, হে আল্লাহ্, তুমি আমার অসুস্থ ছেলেকে ফেরেস্তা পাঠিয়ে সহায়তা কর। সে পরীক্ষায় সেজ ভাই মানবিক বিভাগ থেকে ২টি লেটরসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এ ধরনের ফলাফল তখন অতীব বিরল ছিল। আমার নিজের ভোর রাতে পড়ার অভ্যাস ছিল। আর ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠাবার দায়িত্ব ছিল বাবার। বাবা বলতেন ভালো রেজাল্ট করলে তাঁর এ কষ্ট এক দিন আনন্দ হয়ে দেখা দিবে। বাবার পূর্ণ পরিবার আজ বিকশিত। মাওলানা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, দেশে-বিদেশে উচ্চাসীনে কর্মরত তাঁর পরবর্তী প্রজন্মসমূহ। বাবা-মায়ের ত্যাগ, তিতিক্ষা, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সিদ্ধান্তের ফসল আমরা এখন ভোগ করছি। আল্লাহ্ আমাদের মা-বাবাকে বেহেস্ত নসীব করুন-এ দোয়া করি।
আরও কত কথা, আরও কত স্মৃতিঃ
বাবা মাওলানা ভাসানীর মত তালের আঁশের টুপি পরতেন। বাবা শের-ই বাংলার গণজাগরণের ডাকে সাড়া দিতেন। বাবার মুখে একটা গজল সুনতাম, যা হলো-
‘‘হক সাবের হাক শুনিয়া
ভাঙলো মোদের ঘুমের ঘোর।”
আধ্যাত্মিক রহস্যসমূহ, আকন বংশের অর্থ, আমাদের নামের অর্থ, কত গল্প, কত কৌতুক,কত ধাঁধাঁ,কত মনস্তাত্বিক বিষয় যে বাবার কাছ থেকে জেনেছি, তার ইয়ত্তা নেই। বাবা বিকেলে সব সময় আমাকে খেলতে দিতেন। কিছু কিনে খেতে প্রতি হাটবার দিন হাটে বসে বাবা কিছু পয়সা দিতেন (আমি বেশীর ভাগ সময় ঘোল-মুড়ি কিনে খেতাম)। আমার বৃত্তির টাকা বাবা আমাকেই নিজ হাতে ইচ্ছেমত খরচ করতে দিয়েছেন। যখন বাবার সাথে তাবলিগে বা মাহফিলে গিয়েছি তখন তিনি নিজে না খেয়ে আমার খাওয়া আগে নিশ্চিত করতেন। আমি বাবার সব চেয়ে ছোট সন্তান বলে খুব আদরের ছিলাম, আবার আমি বাধ্যগতও ছিলাম, ফলে তাঁর হাতে মার খাওয়ার প্রশ্ন বিরল। অতি আদর করে বাবা আমাকে একটি ভিন্ন নামে ডাকতেন (যার প্রকৃত অর্থ শিশু)। অমার যতটা মনে পড়ে আমি ১০/১২ বছর বয়স পর্যন্ত রাতে বাবার সাথে ঘুমাতাম। বাবার আবদারের কারণে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতাম, কত যে ভালো লাগতো।
আমি যখন বিয়ে করে নব-বধূকে নিয়ে বাড়ি গেলাম, তখন বাবার দূর দৃষ্টির পরিচয় আবার পাওয়া গেল তিনি বুঝে ছিলেন যে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রবধূটি কাজের হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ আমার বৌয়ের ইন্টারভিউ নিলেন। নামাজ ও কোরআন শরীফ পড়তে পারাটা ছিল আমার বৌয়ের বড় যোগ্যতা। বাকীগুলোও তিনি বুঝে নিলেন। বৌ ভালো ছাত্রী (মৎস্যবিদ), নম্র-ভদ্র, নামাজি, খাপ খাওয়ানোর অপার দক্ষতা ইত্যাদি দেখে বাবা আমাদেরকে দোয়া করলেন। মনে হয় মা-বাবার দোয়ায়ই বিয়ের পরে আমরা দু’জনেই পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণৗতে উত্তীর্ণ হই(সে স্নাতকে আর আমি স্নাতকোত্তর পরিক্ষায় প্রথম শ্রেণৗতে উত্তীর্ণ হই )। উল্লেখ্য, যদি বাবা দূরদৃষ্টি নিক্ষেপ না করে, স্বল্প দৃষ্টি দিয়ে আমাদেরকে গ্রহণ না করতেন, তাহলে আজকে আমাদের সফলতা নাও দেখা যেতে পারতো। সকল প্রশংসা আল্লাহ্র।
আমার একটা অনুতাপের বিষয় আছে, তা হলো-বাবাকে ফাঁকি দিয়ে একবার যাত্রা দেখতে গিয়েছিাম। যদিও পরে ক্ষমা চেয়েয়েছিলাম তবুও মনের খচখচানি (অনিরাময় যোগ্য ব্যধি) যায়না। বাবা তুমি আমায় ক্ষমা করো। আল্লহ্ তুমি আমায় ক্ষমা করো। আমার আর একটা দুঃখ বোধ আছে- সেটা হলো বাবা আমার এমএসসির ভালো ফলাফল (ফার্স্ট ক্লাস), পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন, বহু মাত্রার বিদেশ ভ্রমণ ও আমার উচ্চ মাত্রার কর্মসংস্থান দেখে যেতে পারেন নি। পারলে যে কত খুশি হতেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অনেকের বাবাকে নিয়ে অনেক রকমের গৌরব আছে। আমার ক্ষেত্রে, আমার বাবা একজন ইমাম, শিক্ষক, ভালো মানুষ, তাঁর মত সৎ লোকের হালাল আয়ের অর্থে বড় হয়েছি, এটাই আমার গৌরব।
ইমাম প্রশিক্ষণে যোগদানের জন্য বাধ্য হয়ে তোলা বাবার একটি মাত্র ছবি আমার সংরক্ষণে আছে, যা সংযুক্ত করলাম। সকলের নিকট আমার বাবার জন্য দোয়া চেয়ে এ লেখা শেষ করছি। আল্লাহ্ হাফেজ।

About The Author