বাঙালির উৎসবে বিন¤্রতার রাজত্ব তৈরি হোক

73

kobid_423228338516961eac71fb9.35680659.jpg_xlargeআমাদের রাজপথে তৈরি সকাল/ তৈরি নতুন দিন/ বাজছে দেশের সকল প্রান্তে/ নতুন দিনের বীণ/ এমন বীণে নতুন আওয়াজ/ নতুন দিনের সুর/ বাংলাদেশের স্বপ্নভাসে/ যাচ্ছে বহুদূর…/ যাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে কোথায়/ প্রশ্ন করে মন/ এমনি করেই নববর্ষ/ সাজছে সারাক্ষণ/ সাজতে থাকুক নতুন সুদিন/ বাজতে থাকুব ঢোল/ সুখি এবং সম্মৃদ্ধ হোক বাংলাদেশের কোল…

কতদূর যাচ্ছে বাংলাদেশ-বাংলা নববর্ষ-বাংলা ভাষা-সাহিত্য আর সংস্কৃতি তা জানা নেই আমাদের; তবে এতটুকু জানি যে, বাঙালির ঐতিহ্যের অন্যতম বড় উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নতুন উৎসবে মেতে উঠবে বাংলাদেশ। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপনে নিরন্তর হয়ে আছে এই দিনটি। সারাদেশ উৎসবের আমেজে মেতে উঠার অপেক্ষায় আছে। এই একদিনে আমাদের এই উৎসব উৎযাপনের পেছনে রয়েছে ছন্দিত-নন্দিত ইতিহাস। যে ইতিহাস শুরু হয়েছিলো বাঙালিত্বের গৌরবের মধ্য দিয়ে। সারা বছর যে বাঙালিত্বের গৌরবে বাংলাদেশ সেজে থাকে, সেই গৌরবে গোটা বছর বাঙালিয়ানা অনেকেই বজায় না রাখতে পারলেও এ দিনটি কিন্তু আপাদমস্তক বাঙালির দিন।

বঙ্গদেশ বা বাংলা বহু প্রাচীন নিদর্শন নিয়ে এগিয়ে যাবে বিন¤্র ভালোবাসায়। আর সেই বাংলা ভাষাও কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য লালন করে এগিয়ে চলেছে। পয়লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালনের ধারা অবশ্য বাংলাদেশে অনেক পূরনো নয়। ১৪২৩ সালের এই গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের রয়েছে ছন্দময় অতিত। আর সেই অতিত জানায় যে, সপ্তম শতাব্দীতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার মতে সোমবার ১২ এপ্রিল বা গ্রেরিয়ান ক্যালেন্ডার মতে ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ সনে গৌড়ের রাজা শশাঙ্কই (৫৯৩-৬৩০ খ্রীষ্টাব্দ) বাংলা সনের বা বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। অবশ্য বাংলা সাল-এর উদ্ভাবন নিয়ে এর কৃতিত্ব সুলতান শাহ্ অথবা ভারত স¤্রাট আকবরের অবদানও অনস্বীকার্য বলে মতামত রয়েছে বিভিন্ন মহলের। তিনি ১৫৫৬-এ জন্মগ্রহণের পর থেকে ক্রমশ বিভিন্ন কারনে আলোচিত হতে থাকেন। যার ধারাবাহিকতায় তার জীবদ্দশাতেই তিনি নির্মাণ করেন নিখূঁত বাংলা সাল ও গণনার জন্য ক্যালেন্ডার। অবশ্য ১৬০৫ খ্রীষ্টাব্দে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আন্তরিকতা আর সহমর্মিতার রাস্তা তৈরির বাংলা সাল গণনা ও নববর্ষ উদযাপনের প্রত্যয়। যে কারনে স¤্রাট আকবরের পক্ষেই ইতিহাস ছিলো সবসময়। তাঁরা নিশ্চিত যে তাঁর সময় থেকেই বাংলা সন গণনা শুরু হয়। এটাকে স¤্রাটের খেয়াল বা মর্জি হিসেবে ভাবা হয় না। বরং এর মধ্যে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা, সংস্কারমুখী মন ও প্রজাদরদেরই পরিচয় মেলে।
আমাদের নববর্ষ ও বাংলা সাল গণনার ইতিহাসসূত্র বলছে যে, মুঘল আমলে হিজরী অব্দ অনুসারে রাজ দরবারে কাজকর্ম হত বলে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু হিজরী অব্দের দিণক্ষণ, মাস ইত্যাদি চাঁদের বা চন্দ্রকলার হ্রাস বৃদ্ধির ভিত্তিতে গণনা করা হত। তার ফলে সূর্যের গতির ভিত্তিতে বা সৌর পদ্ধতিতে গণনার সঙ্গে প্রতি বছর অনেকটা ফারাক থেকে যেত। একটি চান্দ্র সাল এক বছর অন্তর ১০ থেকে ১১ দিনে পিছিয়ে যায়। তার ফলে প্রতি ৩২ থেকে ৩৫ বছরে একটি করে বছর বাড়তি হয়ে যায়। হিজরী সালের এই দুর্বলতার জন্য রাজস্ব বা খাজনা আদায়সহ বিভিন্ন কাজে সমস্যা হত। মূলত এই কারণেই আকবরের এক সময় অনাস্থা জন্মায় এই হিজরী অব্দ অনুযায়ী রাজকার্য পরিচালনায়। তাঁর রাজত্ব কালে হিজরী সাল সহ¯্রাব্দের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্য সালগুলিরও সংস্কারের খবর আকবরের নজরে আসে। সেই মতো চান্দ্র সাল থেকে সৌর সাল অনুযায়ী গণনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, আর তা থেকেই বঙ্গাব্দের শুরু। যদিও বঙ্গাব্দ শব্দটির ব্যবহার অনেক পরে হয়। তখন ‘সন’ বলা হত। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষকের ফসল ঘরে ওঠার উপরেই সরকারের রাজস্ব, খাজনার আদায় নির্ভর করত। কিন্তু হিজরী অব্দ চন্দ্রের গতি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল বলে সব সময় কৃষিকার্যের সঙ্গে দিন ক্ষণ মিলত না। ফলে যে মরশুমে সে ভাবে ফসলই ফলত না তখনও খাজনা বা কর দেওয়ার জন্য প্রজাদের বাধ্য করা হত। সেই অবস্থা থেকেই মূলত কৃষকদের রক্ষা করার অভিপ্রায় নিয়েই সৃষ্টি হয় বঙ্গাব্দ। তাই ফসল ওঠার সময়টিকেই বছরের সূচনা কাল স্থির করা হয়। এই জন্য নতুন অব্দকে ‘ফসলী সন’ নামেই লোকে বেশী চিনত। সেই ‘ফসলী সন’-ই নতুন দিনের বারতা নিয়ে আসে সারা ভারতবর্ষে। এপ্রিল মাসে বাংলা বছর শুরুর ইতিহাসটাও অনেককাহনে মোড়ানো। জানা যায়, ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দে আকবরের রাজ্যাভিষেক হয়। ১৪ এপ্রিল, স¤্রাট আকবরের রাজ্যাভিষেকের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ঐ দিনটিকে নতুন সনের প্রথম দিন ধার্য করা হয়। সনটি শুধু বাংলার জন্যই নয়, চালু হয়েছিল গোটা ভারতভূমির জন্যই। পরবর্তীকালে বাংলা বাদে বাকি অংশে এই সনের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যায়। যার ফলে আকবর প্রবর্তিত নতুন অব্দ বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ হিসেবেই গণ্য হতে থাকে। অর্থাৎ বাংলা সন গণনা চলছে মাত্রই সাড়ে চারশো বা ঠিক বলতে গেলে ৪৫৬ বছর ধরে ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে হিসেব ধরে। এবার তা হলে জেনে নেই ১৪২২ সন পেরুলো কী করে, ১৫৫৬ সালে নতুন সৌর সনের শুরু হলেও তার ভিত্তিবর্ষ ৯৬৩-৬৪ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময়ে অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দের সঙ্গে তৎকালীন হিজরী অব্দের তফাতের (৫৯৩-৫৯৪ বছর) ভিত্তিতেই ঐ গণনা করা হয়েছিল। লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে খ্রীষ্টাব্দের সঙ্গে বঙ্গাব্দের তফাৎ ৫৯৩-৫৯৪ বছর। এখানে কিছু দ্বিমত আছে, আর তার মধ্যে রয়েছে- স¤্রাট আকবরের রাজ্যাভিষেকের দিনটি ছিল ১৪-ই ফেব্রুয়ারী, ১৪ এপ্রিল নয়। তা হলে রাজ্যাভিষেকের দিনের স্মরণের যুক্তি খাটে না। তাঁদের মতে, সেই আমলে বঙ্গদেশে সৌর শকাব্দের প্রচলন ব্যাপকতা লাভ করেছিল। তার ফলে আকবরের প্রবর্তিত নতুন সনের বছর-পয়লা দিনটি ঐ শকাব্দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। শকাব্দ আরম্ভ হয় সূর্যমেষ রাশিতে যখন অবস্থান করে, অর্থাৎ মেষ সংক্রান্তির পর। সময়টা এপ্রিলের মাঝামাঝি বা বর্তমান বঙ্গাব্দের বৈশাখের গোড়ার দিক। সেই থেকেই বৈশাখের প্রথম দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে ধরা হয় বলেও মতামত রয়েছে।

ইতিহাস অবশ্য আরো বলে যে, পহেলা বৈশাখ মান্য হওয়ার অনেক আগে বাংলায় বৎসর-পয়লা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম ছিল। একটা সময় অগ্রহায়ণই বা অঘ্রান মাসকেই মার্গশীর্ষ বা প্রথম মাস বলা হত। ওই মাসেই অনুষ্ঠিত হত গ্রাম বাংলার সব চাইতে আনন্দের উৎসব নবান্ন। এই পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ উৎসবটি পালিত হয় বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব হিসেবে , যার সূচনা হয়েছিলো ১৯৬৫ সালে। ঢাকার রমনার ময়দানে আজও পালিত হয় একই আবেগে, একই আন্তরিকতার সঙ্গে। এটি আমাদের প্রাণের উৎসব। আমাদের প্রাণে প্রাণে নিরন্তর উৎসব হিসেবে বাংলা নববর্ষ-নবান্ন-বসন্ত আর শরৎ উৎসব আসুক ফিরে ফিরে। তবে বাংলা নববর্ষ সবসময়-ই প্রেরণায় অগ্রণী থাকবে বলে বিশ্বাস আমাদের-বাঙালিদের।

নতুনের এই উৎসবে-বাঙালীর এই উৎসবে-নববর্ষের এই উৎসবে-বাংলা সংস্কৃতির এই উৎসবে বাংলাদেশ সাজা শুরু করেছে অবশ্য বেশি দিন আগে থেকে নয়। আশির দশকের শুরুতে সাংবাদিক ও উপস্থাপক শফিক রেহমান, চিত্র পরিচালক শহীদুল হক খানসহ দেশের বরেণ্য বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব তাদের আন্তরিকতা আর সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসেন নববর্ষে বাংলাকে স্বাগত জানানোর মহান লক্ষ্যে। আর এই লক্ষমাত্রায় আমাদের বাংলা নববর্ষকে কেন আনা হয়েছে? শুধুই ইসলামী ব্যাংক-জামাত-শিবির-জঙ্গীদের আখড়া বানানোর জন্য? নারী লিপ্সুদের স্বর্গরাজ্য বানানোর জন্য? নারী নির্যাতকদের রাজত্ব বানানোর জন্য? নিশ্বচয়-ই না। যদি তাই-ই হয়; তাহলে আসুন নতুন দিনের আহবানে নিজেদেরকে সাজাই, বাজাই ঢোল আর বাজাই সানাই। পাশাপাশি ষড়যন্ত্রকারী সকল মহলের বিরুদ্ধে লড়তে তৈরি হই-গড়তে তৈরি হই বাংলাদেশ। সাজাই আমার জন্মভূমিকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে। যাতে করে এমন নিরন্তর আনন্দ দিনে না ঘটে অনভিপ্রেত কোন ঘটনা। নারী বা পুরুষ নয়; মানুষ হিসেবে বয়ে চলুক মানুষের এই আনন্দ বহর। যে বহরে রাত নয়; থাকবে দিনের আলো। ঘটবে না কোন নারী নির্যাতনের ঘটনা। এজন্য নতুন প্রজন্মের নগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাই, এই দেশ-এই মাটি-এই মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থাকতে হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া, এইচ এম এরশাদসহ প্রতিটি নাগরিককে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ বা বাংলা নববর্ষ শুধু আনন্দের জন্যই নয়; শিক্ষার-দীক্ষার-ভালোবাসার-সম্প্রীতির এবং আন্তরিকতার জন্য নিবেদিত। আর এই দিনে নতুন উদ্যেমে জেগে উঠতে হবে বিন¤্রতায়-শুভ্রতায়…
শুভ্রতা আর লালের আভায় আসুক নতুন ভোর/ নববর্ষ বাংলায় আসুক খুলুক সকল দোর/ দোর খুলে যাক নতুন আলোয় ভালোয় ভরুক বুক/ উজ্জল হোক বাংলাদেশের সকল প্রাণীর মুখ…