প্রয়াসের সহায়তায় আচার ব্যবসায় সফলতা এসেছে : জয়ফল সাহা

14
শাহরিয়ার শিমুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রয়াসের সমন্বিত কৃষি ইউনিটের (কৃষি খাত) মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
প্রয়াসের সহায়তা পাওয়া এমনই একজন উদ্যেক্তা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের জয়ফল সাহা। তিনি ১৭-১৮ বছর ধরে বিভিন্ন রকমের আচার (আম, জলপাই, চালতা, বরইসহ) তৈরি করছেন। নিজে আচার তৈরি করে নিজেই ফেরি করে বিক্রি করছেন। আচারের পাশাপাশি বারোভাজাও বিক্রি করেন। নিজে বিক্রি করা ছাড়াও আরো ৫-৬ জন খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে আচার বিক্রি করে থাকেন তিনি।
স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে জয়ফল সাহার পরিবার। বড় ছেলের সেলুনের দোকান রয়েছেন। বিয়েও দিয়েছেন বছর দেড়েক হলো। ছোট দুটি মেয়ের একজন পড়ছেন দশম শ্রেণীতে, আরেকজন প্রথম শ্রেণীতে।
জয়ফল সাহা প্রতিদিন ফেরি করে আচার ও বারোভাজা বিক্রি করেন ১৪-১৫শ’ টাকার। এতে তার প্রতিদিন লাভ হয় প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে অন্য ৫-৬ জন ফেরিওয়ালার একেক জনের কাছে ৯শ’ থেকে ১ হাজার টাকার আচার বিক্রি করেন। সেখান থেকেও তার লাভ আসে ২ হাজার টাকার মতো। সবমিলিয়ে জয়ফলের মাসে আয় ২০ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা। এই ব্যবসা দিয়ে খুব সহজেই সংসার চালাতে পারছেন বলে জানান তিনি।
আগে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিলেন জয়ফল সাহা। হঠাৎ করে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে কৃষিকাজ ছাড়তে হয় তাকে। পরে এই পেশায় নিযুক্ত হন। আর আচার বানানোটা শিখেছেন তার চাচাতো ভাইয়ের কাছে। আর আচার ফেরি করতেন বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এবং সকালবেলা পলশা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে।
জয়ফল সাহা জানান, প্রথম দিকে আচার-বারোভাজা বিক্রি করে লাভ সেরকম হতো না। আচার বানানো, সংরক্ষণ করার মতো কোনো উপকরণ তার কাছে ছিল না। স্বাস্থ্যসম্মত ব্যাপারও ছিল। তাছাড়া গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করতেও কষ্ট হতো। তিনি বলেন, এরকম কষ্টের মুহূর্তে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির লোকজনের নজরে পড়ি আমি। তারা আমাকে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদভাবে বিভিন্ন রকমের আচার তৈরি ও সংরক্ষণ করার উপকরণ সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। আমি তাদের প্রস্তাবে সম্মত হই।
জয়ফল বলেন, প্রয়াস আমাকে আচার তৈরিসহ বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে একটি ভ্যানগাড়ি, চারটা প্লাস্টিক ড্রাম, কড়াই, ডিস, প্লাস্টিকের গামলা, ছুন্নিসহ আরো বেশকিছু উপকরণ দেয়। তিনি বলেন, প্রয়াসের এসব উপকরণ সহায়তা পাওয়ার কারণে আমার ব্যবসাটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি। বলা যায়, প্রয়াসের সহায়তায় আচার ব্যবসায় সফলতা এসেছে আমার। কারণ, তারা আমাকে যে সহায়তা দিয়েছে তাতে আমার অনেক উপকার হচ্ছে।
জয়ফল সাহা আরো বলেন, প্রয়াস থেকে আমাকে বিভিন্ন রকমের আচার তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এছাড়া প্রয়াসের সহায়তা পাওয়ার আগে আমি আচারগুলো সংরক্ষণ করে রাখতে পারতাম না। এখন বিভিন্ন রকমের আচার সংরক্ষণ এবং সারাবছর তা তৈরি করে বিক্রি করতে পারি। এর আগে সিজনের আচার সিজনেই শেষ করতে হতো আমাকে। এতে অনেক সময় আচার নষ্ট হয়ে যেত। এখন সে কষ্ট দূর হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে প্রয়াসের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শেখার ফলে।
কৃষিপণ্য বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়ে কথা হয় প্রয়াসের কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে। তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল ও শাকসবজি নষ্ট হয় শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে। এ দেশে মৌসুমি ফসলের বেশির ভাগই ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই পচে যায়। এছাড়া রাজধানীতে প্রতি বছর আম নষ্ট হয়। আমরা যদি আমের প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে কৃষক লাভবান হবে। এ চিন্তাধারা থেকে প্রয়াস ও পিকেএসএফ’র সহায়তায় আম, বরই, চালতা, তেঁতুল, কাঁঠালের আচার, আমসত্ত্ব ও জেলি তৈরি করছি। আমরা স্ট্রিপিং পদ্ধতিতে আম সংরক্ষণ করছি। ফলে সারাবছর আম থেকে আচার, পাউডার ইত্যাদি তৈরি করতে পারছি। এর ফলে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি, জয়ফল সাহার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে এসব (আচার) তৈরির উপকরণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছি।
প্রয়াসের এই কৃষি কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করে বলেন, সঠিকভাবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারলে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের ভাগ্যের অনেকটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।
উল্লেখ্য, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)’র সহযোগিতায় কৃষিপণ্য বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।