বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ

36

ইমদাদুল হক মামুন

রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই বাংলার দুই আকাশের দুই মহানক্ষত্র। দুজনেই বাঙালি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু বাঙালির প্রতি তাঁদের ছিল অপার ভালোবাসা। “রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি”Ñ এই মানুষ করার চেষ্টা উভয়েই করে গেছেন আজীবন। তা করতে গিয়ে একজনকে প্রাণও দিতে হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষ ও সাহিত্যিক হিসেবে এক অপার বিস্ময়। সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যেদিকে তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা নেই। তিনি যেমন সাহিত্যকে সাজিয়েছেন মনের মতো করে, তেমনি সাজিয়েছেন তাঁর জীবনকে। তাঁর দর্শন বা জীবন দর্শনও সবসময় মানবতাকেন্দ্রিক। তাঁর সাহিত্যের পাতাও মানবতাকে ভর করে দাঁড়িয়েছে। এ মানবতা দেশকে অতিক্রম করে বিশ্ব মানবতার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে তিনি বিশ্বকবি। বিশ্ব তাঁকে এ স্বীকৃতিও দিয়েছে। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক নক্ষত্র।
রবীন্দ্রনাথ যেমন বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্র; ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাংলাদেশের রাজনীতি জগতের এক নক্ষত্র। এই দুই নক্ষত্রের সাথে আমরা যদি মিল খুঁজতে যাই তবে অবাক বিস্ময়ে প্রচুর পরিমাণে মিল খুঁজে পাবো। বঙ্গবন্ধুর সাথে রবীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের সাথে বঙ্গবন্ধু মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন যেমন খুব পজিটিভ ছিল, ঠিক রবীন্দ্রনাথেরও জীবনদর্শন খুব পজিটিভ। তাঁদের উভয়ের জীবনই ছিল পরিপাটি। একজনের জীবন পরিকল্পিত পরিপাটি, আরেকজনের জীবন পরিকল্পিত না হলেও বেশ পরিপাটি। উভয়ের জীবনই ছিল শান্তির। তাঁদের একজন সাহিত্য আর জীবনকে সাজিয়েছেন, আরেকজন রাষ্ট্রকে আর জীবনকে সাজিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবন ছিল চমৎকার সাজানো ও পরিকল্পিত। তাঁর খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, পড়াশোনা, লেখালেখি, ভ্রমণ, জমিদারি সবকিছুই ছিল পরিকল্পনা দ্বারা আবৃত। তাঁর জীবনও ছিল বলা যায় সুখের। কারণ বাহ্যত আমরা তাঁর জীবনে অনর্থ কোনো কিছু দেখতে পাই না। অথচ পৃথিবীর বিখ্যাত সাহিত্যিক বা শিল্পীদের জীবনী যদি আমরা দেখতে যাই তবে দেখব যে, ফ্রানৎস কাফকার জীবন ছিল খুবই যন্ত্রণাময়। ডোরা ডায়মন্ট তাঁর স্ত্রী। তিনি ছিলেন অভিনেতা, সুন্দরী এবং স্মার্ট। তার স্ত্রীর কাছে তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের পাত্র ছিলেন। যার কারণে তিনি স্বাভাবিক জীবন থেকে মুক্তি চাইতেন সবসময়। তাঁর এ মুক্তি পাওয়ার চেতনা থেকেই তিনি রচনা করেন, মেটামরফোসিস। তিনি চাইতেন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু হয়ে জন্মালে হয়ত জীবনের এই যন্ত্রণা থেকে হয়ত মুক্তি পাওয়া যাবে।
মায়কোভস্কি ৩১ বছর জীবনে ৩১ বার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, শিল্পী, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ নাট্যাভিনেতা। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক লিও টলস্টয়ের জীবন তো ছিল অশান্তির চরমে। তাঁর স্ত্রী তাঁকে জীবনের বার্ধক্যে এসেও সন্দেহ করতেন। এ সন্দেহ ছিল অতিচরমে। তাঁর জীবনে অশান্তির মূল ছিল তাঁর বিশাল জমিদারি। তাঁর জমিদারি সীমা ছিল বাংলাদেশের মোট সীমানার এক-চতুর্থাংশ প্রায়। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জমিদারির সমস্ত জমি কৃষকদের মাঝে বিলিয়ে দিতে। অথচ তাঁর স্ত্রী তা করতে দেননি। এজন্য টলস্টয় আজীবন যন্ত্রণা দ্বারা তাড়িত হয়েছেন। আবার তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সমস্ত বইয়ের কপিরাইট না রাখতে। কিন্তু কয়েকটি বইয়ের কপিরাইট ছেড়ে দিতে দেননি তাঁর স্ত্রী। এসব নিয়ে তাঁর পারিবারিক জীবন এত অশান্তির ছিল যে রেলস্টেশনে পড়ে থেকে তাঁর মুত্যু হয়।
একই রকমভাবে জীবনানন্দ দাশের জীবনও ছিল অশান্তির চরমে। রূপসী স্ত্রীর লাঞ্ছনা, বন্ধুদের গঞ্জনা, টিটকারিতে তিনি এতটাই অতিষ্ঠ ছিলেন যে, ট্রাম এসে তাঁকে ধাক্কা দিলেও তিনি টের পাননি। সে ধাক্কাতেরই তিনি মারা যান। অথচ ট্রামের বিকট আওয়াজ বহুদূর থেকে শোনা যায়। আর চলেও বেশ ধীরে! মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো জমিদারের ছেলে হয়েও কপর্দকশূণ্য হয়ে তাঁর জীবন নিঃসঙ্গ অবস্থায় শেষ হয়েছে।
আর অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেনÑ “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে। মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” মানুষের জীবন কতটুকু সুখের শান্তির হলে মানুষ এভাবে নিজের জীবনকে নিয়ে ভাবতে পারে। টলস্টয়ের মতো রবীন্দ্রনাথেরও জমদারি ছিল। কিন্তু সেটা তাঁর জীবনে টলস্টয়ের মতো যন্ত্রণাময় হয়ে দাঁড়ায়নি। জমিদারিকে তিনি কৃষক সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শোষক হিসেবে আবির্ভূত হননি। পৈত্রিক জমিদারির তদারকির দায়িত্বভার নিয়ে ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শিলাইদহে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে এসে তাঁর প্রথমে নজর পড়ে মানুষে মানুষে বিভেদ ও ঘৃণার চরম লজ্জাকর পরিস্থিতি। প্রত্যক্ষত এই অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ ধরে আত্মোদ্বোধন ঘটাতে রবীন্দ্রনাথকে অবশ্য বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। তিনি লক্ষ করেন বর্ণ বৈষম্য ও তার চরম পরিণতি অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধেও তিনি যথেষ্ট সচেতন হন।
রবীন্দ্রনাথ নোবেল লাভ করেন ১৯১৩ সালে। বাংলা সাহিত্যের তখন তিনি গুরু। তিনি গুরু থাকবেন এটই স্বাভাবিক। কিন্তু তিরিশের দশকে এসে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র বর্জন শুরু হয় সচেতনভাবে। এ সময়ের কবিরা লেখককে পুরোনো সময়ের কবি বা মধ্যযুগের কবি বলেও সমালোচনা করতে শুরু করেন। পশ্চিমের আধুনিকতা সাহিত্যে এনে সাহিত্যে আধুনিক প্রলেপ দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু বিশ্বকবি তো বিশ্বকবিই। তিনি কেন এত সহজে টলে যাবেন! আধুনিকতার রঙ তিনিও গায়ে মাখলেন। তবে নিজস্বতা বর্জন করে নয়। খুব সরল ও স্বাভাবিকভাবেই তিনি নিজেকে; নিজের লেখনিকে প্রয়োজনমাফিক পরিবর্তন করে ফেলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ, সব অভিযোগকে একে একে অতিক্রম করলেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। তথাকথিত আধুনিকদের মতো গা ভাসিয়ে দেননি। নিজ কবিতার ধারা, উপন্যাসের ধারা এবং ছোটগল্পের ধারাকে নতুন ছাঁচে তৈরি করেন। রবীন্দ্রনাথকে যারা বর্জন করতে গেলেন, তারাই যেন শেষে রবীন্দ্র প্রভাবিত হয়ে গেলেন। ফরাসি সাহিত্যে যেমন বোদলেয়ারের প্রভাব, রুশ সাহিত্যে এবং সমাজে যেমন আন্তন চেখভের প্রভাব, তেমনি বাংলা সাহিত্য ও সমাজে প্রভাব পড়ে রবীন্দ্রনাথের। কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না তাঁকে। আধুনিকতা মানেই বস্তুবাদিতার কথা; এ কথা প্রচার করেন সে সময়ের কবিরা। কিন্তু যদি শুধু বস্তু জগতের বিষয়ই কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে কবিতার আধুনিকতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। কারণ আজকের এই দিনেও মানুষ বিশ্বাস করে অশরীরী সত্তার। তবে কবিতায় যদি শুধু বস্তুগত বিষয়ই প্রাধান্য পায়, তবে তা হয়ে যাবে আংশিক লোকের সাহিত্য। আর আংশিক লোকের বিশ্বাসের ওপর ভয় করে আধুনিক হওয়া যায় না। কারণ যারা অস্তিত্বে বিশ্বাস করে তাদের ছাড়া কবিতা হবে অসম্পূর্ণ। ফলে বিশ্বাসের জায়গার উপস্থিতি ঘটান রবীন্দ্রনাথ। শুধু তাই নয়, আধুনিক কবিতা যখন প্রকৃতি আর মানুষকে পাশ কেটে ভেরলেনে, ইয়েটস ও পাস্তেরনাকের হাত ধরে সোজা হৃদয়ের গোপন ক্যাফে প্রবেশ করে তখন বাংলা সাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ মানুষের মন কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সম্পর্কে আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেন, “রবীন্দ্রনাথের যুগ অতীত, কিন্তু মাত্র তিন চার দশক পূর্বে তা খুবই বর্তমান ছিল। এই নিকট অতীতকে নিয়ে বিপদ ঘটে সাহিত্যে। সাহিত্যভোগী খোঁজেন আধুনিকতম শৈলী ও মেজাজ। সাহিত্যকর্মীও চান একেবারে নতুন কিছু করে দেখাতে, নইলে তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের হাতে হাতে প্রমান দেওয়া হয় না। আর সদ্য নতুনকে চালু করতে গেলে প্রয়োজন দেখা দেয় যা চলে আসছে, যা হৃদয়-মন-নয়নকে হরণ করে রেখেছে এতদিন, তাকে সরিয়ে ফেলার, অন্তত তার সম্মানের উচ্চাসনটাকে নামিয়ে দেবার, এটাকে কালের ধর্ম বলে মেনে নেওয়া যেত, বিশেষত এই ভরসায় যে, রবীন্দ্রকাব্যের সত্যমূল্য বেশিদিন চাপা থাকবে না।”
ঠিক একইভাবে বলতে হয় বঙ্গবন্ধু বাঙালির জীবনে এত বেশি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন, যে যতই চেষ্টা করুক, বঙ্গবন্ধুর কর্ম বা তাঁর কার্যক্রম বা তাঁর মানবপ্রেম বেশিদিন চাপা দিয়ে রাখা যাবে না। আর যায়ওনি।

রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালের সর্বদেশের। তাই তাঁর সাহিত্যের নেই দেশ-কাল-পাত্র। তাঁর বাণী সব দেশের সব কালের মর্মবাণী। রবিঠাকুরকে খুঁজতে হলে তাঁর জীবন চরিতে বা তাঁর যুগের চরিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। “যে রবীন্দ্রনাথ বসন্তপ্রতীম, যিনি তরুণতম, ঐতিহাসিক তাঁকে চিনবেন না। প-িতেরা তাঁকে বুঝবেন না। যাঁরা তারই মত যাত্রা পথের পথিক, তাঁরাই শুধু নিজ নিজ আলোয় তাঁকে আবিষ্কার করবে।” (অন্নদাশঙ্কর রায়, “রবীন্দ্রনাথ”)।
ঠিক একইভাবে বঙ্গবন্ধুকেও আমাদের চিনতে হবে। তিনি কেন বঙ্গবন্ধু হয়েছেন, মানুষ তাঁকে কেন বঙ্গবন্ধু বলল বা কেন তাঁর ডাকে একেবারে সাত কোটি বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ল তা সত্যিই গভীরভাবে না ভাবলে তার উত্তর পাওয়া যাবে না। একটু বঙ্গবন্ধুর জীবনীটা যদি দেখি তবে বুঝতে পারব তিনি কী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পিতার ইচ্ছে ছিল তিনি বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারি পাশ করে আসুন কিন্তু তিনি তা না করে মানুষের সেবা করার জন্য রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি চাইলেই ব্যারিস্টারি পড়তে যেতে পারতেন, নিজের ক্যারিয়ারকে উজ্জ্বল করতে পারতেন, অনেক অনেক অর্থ এবং সম্মান লাভ করতে পারতেন। কিন্তু মানুষের সেবা করার জন্য তিনি তাঁর জীবনের বড় হওয়ার স্বপ্ন এবং ক্যারিয়ার গঠন করার স্বপ্নকে তিনি চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে গ্রামে টুঙ্গিপাড়ায়। একেবারেই প্রকৃতির মাঝে পথ-প্রান্তর মাঠ ঘাট নদী-নালা খাল-বিল এসবের মাঝেই তিনি বড় হয়েছেন। ছোট থেকেই গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি দরদ ছিল অন্যরকম সবকিছুকে তিনি ভালোবাসতেন প্রাণ দিয়ে গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অন্যরকম সহপাঠী গরিব ছাত্রদের তিনি প্রায়ই তার নিজের বইটা দিয়ে দিতেন। আবার বৃষ্টির সময় পথচারীকে নিজের ছাতা দিয়ে দিতেন। শীতের দিনে দিন-দুঃখীদের বিলিয়ে দিতেন নিজের গায়ের চাদর আর জামা। ছোট একটা ঘটনা এগুলো। কিন্তু একবার ভাবুন তো, আপনি কখনো আপনার নিজের জামা নিজের ছাতা বৃষ্টির মাঝে কাউকে দান করেছেন বা যে ব্যক্তিটা দান করছে তার মানসিকতা কত বড়! বা কি ধরনের মানসিকতা?
সেই সময়ই বসন্ত এবং কলেরা হলে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ মরে যেত, এবং খুব ভয় পেত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ার কারণে। যারা তার সেবা করত তারা আক্রান্ত হতো এবং মারা যেত। যার কারণে আপনজনেরাও এই বসন্ত এবং কলেরা রোগীকে এড়িয়ে চলত। সেবা করার জন্য বেশি কাছে যেত না; কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন তিনি কিশোর, তাঁর গৃহশিক্ষকের বসন্ত রোগ হলো। স্বাভাবিকভাবেই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হবার ভয়ে সবাই দূরে দূরে থাকা শুরু করল। আর সেই গৃহশিক্ষকের ঘরে যাওয়া থেকে সবাই ক্ষান্ত দিল। কিন্তু সব ভয় এবং ভাবনাকে পেছনে ফেলে কিশোর মুজিব গরম পানি দিয়ে নিজের হাতে শিক্ষকের সেবা করেন। বিছানার চাদর বদলে দেন। ওষুধপথ্য খাওয়ানোসহ দিনরাত সেই শিক্ষকের সেবা করে তাঁকে সুস্থ করে তোলেন তিনি।
কবি রবীন্দ্রনাথের সত্তা ছিল প্রধানত দুটি। একটি সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ, অপরটি জমিদার রবীন্দ্রনাথ। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সত্তার অধিকারী ছিলেন তিনি। জমিদারির কারণে যে সময়টা বাংলাদেশে তাঁর কেটেছিল, সে সময়টিকে তাঁর যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলা যায়। জমিদার মাত্রই প্রজাপীড়কÑ প্রচলিত এ কথাটি রবীন্দ্রনাথের বেলায় খাটে না। অন্য জমিদার দেখে প্রজারা পালাত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে দূর-দূরান্ত থেকে দেখতে আসত। মানুষের মনের এত কাছাকাছি ছিলেন তিনি। চাষিদের হাতে যখন টাকা ছিল না, রবীন্দ্রনাথ তখন ব্যাংক খুলে কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি গঠন করেছিলেন কল্যাণবৃত্তি তহবিল। এ কল্যাণ তহবিলের অর্ধেকই দিতেন রবীন্দ্রনাথ আর অর্ধেক দিত প্রজারা। এ ধরনের মানবহিতৈষী মানসিকতার অধিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
এবার একটু বঙ্গবন্ধুর দিকে লক্ষ করি। সেই ৭ মার্চে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেছিলেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। তিনি ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হন। স্বাভাবিক ফুঁসে ওঠা বাঙালি বঙ্গবন্ধু তাকে বিনাবাক্য ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এটা একটা বঙ্গবন্ধুর জীবনী। আমাদের বাঙালি জীবনের একটা পরিচিত এবং সাধারণ ঘটনা। বঙ্গবন্ধুকে বলতে মোটা দাগে আমরা এটুকুই চিনি। কিন্তু আমরা কি বঙ্গবন্ধুর জীবনীটা তাঁর চিন্তা-চেতনা, দর্শন একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছি? তাঁর ব্যক্তিগত নোটবুকে পাওয়া যায়, তিনি লিখছেন একজন মানুষ হিসেবে তিনি কি ভাবছেন? তিনি লিখেছেন একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়ে। আমি ভাবি, একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত; তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং আমার অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।
তখন বঙ্গবন্ধু জনদরদি মানুষ হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। একবার তিনি রাজনৈতিক কাজে গভীর রাতে নৌকাযোগে রওয়ানা দিয়েছেন। সেই সময়ই নদীতে প্রায়ই ডাকাতি ও লুটতরাজের ঘটনা ঘটত। সে রাতে বঙ্গবন্ধু নদীপথে কিছুদূর গেলে সত্যি সত্যি তাঁর নৌকার পিছু নিল একদল ডাকাত। তারা দূর থেকে হুংকার দিলে নৌকামাঝি ভয়ে কাতর হয়ে জিজ্ঞেস করল, হুজুর কী করব? শেখ মুজিব নির্ভয়। বললেন, তুই ওদের কথায় কান না দিয়ে জোরে জোরে নৌকা চালিয়ে যা। নৌকা না থামাতে ডাকাতরা ক্ষেপে গেল খুবই। অনেকক্ষণ নৌকা বেয়ে ডাকাতরা তখন শেখ মুজিবের নৌকার কাছে এসে পড়লে মাঝিরা শেখ মুজিবের দিকে চেয়ে থাকে। তখন মাঝিদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, এবার বল, এটা মুজিবের নৌকা। মাঝি সেকথা ডাকাতদের বলতেই ডাকাতের হুংকার ও চোখ রাঙানি বন্ধ হয়ে গেল। নরম সুরে ডাকাতরা বলল, সে কথা আগে বলবি তো।
লক্ষ করুন, সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, ডাকাতরা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করত। যেখানে ডাকাতরাও শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, সেখানে সাধারণ মানুষের কথা আলাদাভাবে বলা লাগে না। এ ধরনের মানুষহিতৈষী ব্যক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকেই আমরা পাই তার চিন্তা-চেতনা ছিল একেবারেই মানুষের জন্য। সাধারণ মানুষের জন্য। জমিদার রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও একই চেতনা আমরা খুঁজে পাই। বঙ্গবন্ধু কখনোই নিজের জন্য কিছু চিন্তা করেননি। যে মানুষটা সবসময়ই মানুষের জন্য চিন্তা করেছেন, তিনি কি শ্রদ্ধা ভালোবাসা সম্মান পাওয়ার যোগ্য নন! বঙ্গবন্ধুর জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাতে হয়েছে জেলে বসে; জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে। তাঁর জীবন বারবার দুঃসহ নিঃসঙ্গ কারাগারে প্রোথিত হয়েছে। তাঁর জীবনে নিঃসঙ্গ কারাবাস নেমে এসেছে কিন্তু তারপরেও তিনি কখনো আপস করেননি। ফাঁসির দড়িকে ভয় পাননি। তাঁর জীবন ছিল জনগণের জন্যই অন্তপ্রাণ। মানুষের দুঃখে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে বারংবার। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে, সোনার বাংলা গড়বে, এটাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, এই সব মৌলিক অধিকার পূরণের পর মানুষ যেন উন্নত জীবন পায়; দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পায় এবং মানুষ কিভাবে এই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে সেই চিন্তাই তিনি করতেন সবসময়। তাঁর নিজের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে তিনি জনগণের জন্য দাবি আদায়ের আদর্শবাদী এবং আত্মত্যাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সংগ্রাম করে গেছেন। মানুষকে ভালোবেসে কাজ করেছেন সবসময়। তিনি তাঁর দৃঢ় ও যোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে বীর হিসেবে বিশ্বে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে একখ- ভূখ-ের মালিক করেছেন। বাঙালি জাতি হাজার বছর ধরেই স্বাধীন হবার চেষ্টা করে গেছে নিরন্তর, সেই সুলতানি আমল, তারও আগে সেন, পাল। এই অঞ্চলের মানুষজন স্বাধীনতা শুধু একবার পেয়েছিল শশাঙ্ক আমলে। তারপর থেকে তার পরবর্তী যত বাঙালি এসেছেন সবাই চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশকে বা বাংলাকে স্বাধীন বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। অল্প কিছুদিন কেউ কেউ সফল হয়েছিলেন, কেউ কেউ আবার সফলতা শেষে পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে বাংলা ছেড়েছেন। অনেকেই আত্মত্যাগ করেছেন জীবনের; এই স্বাধীন ভূখ- প্রতিষ্ঠা করার জন্য কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সফল হননি। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি। তবে তাই বলে তাদের অবমূল্যায়ন করছি না বা তাদের প্রচেষ্টাকে ছোট করে দেখছি না। কিন্তু যাই হোক না কেন স্বাধীন বাংলাদেশ তো আর প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি কেউই। যেটা পেরেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ঠিক এমনভাবেই বাংলা সাহিত্যকে এমন উচ্চ জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউই নিয়ে যেতে পারেননি। যে যতই বড় সাহিত্য সৃষ্টি করুক না কেন, নোবেল পুরস্কার তো আর কেউই পায়নি। কেউই তো আর বিশ^কবি হয়ে যায়নি। এখানেই দুই ক্ষেত্রের দুই মহারথীর সফলতা।
ষাটের দশকে রবীন্দ্র বর্জন শুরু করে পাকিস্তান। তাঁর সংগীত বাজানো নিষিদ্ধ হয়, বেতারেও তাঁর গান বন্ধ হয়। এর প্রতিবাদ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি কারগার থেকে মুক্ত হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন, “আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, সেক্সপিয়র, অ্যারিস্টটল, দান্তে, লেলিন, মাওসেতুং পড়ি জ্ঞান আরোহনের জন্য। আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি, এবং বাংলায় কবিতা লিখে যিনি বিশ^কবি হয়েছেন। আমরা এ ব্যবস্থা মানি না। আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, এবং আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাইবই। এবং রবীন্দ্র সংগীত এই দেশে গীত হবে।”
বঙ্গবন্ধুর সেই কথা এখনো বাংলাদেশে আবহমান ধরে চলে আসছে এবং চলবে। এরকমই একটা আত্মিক সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে গড়ে উঠেছিল। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান। সেখান থেকে ব্রিটিশ বাহিনীর এক বিশেষ বিমানে করে দিল্লি আসছিলেন, তখন সেই বিমানে বসেই গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটি। শশাঙ্ক এস চ্যাটার্জিকে বঙ্গবন্ধু অনুরোধ করেছিলেন এই গানটা গাওয়ার জন্য। শশাঙ্ক যখন গানটি গাইছিলেন তখন বঙ্গবন্ধুর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিল। এবং তখনই এই গানটা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এক আকাশের দুই মহাতারকা এভাবেই একজন অন্যজনকে অনুভব করেছিলেন। দুজনেই ছিলেন মানবদরদী। এজন্যই হয়ত একজনের নাম অন্যজনের নামের সাথে জড়িয়ে আছে।

ড. ইমদাদুল হক মামুন : শিক্ষক, গবেষক ও লেখক