বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের দিন ১লা মার্চ

117

postআজ মার্চ মাসের প্রথম দিন। মার্চ মানেই আগুন ঝরানো মাস। আমাদের স্বাধীনতার মাস। একাত্তরের মার্চ মাসে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী দেশবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন এক গৌরবময় অধ্যায়। স্বাধীনতার দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের অসহযোগ আন্দোলন শুরুর দিনটি ছিল ১৯৭১সালের ১লা মার্চ মাস সোমবার। ওই দিন দুপুর একটার সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সামরিক জান্তা প্রধান ইয়াহিয়া খান এক বেতার ঘোষণায় ৩ মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করেন। এর প্রতিবাদে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল, বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ শুরু হয়।
তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের হৃদয়ে লালিত একটি স্বপ্ন, একটি মাত্র আকাক্সক্ষাই জাগ্রত ছিলো, তাহলো পরিপূর্ণ স্বাধীনতা। দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা নিগ্রহ, শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের নাগপাশ ছিড়ে সগর্বে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর দুর্মর আকাক্সক্ষা ছিলো প্রবল।
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ গোটা পাকিস্তানেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা করছিল।
শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার হীন, কূট ষড়যন্ত্র হিসেবে অধিবেশন বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ক্রোধে, ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, অধিকারহীন মানুষ ফেটে পড়েন বিক্ষোভে। অফিস-আদালত থেকে সব মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে ওই ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ করেন।
এদিকে ১লা মার্চ সকাল ৯টায় রাজধানীর ঢাকার মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার হোটেল পূর্বাণীতে শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভা। পাকিস্তানি ওই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বিক্ষোভে লাখো লাখো বাঙালি মিছিল নিয়ে সমবেত হয় হোটেল পূর্বাণীর সামনে। স্লোগানে স্লোগানে ঢাকার আকাশ-বাতাস ক¤িপত হতে থাকে। স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ এসময় বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিক্ষোভকারীদের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। ওইদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীর লাউঞ্জে দুই শতাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক উপস্থিতিতে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন। ভাষণে পার্লামেন্ট অধিবেশন বাতিল ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সরকারের কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। বিকেলে পল্টন ময়দানে স্বতঃস্ফূর্ত এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন গঠিত হয় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’।

অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন থেকেই বাঙালি জাতি জেগে উঠেছিলো তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। মেতে উঠেছিলো নিজেদের স্বাধীকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রামে। স্বাধীনতা অর্জনের হুশিয়ারী হুঙ্কার দিয়েছিলো স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি স্বৈরাচার শাসক শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দু মাত্রও দ্বিধা করেনি বীর বাঙালিরা। অকুতোভয়ে বাঙালিরা আত্ম পরিচয়ের সন্ধানে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগুতেছিলো বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয়ে। নিজেদের ন্যায অধিকার তথা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করতে বাঙালিদের অন্তরে ছিলোনা কোনো প্রকার ভয়ভীতি। ছিলোনা প্রতিপক্ষের নির্যাতন কিংবা মরণের ভয়ও। সকল প্রকার সংশয়-সংহার তোয়াকা না করে বাঙালিরা জান্তে চেয়েছিলো শুধু তাদের আত্ম পরিচয়। সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্তিকামী মানুষ জান বাজি রেখে স্বাধীনতার স্বপ্নকে রূপায়িত করেছিল। এসব নানাবিধ কারণে একাত্তরের ১লা মার্চ বাঙালি জাতির আত্ম পরিচয়ের দিন হিসাবে পরিচিত লাভ করে।
ওদিকে, মার্চের আগে ২৭শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৩জন নব-নির্বাচিত সদস্য ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবেন বলে খবর রটে। কিন্তু ভুট্টো পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার জোর দাবি জানান। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ের পরও বাঙালিদের হাতে শাসন ক্ষমতার ভার ছেড়ে না দিয়ে বরং ক্ষমতাকে আকড়ে ধরে রাখার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে পাকিস্তানি স্বৈরাচার শাসক গোষ্ঠী। আর সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খাঁন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহর জোড়ে তুমুল হৈচৈ পড়ে যায়। অফিস-আদালত ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন মুক্তিকামী বাঙালিরা।
এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। অনুষ্ঠিত ক্রিকেট খেলা মূহুর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। ক্রিকেট খেলার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার দর্শকবৃন্দ ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিতে দিতে মাঠ পরিত্যাগ করে নেমে আসে রাস্তায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হল ত্যাগ করে।
অপরদিকে, মিছিলকারীদের বিক্ষোভে বায়তুল মোকাররম, স্টেডিয়াম মার্কেটের দোকানপাটসহ বন্ধ করে দেয় মহাজনরা। ইয়াইয়ার ওই ঘোষণার মাধ্যমে মূর্হুতে একটি দেশ পরিণত হয়েছিলো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে। ফলে পরিস্থিতি অনির্শ্চয়তার দিকে ক্রমেই ধাবমান হতে থাকে। যা ছিলো মুক্তিকামী বাঙালিদের কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত-অনাকাঙ্খিত।
১লা মার্চে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খাঁনকে কিছু শর্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেন জেনারেল ইয়াহিয়া খাঁন। বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো শর্ত মানতে রাজি হননি।
ফলে সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খান বঙ্গবন্ধুকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তানে কামান দাগানো হবে’ (গর্জে উঠবে)। ওই হুমকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু টেবিল চাপড়ে গর্জে বলে উঠেন- ‘আপনি আমাকে কিছু করলেও সহ্য হবে, কিন্তু বাংলা এবং বাঙালিদের ওপর কামান দাগানো হলে তার বদলা নেবো’। কোনো কথা না বলে সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খাঁন সোজা চলে যায় পাকিস্তানে।

মার্চের প্রথম দিন থেকেই জেনারেল ইয়া হিয়া খাঁনের সঙ্গে বাঙালিদের ওপর শাসন ভার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়াদি নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টসহ রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভট্টো’র মধ্যকার বিভিন্ন আলোচনা চলছিলো। দিনের পর দিন চলছিলো ওই আলোচনা। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হচ্ছিলো না। ওই সময় বিবিসি’র সাংবাদিক মার্ক টালি বলেছিলেন, ‘মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যকার আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে না। কারণ আলোচনা চলছে দুই বন্ধির মধ্যে সবে মাত্র। একজন ইয়া হিয়া খাঁন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে বন্ধি, অপরজন শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিকামী বাঙালি জনগণের হাতে বন্ধি।’
অপরদিকে, এসব নামমাত্র পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র আলোচনা থেকে বাঙালিদের পক্ষে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত হচ্ছিলো না। তবে মুক্তিকামী বাঙালি জনতারা অতি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রমূলক আলোচনা থেকে কোনো সুফল আসবে না। এ সময় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কিন্তু খোঁজ খবর ঠিকই রাখতেন কোথায় কি হচ্ছে, কেমন আছেন মুক্তিকামী বাঙালিরা। কি বা তাদের সমস্যা। এ নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তায় থাকতেন। আর ভাবতেন কিভাবে বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যায়। জিয়াউর রহমান ওই সময় যতেষ্ট সিনিয়র সেনা অফিসার ছিলেন। তিনি বাঙালিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশল অলম্বন করেন এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ যথাযথ রক্ষা করেন।
বিপুল সংখ্যাঘরিষ্ঠ আসনে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিজয় হলেও তাদের হাতে পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। বরং ক্ষমতায় বসে অদৃশ্য শক্তির কবলে ফেলে দিয়ে পাকিস্তানিরা তাদের হাতে জিম্মী রাখতে চায় মুক্তিকামী বাঙালিদের। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের ইশ্তেহার অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধান মন্ত্রী হওয়ার কথা; কিন্তু তাকে সেই দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়ে মুক্তিপাগল বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিরা যে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় না এবং নিজেদের হাতেই যে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। এই বোধ বাঙালি অফিসার এবং সৈন্যদের মধ্যে ছিলো। মেজর জিয়াউর রহমানসহ বাঙালিরা অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন যে, স্বাধীনতার দাবিকে ধ্বংস করার জন্য “অপারেশন সার্চ লাইট” নামে যে পাকিস্তানি পরিকল্পনা চলছিলো তার সঙ্গে পাকিস্তানি তৎকালীন লে.কর্ণেল জানজুয়া সম্পৃক্ত ছিলো।
১লা মার্চ থেকে গোড়া দেশের মতো চট্টগ্রাম শহরের অবস্থা মোটেও স্বাভাবিক ছিলো না। মার্চের প্রথম দিন থেকেই সেখানেও অবরোধ চলছিলো। স্বাধীনতার দাবি আদায়ের পক্ষে যেনো মুক্তিপাগল বাঙালিরা আন্দোলন এমনকি কোনো প্রকার সংগ্রাম করতে না পারে সেই জন্য পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত ভাবে ব্যারিকেট তৈরি করে। সব ধরনের পাকিস্তানি ষড়যন্তকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ডাক দেন স্বাধীনতার পক্ষে অসহযোগ আন্দোলনের। শুধু অসহযোগ নয়, বঙ্গবন্ধু’র ডাকে স্বাধীকার আদায়ের লক্ষ্যে একাত্তরের এদিন বিদ্্েরাহে ফেঁটে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক, কলকারখানার শ্রমিক এবং আদালতের আইনজীবীগণসহ সর্বস্থরের মুক্তিকামী আপামর জনতা।
ওই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় হোটেল পূর্বাণীতে এক সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন এবং বৈঠক করেন। সংক্ষিপ্ত হস্তান্তর বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২রা মার্চ ঢাকায় হরতাল এবং ৩রা মার্চ বুধবার দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালনের আহ্বান জানান। পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণাকল্পে ৭ই মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।
১লা মার্চে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করারসাথে সাথে ফুঁসে উঠে চট্টগ্রামবাসী। রেডিওতে খবরটি প্রচারের পর পরই চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম পলিটেকিনিকাল কলেজ, চট্টগ্রাম কর্মাস কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শাখা ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান বিরোধী মিছিল বের করে। ওই দিনের একটি মিছিল অন্য সকল মিছিল থেকে একটু আলাদা ছিলো। সেটি ছিলো পূর্ব মাদারবাড়ী রেলগেইটের পাশ্ববর্তী মেথরপট্টি হতে মেথর কালীচরণের নেতৃত্বে বের হওয়া মিছিল। একাত্তরের সংগ্রাম ছিল বাংলার গণমানুষের সংগ্রাম। ওই মিছিলটি তার অন্যতম স্বাক্ষর।
১৯৭১ সালের ১লা মার্চে দিনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘প্রভাতী’ পত্রিকায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ খবর বেরিয়েছিল।
এক. পহেলা মার্চের আগের দিন (রোববার) পিআইএ বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন জাতীয় পরিষদ সদস্য ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। তারা অধিকাংশই ওয়ালী-মুজাফফর ন্যাপের। দুই. রোববার বিকেলে ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, জনাব ভুট্টো তার দলের ৮৩ জন সংসদ সদস্য নিয়ে ঢাকায় আসতে চান। আমি যদি বলি ১৬০ জন সদস্য নিয়ে আমরা পশ্চিম স্থতি কি দাঁড়ায়? পরিষদের আলোচনায় না বসে আগে কী করে আমরা প্রতিশ্রুতি দেব যে ছয় দফা সংশোধন করা হবে? ছয় দফা এখন জনগণের স¤পত্তি, তাদের নির্বাচনীর রায়। ব্যক্তিগত ভাবে এর সংশোধন বা পরিবর্তনের অধিকার আমার নেই। আসলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচাল করার প্রক্রিয়া চলছে। এ চক্রান্তঅব্যাহত থাকলে পরিণামে যা ঘটবে তার জন্য চক্রান্তকারীরাই দায়ী হবেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন সদস্য ও নেতাকে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে তাদের প্রস্তাব গ্রহণের আশ্বাস দেয়া হলে তারা অধিবেশনে যোগ দেবেন বলে যে উক্তি করেছেন, তার উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেছেন, যদি একজন সদস্যও কোন ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাব দেন, তা গ্রহণ করা হবে। আমরা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে অন্যায় কিছু করব না।
এর দু’দিন পরই ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন। তাই বাংলাদেশে সবার মনে উদ্বেল প্রতীক্ষা। আশা ও আশঙ্কার মিশ্র অনুভূতি। শেষ পর্যন্ত জনাব ভুট্টো তার মত পাল্টাবেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার প্রতিশ্রুতি রাখবেনথ এটাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।
গতকাল সকাল ১০টার আগেই জানা জানি হয়ে গেল, দুপুর ১টায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেতারে ভাষণ দেবেন। কী নতুন কথা বলবেন তিনি? দুরু দুরু শঙ্কা, ক¤িপত বুকে সবাই অপেক্ষারত। দুপুর ১টায়
বেতার ঘোষক বললেন, এবার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভাষণ দেবেন। কিন্তু না। ইয়াহিয়ার কণ্ঠ নয়, প্রেসিডেন্টের ঘোষণা পাঠ করলেন অন্য একটি কণ্ঠ জাতীয় পরিষদের বৈঠক ৩ মার্চ বসবে না।
অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রইল। আশা ভঙ্গের বেদনায় সবাই স্তম্ভিত। তারপরই গর্জে উঠল সারা ঢাকা। স্টেডিয়ামের খেলা ভেঙে তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ দর্শক বেরিয়ে এলো রাস্তায়। ঢাকা হাইকোর্টের সামনে একটি স্টেট বাস অগ্নিদগ্ধ হলো। লাখো বিক্ষুব্ধ মানুষ সমাবেত হলো হোটেল পূর্বাণীর সামনে। সেখানে বিকেলে চারটায় শেখ মুজিবের সাংবাদিক সভা। শেখ সাহেব
সাংবাদিক সভা শেষ করে সমবেত জনতার উদ্দেশে বললেন, জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত রাখা একটি চক্রান্তের পরিণতি ছাড়া আর কিছু নয়। সংশি¬ষ্টদের মতামতকে উপেক্ষা করে সংখ্যালগিষ্ঠ দলের প্রতিটি নেতার দাবি মেনে নেয়া হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, স্বৈরতন্ত্র। এর প্রতিবাদে প্রথম কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরদিন ঢাকায়, তারপরের দিন সারাদেশে হরতাল পালিত হবে এবং ৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভা হবে। এ সভায় ঘোষিত হবে আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি। শেখ মুজিব আরও বললে, আগামী ৭ মার্চের মধ্যে যদি বর্তমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটানো না হয়, তবে ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার জন্য তিনি দায়ী থাকবেন না। শেখ মুজিবের এ বক্তব্য সমর্থন করে নুরুল আমিন সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বললেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা অযৌক্তিক এবং দেশের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশের পথে আবার বাধা সৃষ্টির চক্রান্ত।
পহেলা মার্চ আরও দুটি ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশের গভর্নর ভাইস এডমিরাল আহসান পদচ্যুত হলেন এবং সামরিক প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান অসামরিক প্রশাসনেরও দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সামরিক প্রশাসনের ১১০নং সামরিক আইনের নির্দেশে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে শেখ মুজিবের আহ্বানে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তার খবর ও ছবি ছাপা নিষিদ্ধ করা হলো।
মার্চকে বলা হয় স্বাধীনতার বিদ্রোহী মাস। বলা হয় অগ্নিঝরা মার্চ। আবার কখনো কখনো বলা হয় অসহযোগ আন্দোলনের মাস। ‘এক সাগর রক্তের বিনীময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না’ এই স্লোগান নিয়ে প্রতি বছরই ঘুরে আসে বাঙালীদের জীবনে স্বাধীনতার রক্তঝরা মার্চ মাস।

মার্চ মাসে শুরু হয় স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত লড়াই সশস্ত্র সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর লাল-সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বিশ্ব মানচিত্রে নতুন একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে অগণিত প্রাণের বিনীময়ে।
এদেশের শোষিত, নিপীড়িত, অধিকারবঞ্চিত মানুষ স্বাধিকারের জন্য লড়াই করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল জাতিসত্তার স্বরূপ অন্বেষার একেকটি মাইলফলক।
১ লা মার্চ থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে অঘোষিত অসহযোগ শুরু হয়ে যায়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ও লড়াইয়ের ই¯পাতকঠিন প্রত্যয়ে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে থাকে দেশ। একাত্তরের আগুনঝরা মার্চে বীর বাঙালি সেই যে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফেরেনি। মুক্তিযুদ্ধে অগণিত প্রাণ উৎসর্গ করতে হয়েছে, অগণিত মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। আহত ও পক্সগু হতে হয়েছে এদেশের অগণিত মানুষকে। লাখো মানুষের অপরিসীম ত্যাগের বিনীময়ে স্বাধীন হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
মার্চ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি ফিরে পায় তাদের কাখাঙ্কিত স্বাধীনতার সাধ। একাত্তরের এই মার্চ মাসের মতো এমন অগ্নিঝরা, ঘটনাবহুল সমুজ্জ্বল কোনো মাস জাতির জীবনে আর আসেনি। তাই প্রতি বছরের মতো অগ্নিঝরা-রক্তঝরা আন্দোলন-সংগ্রাম আর প্রেরণার মাস মার্চ এলেই বাঙালির রক্তে শিহরণ জাগে। দোলা লাগে মনে। বুক ভরে ওঠে গর্বে। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর কথা। মহাকালের ঘূর্ণায়মান চাকায় ভর করে প্রতিবারই যখন ওই ঐতিহাসিক মার্চ মাস আসে, তখনই অসংখ্য গৌরবদীপ্ত স্মৃতির সাগরে ডুবে যায় গোটা বীরের জাতি। মুক্তিযুদ্ধের জ্বলজ্বলে স্মৃতির পথ ধরেই স্বাধীনতার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য এগিয়ে চলুক আজকের সোনার বাংলাদেশ।

তথ্য সূত্র : দৈনিক আমার দেশ/সমকাল,/সংগ্রাম- ১লা মার্চ, ২০০৯। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম (অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী রচিত)। সাপ্তাহিক উর্মিবাংলা- ১৫ ই আগষ্ট, ২০০৫। দৈনিক জনতা- ১লা মার্চ, ২০১৪ সূত্র : আর্কাইভস ৭১ (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপাদান ডিজিটাল সংগ্রহশালা)। দৈনিক সংবাদ-০১.০৩.১৩ (দৈনিক প্রভাতী পত্রিকার প্রকাশিত খবর।

লেখক : দৈনিক সংবাদের সাবেক সহ-সম্পাদক