বাংলার গৌরব জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম স্মরণে

89

dr nurol islamবিংশ শতকের শেষ দশকে এই চট্টগ্রামেই গড়ে উঠেছে এমন এক আন্তর্জাতিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শত শত বিদেশী শিক্ষার্থী মেডিকেলসহ বিভিন্ন অনুষদে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ছুটে আসছে প্রতি বছর। তার নাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম সংক্ষেপে (ইউএসটিসি) । ইউএসটিসির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী ২৪ শে জানুয়ারি ২০১৭। চট্টগ্রামের এক নি:স্বার্থবান মানুষ যার নাম না বললে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে তিনি হলেন টিকে গ্রুপের আবুল কালাম যিনি বিনা রশিদে তাঁকে দশ লাখ টাকা দেন কিছু করার জন্য। এ টাকা দিয়েই একটা টিনশেড ঘর দিয়ে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৮৯ সালের ১৩ই মে আই,এ,এইচ, এস, ( INSTITUTE OF APPLIED HEALTH SCIENCES)   এর যাত্রা শুরু হয়। যাকে পরবর্তীতে  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিসি ) নামকরণ করা হয়। উক্ত প্রতিষ্ঠান  আজ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা অনুষদের পাশাপাশি এখানে বিজনেস ফ্যাকাল্টি, সায়েন্স ফ্যাকাল্টির অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স, ট্রিপল ই, বায়োকেমিষ্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি এবং ইংরেজি সাহিত্যে সম্মান কোর্স সহ ¯œাতকোত্তর বিভাগে  কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে। এখানে মেধাবী অথচ গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে স্কলারশিপ নিয়ে অধ্যয়নের সুযোগ অবারিত।
বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতের প্রবাদ পুরূষ যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীয় মেধা ও কর্ম দক্ষতা গুণে বিশিষ্ট স্থান লাভ করেছেন সেই ডা: নুরুল ইসলাম আমাদের চট্টগ্রামের সন্তান এ কতবড় গৌরবের, কত সম্মানের তা  আজকের প্রজন্মের অনেকেই  জানে না। তাঁর জন্ম স্থান হওয়ায় কারণে চন্দনাইশের মোহাম্মদপুর গ্রাম আজ সারা বাংলাদেশে পরিচিত বিশিষ্ট গ্রাম। তাঁর জন্ম ১৯২৮ সালের ১লা এপ্রিল।
বাবা-মা সহজ সরল গ্রামের সাধারণ মানুষ । জ্ঞান হওয়ার আগেই মাত্র চার বছর বয়সে জন্মদাতা বাবা সৈয়দুর রহমানকে  হারান। মা এবং বড় ভাই মোহাম্মদ আসহাবের কাছেই তিনি ধীরে ধীরে শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পন করেন। বাড়ীর পাশের বদল ফকির হাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শুনা করেন।  শৈশবে তিনি  রঘুনাথ পন্ডিতের স্নেহ আদর এবং সঠিক নির্দেশনা পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ওই স্কুল থেকেই তিনি ১৯৪৩ সালে লেটারসহ ম্যাট্্িরক পাস করেন। কলকাতায় ইসলামীয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১ম বিভাগে আই.এস.সি পাস করেন এবং কলকাতা মেডিকেল কলেজ হতে ১৯৫১ সালে এম.বি.বি.এস পাস করে ডাক্তারী পেশাতে মনোনিবেশ করেও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ হাতছাড়া  করতে ছিলেন নারাজ। চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত অবিবাহিত অবস্থায় ১৯৫৪ সালে এফ.আর.সি.পি ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন সমগ্র বাংলাদেশে তখন এমন কেউছিল না। ১৯৬২ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি নিজ জন্মস্থান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক হিসাবে   যোগদান করেন। আর ২৬ শে ডিসেম্বার ১৯৬২ সালে ফটিকছড়ির কৃতি সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর বোন ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক আনোয়ারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অবশ্য বিয়ের আগেই ঢাকার ধানমন্ডি সেন্ট্রাল রোডে তিনি গুলমেহের নামের বাড়িটি করেছিলেন। তাঁর স্নেহময়ী মায়ের নামেই এ বাড়ি। ১৯৫৫ সালে ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় হতে টি.ডি.ডি ডিগ্রী পরীক্ষায় তিনি প্রথমস্থান অধিকার করে  চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এছাড়াও পরবর্তীতে এফ, সি. পি (আমেরিকা) এফ. সি. পি এস (পাকিস্তান) ডিগ্রি অর্জন করে স্বীয় মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৫ সালে পূর্ব-পাকিস্তানে পিজি হাসপাতাল অর্থাৎ আই,পি.জি,এম,আর,  প্রতিষ্ঠা হয়। তৎকালীন প্রাদেশিক মূখ্য সচিব এস, এম, শফিউল আযমের পরামর্শে ডা. নূরুল ইসলাম যুগ্ন পরিচালক পদে ৬ই ডিসেম্বর পিজিতে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে পরিচালকের দায়িত্ব পান। ঢাকায় তৎকালীন বন্ধ হয়ে যাওয়া শাহবাগ হোটেলে ১৯৭১ সালে পিজি স্থানান্তর করা হয়। এক নাগাড়ে ৮৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর পরিচালক ও মেডিসিনের অধ্যাপক হিসাবে তিল তিল করে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলেছেন। যা পিজি হাসপাতালের ইতিহাসে বিরল এবং ভবিষ্যতে এমন গুরুদায়িত্ব আর কখনো কেউ পাবে বলে মনে হয় না। একৃতিত্ব শুধুই ডা: নুরুল ইসলামের। এছাড়া ১৯৫৮ সালে যক্ষা রোগের প্রকোপ হতে দেশাবাসীকে বাচাঁতে জাতীয় যক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠা হয় তাঁর প্রচেষ্টায়।
১৯৬৩ সালে যুক্তরাজ্যে উচ্চ শিক্ষাকালীন সময়ে তিনি নিজে ধূমপান তথা বিষপান বর্জন করেন এবং পূর্ব পাকিস্থানে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লেখালেখি শুরু করেন। স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের অনুপ্রেরণায়  তিনি ১৯৮৭ সালে আমরা ধূমপান নিবারণ করি  ”আধূনিক” সংগঠন  প্রতিষ্ঠা করেন । ডা: নুরুল ইসলামকে সভাপতি এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক এনায়েত উল্লাহ খানকে মহাসচিব করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। আজকে এ সংগঠন সমগ্র বাংলাদেশের শহর থেকে শহরে, প্রত্যন্ত গ্রামের হাটে ঘাটে সবস্থানে মানুষের মুখে মুখে। এরই ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সনদ ও মেডেলে ভূষিত হন। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর বিশেষ স্বীকৃতি এবং সম্মাননা।
বাংলাদেশে জাতীয় ঔষধনীতির প্রথম প্রণেতাও তিনি। ১৯৬৮ সাল হতেই নানা ভাবে তিনি ওষুধ প্রস্তত এবং বাজার জাতকরণের উপর সমালোচনা শুরু করেন। ক্ষেত্র বিশেষে জোর পূর্বক হস্তক্ষেপ শুরু করেন। বাজারে চালু বেশ কিছু ওষুধ যে  সত্যিকার অর্থে ওষুধ নামের অযোগ্য সে বিষয়ে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। মানুষকে সচেতন করতে থাকেন। ফলে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়ে এ বিষয়ে কাজ করার জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করে দেন।  উক্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ডা: নুরুল ইসলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকার ওষুধ অধ্যাদেশ জারী করন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি জীবন বাজী রেখে পিজি হাসপাতাল চালু রেখে দেশের সাধারণ মানুষের ও মুক্তিযোদ্ধাদের সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। বন্দী বঙ্গবন্ধুর পিতা মাতাকে পিজি হাসপাতালে লুকিয়ে  রেখে এক অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি। শুধু তাই নয় যক্ষা হাসপাতালের বরাদ্দ থেকে একশত কম্বল এবং বিপুল পরিমান ওষুধ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন । পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। ভাগ্যক্রমে ১৪ ই ডিসেম্বার বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড থেকে আল্লাহ পাকের অসীম রহমতে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। কলকাতা ইসলামীয়া কলেজে পড়াকালীন ১৯৪৩-৪৪ সালে তিনি বেকার হোষ্টেলে থাকতেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও একই হোষ্টেলে থাকতেন। তিনি তখন রীতিমত জনপ্রিয় এবং লড়াকু ছাত্রনেতা। সেই সময় হতে তাঁদের পরিচয়। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর মায়ের চিকিৎসার ভার পড়ে তাঁর হাতে । এভাবেই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক চিকিৎসক হয়ে উঠেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগষ্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও জাতীয় করি নজরুল ইসলাম , মজলুম মানুষের জননেতা মাওলানা ভাসানী, মাওলানা তর্কবাগীস ও কবি জসিমউদ্দীন সহ খ্যাত নামা অনেক ব্যক্তিত্বের চিকিংসা করেছেন পরম মমতায় এবং তাঁরাও তাঁর গুনমুগ্ধ হয়ে যান।
জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তাঁর মেধার পরিচয় জাতি অবাক বিশ্ময়ে অবলোকন করেছে। লেখক হিসাবেও তার পরিচিতি কম নয়। আন্তর্জাতিক অনেক জার্নালে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। তাঁরই স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত এক নাম। বৃটিশ সাময়িকী তাঁকে ”আই পিজি এম আর”  এর ফাউন্ডিং ফাদার নামে অভিহিত করে। একাডেমি অব সাইন্স প্রদত্ত স্বর্ণপদক, ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট পদক, কলকাতায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সংস্থা ও বিশ্ব বাঙালী সম্মেলনের পঞ্চম মহাসম্মেলনে ”ডা: বিধান চন্দ্র রায় পুরস্কার” গ্রহণ করেন। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য  সংস্থার মহাপরিচালক কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা প্রাপ্ত হন। এছাড়া উক্ত সংস্থার বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য হিসাবে নিযুক্তি পান। যুুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ নীতি  নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান রয়েল কলেজ  অব ফিজিশিয়ান এ ইন্টারন্যাশনাল  এডভাইজার হিসাবে যোগদান করার বিরল সম্মানে ভূষিত হন। এছাড়া ভারতের National Organization For Tobacco Elimination কর্তৃক মহাত্বা গান্ধী পুরষ্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৭ সালে এই বিরল খ্যাতীমান চিকিৎসককে বাংলাদেশের সরকার জাতীয় অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ দেন।
এই মহান চিকিৎসক কোটি মানুষের নয়নের মণি ২০১৩ সালের ২৪ শে জানুয়ারি সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। মানুষকে মূল্যায়ন করার নির্দিষ্ট কোন মানদন্ড নেই। কর্মকান্ড এবং সফলতা দিয়েই বিচার করতে হয়। এদায়িত্ব  উত্তরসূরীদের কিংবা ঐতিহাসিকদের । একজন লেখক লিখেছেন শত কর্মের মাঝেও তিনি বিরক্তবোধ করতেন না। – সদা থাকতেন প্রশান্ত। জ্ঞান আর প্রজ্ঞার প্রকাশ তাঁর উচ্চারন ও আচরণে বুঝা যেত। আড়ম্বর ও বাহুল্য বর্জিত সরলতায় তাঁর ব্যক্তিত্ব সদা সজিব ছিল।
লেখক- খন্ডকালীন শিক্ষক, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ও ইউএসটিসি, চট্টগ্রাম