বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ

17

মোহা. মোস্তাক হোসেন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী সেনাসদস্যরা সপরিবারে যাঁর বুকের রক্ত ঝরিয়ে এক কলঙ্কিত ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছিল; যাঁর মনপ্রাণ ছিল বাংলার নিপীড়িত জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের ওপর; যিনি এই বাংলার জনগণকে সবসময় দরদভরে বলতেন, ‘আমার ভাইয়েরা’; যিনি দেখতে চাইতেন বাংলার জনগণ শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত থাক; যখনই বাঙালি বৈষম্যের শিকার হয়েছে, শোষণ-নিপীড়নের শিকার হয়েছে তখনই নিজের ও পরিবারের কথা না ভেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন; ফলশ্রুতিতে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতন; যেতে হয়েছে কারাগারে; তারপরে যাঁর ধ্যানে সর্বদা ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তি; পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসন হতে বাংলার জনগণ কিভাবে পাবে মুক্তি, কি তার প্রতিকার, কবে আসবে বাঙালির মনে শান্তি এবং কবে দূর হবে বাঙালির মনে পাকিস্তানিদের শোষণের ভয়; দুঃখে পীড়িত বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোর ব্রত গ্রহণকারী আর কেউ নন তিনি হচ্ছেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আপামর বাংলার জনগণ তাঁকে মুক্তির দূত হিসেবে অসীম ভালোবেসেছে এবং তিনিও তার প্রতিদান দিয়েছেন।
বাঙালির ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি বলেছেন, ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মচঞ্চলতা ছাত্রজীবনে লক্ষ করা যায়। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচার্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হন। ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক কার্যকা-ের গতি বৃদ্ধি। তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হতে থাকে এবং তিনি ইসলামিয়া কলেজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা- া, ১৫ ও ১৬)। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী জীবনে তিনি বাংলার অসীম জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন ।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমকালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। সেই সময় বঙ্গভঙ্গ রদকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় হিন্দু জমিদারের সহায়তায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। এতে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা-দীক্ষা ও আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালে লাহোরে এক গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত গোলটেবিলে গৃহীত হয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত গঠিত হবে এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ও পূর্ব অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান এলাকায় একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। তাছাড়া প্রদেশগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় (বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও রাজনীতি : ড. আবুল ফজল হক, পৃষ্ঠা-৬৯)। দ্বি-জাতিতত্ত্ব ও লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে দুটি জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বাংলার জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হয়েও পূর্বের ন্যায় বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। লাহোব প্রস্তাব অনুযায়ী পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হলেও বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র না হয়ে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ পায়। অথচ প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসিত হবে উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়ন না করে বাংলার জনগণকে শোষণ করতে থাকে।
পশ্চিম পাকিন্তানের বৈষম্য ও শোষণ হতে রক্ষার্থে বাংলার জনগণ বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে। আন্দোলনকে বন্ধ করার জন্য তারা বাঙালির ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল। আঞ্চলিক বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসন এবং বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের সম্মেলনে ছয় দফা পেশ করেন। ওই সম্মেলনে নির্বাচনী কমিটি দাবিটি প্রত্যাখ্যান হলে আওয়ামী লীগ সম্মেলন বর্জন করে। সেই ছয় দফা আন্দোলনকে কার্যকর করার উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)-এর প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় সমাবেশ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মুসলিম লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের মধ্যে কার জনপ্রিয়তা কেমন এবং কে বাংলার জনগণের পক্ষে কথা বলে বা পাশে দাঁড়ায় তারই নির্বাচনী লড়াই শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর আওয়ামী লীগ বাংলার জনগণের ম্যান্ডেট লাভের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ। নির্বাচিত শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা না দিয়ে ১ মার্চ ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করে এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বলপ্রয়োগ ও গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালিকে দমন করার ফন্দি করে। এতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয় (বাংলাদেশের জোট রাজনীতি ১৯৫৪-২০১৪ : সাহাবুল হক ও বায়েজীদ আলম, পৃষ্ঠা- ৫৯)।
জনগণের রায়ে নির্বাচিত হয়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দিয়ে পাক-সরকার যে দমননীতি অবলম্বনের মাধ্যমে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখবে, সেটা বাংলার রাজনীতিকসহ সকল স্তরের জনগণ বুঝতে পেরেছিল। ছয় দফার আলোকে শাসনতন্ত্র গঠনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় পাকিস্তানের সামরিক সরকার ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভীত হয়ে পড়ে। এতে করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার চক্রান্ত করতে থাকল (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস : মুহম্মদ জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা ৪-৫)। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার ডাক দেন। সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখান। তিনি ভাষণের মাধ্যমে বাংলার জনগণকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুষ্টচক্র ও কুপরিকল্পনা থেকে সজাগ এবং আশুঘটনার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির প্রতিফলন ঘটেছিল। ২৫ মার্চ রাতে পাকস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানি কারাগারে নিয়ে যায়। বাংলার জনগণকে দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সেই রাতে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহর। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে বিদ্রোহী দমনের অজুহাত দেখিয়ে গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ করে ঢাকায় সেই দিন ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সাত হাজার মানুষকে হত্যা করে। তারা এই কলঙ্কিত সামরিক অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। পক্ষান্তরে বাঙালিদের অন্তরে বেদনাভরা ২৫ মার্চ মধ্যরাত বা ২৬ মার্চ রাতটিকে বাংলাদেশীরা ‘কালরাত্রি’ নামে স্মরণ করে (স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, মুনতাসীর মামুন-মো. মাহবুবর রহমান, পৃষ্ঠা ২১২)। এ অবস্থায় নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বাধীন হয়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ গৌরবময় স্থান ছিনিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার হতে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বিশাল সংবর্ধনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বরণ করা হয়। তাঁকে বরণ শেষে এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক শূন্য দেশকে বিনির্মাণের গুরু দায়িত্ব কাঁধে নেন। এরপর তিনি দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। অথচ তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সুবিধাভোগী মহলের তৎপরতার জন্য দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পুনর্গঠনে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছে। পরাজিত শক্তি স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের সমন্বয়ে স্বাধীনতার মহানায়ককে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনার ছক আঁকে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ১৭ জনকে হত্যা করা হয়। এই কলঙ্কিত ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে পূর্বের ন্যায় সামরিক শাসনের উদ্ভব ঘটে। একদিকে সামরিক শাসনের উদ্ভব, অপরদিকে এই দেশ হারাল বাঙালির মুক্তির দূত, স্বাধীনতার মহানায়ককে। এই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ঘটানোর পর স্বার্থান্বেষী মহল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মহানায়কের অবদানকে এই বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। সেই সুবিধাভোগী মহলের অপচেষ্টার পরও বঙ্গবন্ধুর অবদান, কর্ম ও সৃষ্টির জন্য দেশে-বিদেশে লাখ কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে আছেন ও থাকবেন।
শোকাবহ এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের শাহাদাৎবরণকারী সকলের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মোহা. মোস্তাক হোসেন : লেখক ও শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ