বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট ও নারী নির্যাতন

46

আসমা উষা

‘বিশ্বে যা কিছু চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’- বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার অংশবিশেষ। কথাগুলো অমোঘ সত্য।
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিকভাবেই সে সবার সাথে বসবাস করে। বর্তমানে পৃথিবী অনেক উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। সাথে সাথে মানুষও আগের চেয়ে অনেক সামাজিক, শিক্ষিত ও সভ্য হয়েছে। প্রায় সবকিছুরই প্রকারভেদ রয়েছে। কিন্তু মানুষভেদে মানুষের প্রকারভেদ যে কত বিচিত্র, তা বের করা অসম্ভব। বর্তমানে পৃথিবীর মানুষ তাদের বিভিন্ন আচরণ ও অভ্যাস পরিবর্তন করে অনেকটা সভ্য ও শিক্ষিত হলেও অনেকেই প্রকৃত শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে না। যে কারণে অনেককেই প্রকৃত শিক্ষিত বা সামাজিক বলে গণ্য করা যায় না।
দেশে শিক্ষিত মানুষ বা শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও ‘সুশিক্ষিত’ কয়জন হচ্ছেÑ এ প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেকের মধ্যে মনুষ্যত্ব বা ব্যক্তিত্বের ছিটেফোটা পরিলক্ষিত হয় না। এর কারণ, বিদেশী অপসংস্কৃতিকে গ্রহণ। যার ফলে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে এবং মনুষ্যত্ব লোপ পাচ্ছে। এর দরুন সমাজে সর্বদা হানাহানি, খুনোখুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, ছিনতাই ইত্যাদি ধরনের অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ মানুষ যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার আলোর মাধ্যমে আলোকিত হয়ে নিজের মনুষ্যত্বকে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সেই সমাজ হবে একটি আদর্শ সমাজ। বর্তমানে শিক্ষার হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইভাবে যদি মানুষ তার ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারত, তাহলে আজ আমাদের সমাজে এরকম বীভৎস, নোংরা ঘটনাগুলো ঘটত না।
যেমন নারী নির্যাতনের কথাই বলতে পারি। যেখানে সমাজে একজন অশিক্ষিত ব্যক্তির পাশাপাশি একজন নারী তার শিক্ষিত স্বামীর দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছে। এখানে শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের শিক্ষা ও মূল্যবোধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সবখানেই নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে দুজনই নির্যাতনের শিকার।
নির্যাতন বলতে নারীর ওপর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যে কোনো ধরনের নিপীড়নকেই বোঝায়। আরো সহজ করে বললে, ‘ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নারীরা যখন অন্যের দ্বারা জোরপূর্বক বঞ্চনার সম্মুখীন হয় এবং শারীরিক, যৌন ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সে পরিস্থিতিকে নারী নির্যাতন বলে।’ (সূত্র- ইন্টানেট)
বর্তমানে যে নির্যাতন প্রকট আকার ধারণ করছে, তাহলো যৌতুক নির্যাতন। প্রকাশ্যে, নিভৃতে অনেক নারী যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কাউকে কাউকে বলিও হতে হচ্ছে যৌতুকের জন্য। নি¤œবিত্তদের নির্যাতন টের পাওয়া গেলেও মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের নারীরা লোকলজ্জা বা সামাজিকতার ভয়ে প্রকাশ করতে পারে না। নির্যাতন সহ্য করে নীরবে। মানসিক চাপ নেয়ার ফলে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তও হচ্ছে নারীরা। কিছু কিছু উচ্চশিক্ষিত বা অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি বা পরিবার আছে, যাদের ভেতরটা বিশাল চাহিদা ও লোভে টইটুম্বুর। অনেক ছেলেপক্ষ আছে, যারা তাদের চাহিদা প্রকাশ করে না। তারা মনে করে, চাহিদা ছাড়াই তো আজকাল ‘উপঢৌকন’ (যৌতুক বলাই ভালো) পাওয়া যায়। যে কারণে তারা মেয়েপক্ষের কাছে কোনোরূপ যৌতুক প্রত্যাশা করে না। কিন্তু সেই আশা পূরণে যখন বিঘœ ঘটে, তখনই নারীর ওপর শুরু হয় স্বামী-শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের অমানবিক নির্যাতন। এই নির্যাতন কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নারীর মৃত্যুও ঘটে থাকে। অথচ একজন পিতা যখন তার মেয়ের বিয়ে দেয়, তখন সে স্বপ্ন দেখে যে তার মেয়ে একটি চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানায় যাচ্ছে।
অন্যদিকে একটি মেয়ে একটু ভালোবাসা, ছোট ছোট কিছু আশা ও স্বপ্ন নিয়ে একটি পরিবারে বউ হয়ে আসে। স্বামীর সংসারই তার কাছে ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়।
একজন পুরুষের মনোভাব কেন এমন হবে, যে তার সমস্যা, সংকট বা চাহিদা স্ত্রীর পরিবারই পূরণ করবে? এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন খুবই জরুরি। আমি মনে করি একজন পুরুষ মানুষের মনোভাব এমন হওয়া উচিত, একজন শক্ত সামর্থ্যবান পুরুষ হিসেবে তার পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, তার উন্নতির জন্য নিজেকে তৈরি করা। একজন পুরুষ নিজ পরিশ্রমে কতটা উন্নতি করতে পারছে, সেখানেই তার সার্থকতা হওয়া উচিত। প্রকৃত পুরুষের পরিচয় এখানেই।
বর্তমান সমাজ প্রেক্ষাপটে একজন নারী যে শুধু যৌতুকের কারণেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তা নয়। অনেক শিক্ষিত পরিবারও আছে, যারা কন্যাসন্তান জন্ম দেয়ার কারণেও নারীকে নির্যাতন করে থাকে। আধুনিক সভ্যতার এই উৎকর্ষতার যুগে এমন চিত্রও সত্যিই হতাশার কারণ।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক থেকে আমরা অধিকাংশই মুসলমান। যেখানে আমাদের ধর্মে নারী ও পুরুষকে একে অপরের ভূষণস্বরূপ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নারীর অধিকার, নারীর শিক্ষা, নারীর কর্ম সম্পর্কে বিধান দিয়েছে, নারীকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছে তারপরও বর্তমান সমাজের অনেকেই নারীদের পূর্ণ মর্যাদা বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। অনেকের মধ্যেই এই ধারণা বিরাজ করছে যে, এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তাই তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে যে, নারীকে নিয়ন্ত্রণ করাই পুরুষতান্ত্রিক অধিকার বা কাজ।
অথচ ইসলাম শান্তির ধর্ম। যেখানে প্রত্যেক নর-নারীর প্রতি অধিকার, কর্তব্য, সমতা, মর্যাদা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। অথচ কার কতটুকু অধিকার, মর্যাদা, কর্তব্য সে শিক্ষা আমরা রপ্ত করছি না। শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার মূলমন্ত্র যদি বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করতে না পারি, তাহলে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বা সার্থকতা কোনোটাই সফল হবে না। বরং দেশ ও জাতি অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকবে। একজন নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা বা অধিকার প্রদানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদপত্রের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তার জন্য বিবেক, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সহযোগিতা ও সঠিক মনুষ্যত্ববোধের প্রয়োজন।
পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন ও শাস্তির যেমন বিধান রয়েছে। ঠিক তেমনি নারী নির্যাতন ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও অনেক আইন ও শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে দেশে যতই আইন ও শাস্তির বিধান থাকুক না কেন কিংবা মানুষ যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন বা সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করুক না কেন যতদিন পর্যন্ত মানুষের মন থেকে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের দাম্ভিকতা দূর না হবে ততদিন পর্যন্ত নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো অসম্ভব। যখন সমাজে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, নারীকে তার পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হবে, কন্যাসন্তানকে বোঝা নয় সম্পদ মনে করবে তখনই দেশ নারী ও শিশু নির্যাতনমুক্ত হতে পারবে।
মানুষের পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম একজন মা। আর যুগে যুগে এ দেশে জন্ম নিয়েছেন অনেক মহীয়সী নারীও, যেমনÑ সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া, কামিনী রায়, সেলিনা হোসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ আরো অনেকেই। তাঁরা দেশ রক্ষা, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করেছেন। তাঁরা তাঁদের কর্মে দেখিয়েছেন, নারীরাও পুরুষের থেকে কোনো অংশে কম নয়। একজন নারী তার সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে সমাজের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। অথচ সেই সমাজে নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে করা হয় লাঞ্ছিত, অবজ্ঞা, নির্যাতন, ধর্ষণ।
নারী সম্পর্কে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, “তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিব।” এর গুরুত্ব ক’জনইবা অনুধাবন করছেন?
একজন নারীকে সম্পদ মনে না করে যদি বোঝা মনে করা হয়, তবে মুখে যতই নারী অধিকার, নারী মর্যাদা ও নারী ক্ষমতায়ন সম্পর্কে গলা ফাটিয়ে চিৎকার কিংবা নারীবাদ নিয়ে বক্তব্য দেয়া হোক না কেন, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটলে নারী নির্যাতন কখনই বন্ধ হবে না। এটাও সত্য যে, শুধু পুরুষই নয়, কিছু ক্ষেত্রে নারীরও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন রয়েছে। তাই আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করি। মুখে নয়, মন থেকে নারীকে তার অধিকার ও সম্মান দেই। তাহলে দেখব আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাথে আমাদের জীবন বদলে যাবে। জীবন হবে আলোময়।

আসমা উষা : কলাম লেখক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ