ফ্রিল্যান্সিং পেশায় এগিয়েছে নারী

137

5চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের আকুন্দবাড়িয়া গ্রামের মানিরা খাতুন। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স পড়ার সময় যুক্ত হন ফ্রিল্যান্সিং পেশায়, এখন তিনি একজন স্বাবলম্বী নারী। গত শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে শেষ হওয়া লার্নিং এ্যান্ড আর্নিং মেলায় জেলার শ্রেষ্ঠ ফ্রিল্যান্সারের পুরস্কার পেয়েছেন মানিরা খাতুন।  গৌড়বাংলার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়ে মানিরার ফ্রিল্যান্সিং পেশায় যুক্ত হওয়া ও ফ্রিল্যান্সিং পেশায় নিয়োজিত নারীদের কাজের সুযোগ, তার আগামী দিনের পরিকল্পনার নানা দিক। সাক্ষাৎক্ষার গ্রহণ করেছেন আব্দুর রব নাহিদ।
গৌড় বাংলা: আপনি জেলার শ্রেষ্ঠ ফ্রিল্যান্সার হিসাবে গত শুক্রবার পুরস্কৃত হয়েছেন, কেমন লাগছে এই প্রাপ্তি ?
মানিরা: খুবই ভালো লাগছে।
গৌড় বাংলা: আপনি কতদিন থেকে ফ্রিল্যান্সিং করছেন, শুরুর গল্পটা যদি বলেন ?
মানিরা: এই তো প্রায় দেড় বছর হতে চললো, ২০১৫ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি, আমি কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে ফেসবুক লাইকসহ বেশ কিছু কাজ করতাম, প্রথম দিকে তেমন বেশি কাজ ছিল না, তারপরও আমি কম্পিউটারে বসে বিভিন্ন টিউটোরিয়াল ভিডিও দেখতাম, আর চেষ্টা করতাম কিছু একটা করার। আমি সব সময় ভাবতাম আমাকে অবশ্যই অন লাইনে কাজ পেতে হবে, সেই অনুয়ায়ী কাজের বিট করতাম। এভাবে একাউন্ট খোলার সমম্ভত ১৫ দিনের মাথায় আমি একটি ফেসবুক লাইকের কাজ পায়। এই ভাবেই চলতে থাকে, প্রথম দিনে মাসে ২-৩ হাজার টাকা আয় হলেও এখন ভালোই আয় হয়।
গৌড় বাংলা: শুরুতে কি কোন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল আপনাকে, সেগুলো কিভাবে সমাধান করেছেন?
মানিরা: আমার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের আকুন্দবাড়িয়া গ্রামে। প্রত্যন্ত এলাকা। এমনও সময় গেছে আমি আমার মডেমটি তারের মাধ্যমে বাড়ির টিনে রাখতাম একটু গতি পাওয়ার জন্য। এছাড়াও একটা সমস্যা হত ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়া। আমি হয়ত একটা কাজ শেষ করেছি, আজই বায়ারকে ডেলিভারি দিতে হবে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তারপরও আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছি, অনেক সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসে হলেও আমি বায়ারকে কাজটা বুঝিয়ে দিয়েছি। আমি মনে করি চ্যালেঞ্জ হিসাবে কাজটাকে গ্রহণ করলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব।
গৌড় বাংলা: আপনি কোন কোন মার্কেট স্পেসে কাজ করেন ও এজন্য আপনাকে দিনে কত ঘন্টা সময় দিতে হয়?
আমি এখন এসইও এবং সোসাল মিডিয়া মার্কেটিং (এসএমএম) এর কাজ করি। ওডেক্স, ফ্রিল্যান্সার, পিপুল আওয়ারসহ বিভিন্ন মার্কেট স্পেসে আমি কাজ করছি। প্রথম দিকে কাজ তেমন ছিল না, তখন ২-৩ ঘন্টা সময় দিতাম, আস্তে আস্তে কাজ বাড়তে থাকে, কাজের উপর সময়টা নির্ভর করে। তারপরও ৪-৬ ঘন্টা এখন সময় দিতে হয়।
গৌড় বাংলা: কাজ শুরুর কতদনি পর প্রথম আয় হয়েছিল এবং কত টাকা পেয়েছিলেন।
মানিরা: আমার প্রথম আয় ছিল ১৭ ডলার কিন্তু আমি সেটা উঠাতে পারিনি। আমাদের এখানে পেপাল সাপোর্ট করে না, আমি তখন পরিচিত একজনের পেপাল একাউন্টে ১৭ ডলার উঠানোর আবেদন করি, কিন্তু ওই একাউন্টটি পরে ব্লক হয়ে যায়। ফলে আমি আমার প্রথম আয়ের ১৭ ডলার হাতে পায়নি। আমি যেহেতু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়তাম, পরে একদিন আমার ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে গিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলি। পরে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে টাকা উঠাতাম। চার্জ একটু বেশি নেয়, কিন্তু পরে কষ্টের টাকা আর জলে পড়েনি। এখন নিয়মিত আমি ব্যাংকের মাধ্যমেই টাকা উত্তোলন করি।

গৌড় বাংলা: এরপর যখন প্রথম আয়ের টাকা হাতে পেলেন তখন কি করেছিলেন ?
মানিরা: আসলে প্রথম আয়ের টাকাটা আমি হাতেই পায়নি, তবে আমি যে ল্যাপটপটা ব্যবহার করি সেটা কিনেছি, আমার আয়ের টাকা থেকে, এছাড়াও আমার লেখাপড়ার খরচ আর বাড়ি থেকে নিতে হয়নি, এছাড়াও পরিবারে বিভিন্ন প্রয়োজনে আমিও আর্থিক দিক দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করি। এছাড়াও একটা জমি কিনার  সময় বাবাকে আয় থেকে জমানো একটা বড় অংশ দিয়েছি। সবমিলিয়ে ভালোই লাগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি, অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়না।
গৌড় বাংলা: এখন আপনার মাসিক আয় কত ?
মানিরা: সব মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকামত বর্তমানে আয় হয়।
গৌড় বাংলা: নিজেকে স্বাবলম্বী করতে নারীদের ফ্রিল্যান্সিং পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ কেমন আছে এবং কেউ চায়লে কীভাবে শুরু করতে পারে, আপনার পরামর্শ কি?
মানিরা: ফ্রিলান্সিং পেশায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একগ্রতা বা ধর্য। আর নারীরা সবচেয়ে বেশি ধর্যশীল হয়। আমি মনে করি কেউ চাইলে পার্টটাইম হিসাবে এই পেশায় যুক্ত হয়ে আয় করতে পারে। অন্তত অন্যের উপর নির্ভর করতে হবে না, নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর প্রয়োজনীয় অর্থ অনায়াসেই আয় করতে পারবে। তবে সবার আগে প্রয়োজন চ্যালেঞ্জ নেয়ার মানসিকতা, সমস্যা হবে কিন্তু ভাবতে হবে অবশ্যই আমি কাজটা করতে পারব, তাহলেই সফল হওয়া সম্ভব। নতুনদের প্রতি আমার পরামর্শ প্রথমেই বেশি টাকা আয়ের চিন্তা না করে, নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার পিছনে বেশি মোনোযোগী হওয়া। ভালো কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেনিং নেয়া, তবে আমি বলব গ্রাফিক্স ডিজাইন এর অনেক সুযোগ আছে, মেয়েদের জন্য এটা বেশি পারফেক্ট মনে হয়। আমি নিজেও পড়ালেখায় ব্যস্ততার কারণে গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ তেমন করতে পারেনি। তবে আমার পড়ালেখা এখন শেষ, আমি গ্রাফিক্স নিয়ে এখন কাজ শুরু করেছি, সাথে সাথে শিখছিও।
গৌড় বাংলা: আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে বলেন ?
মানিরা: আমাদের গ্রামের স্কুলে শেষ হয়েছে স্কুল জীবন, পরে নবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে এইচএসসি পাস করি। এরপর নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হই। অনার্সে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হয়েছি। এরপর রাজশাহী থেকে ফিসারীজে এমএ শেষ করেছি। সেখানেও ফাস্ট ক্লাস হয়েছে।
গৌড় বাংলা: পড়ালেখা তো শেষ করলেন এখন কি ফ্রিল্যান্সিং কেই পেশা হিসাবে নিবেন ?
মানিরা: এখনো চাকুরীর বয়স আছে, চাকুরীর জন্য চেষ্টা করছি, যদি না হয় তাহলে এটাকেই পেশা হিসাবে নিব, তবে আমার চিন্তা চাকুরীর পাশাপাশি পার্টটাইম ফ্রিল্যান্সিং কররো।
গৌড় বাংলা: আপনার পরিবার ফ্রিল্যান্সিং কাজে আপনাকে কেমন উৎসাহ দিয়েছে?
মানিরা: পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কোন কিছুই সম্ভব নয়, আমার মা আমাকে প্রথম একটা কম্পিউটার কিনে দিয়েছিল। বাবা-মা আর আমরা ৪ বোন ও এক ভাই মিলে আমাদের পরিবার সবাই আমাকে  আমার কাজে সহযোগিতা করেছে ও এখনও করছেন।
লানিং এ্যান্ড আনিং মেলায় জেলার শ্রেষ্ঠ ফিল্যান্সারের পুরস্কার পেয়েছেন আপনি, ৫০ দিনের এই টেনিং কার্যক্রমের বিষয়ে কিছু বলুন ?
মানিরা:আমি যখন শিখেছি, তখন অনেক সমস্যা ছিল, কিন্ত এখন বর্তমান সরকারই উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে ফ্রিল্যান্সিং বিষয় গুলোতে ট্রেনিং দিচ্ছে। এর ফলে অনেক বেকারের কর্মসংস্থানের সূযোগ সৃষ্টি হবে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ।
গৌড় বাংলা: আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মানিরা : গৌড় বাংলা ও আপনাকেও ধন্যবাদ।