পুকুরে মাছ, পাড়ে সবজি চাষ চাষিদের মুখে হাসি ১২ মাস

42

শাহরিয়ার শিমুল

পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে, অথচ পুকুরপাড় পরিত্যক্ত পড়ে আছেÑ এরকম দৃশ্য ৮ থেকে ১০ বছর আগের। এখন সময় বদলেছে, মানুষ সচেতন হয়েছে। তাই এখন সহসা কোনো পরিত্যক্ত জায়গা চোখে পড়ে না।
আগে পুকুরপাড়ে শুধু ঘাসই উৎপাদিত হয়েছে। এখন সেই অবস্থা নেই। প্রত্যেক মাছচাষিই পুকুরপাড়ের জমিতে শুরু করেছেন শাকসবজি চাষ। উৎপাদিত শাকসবজি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তিটা বিক্রি করে মাছচাষিরা আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন। এখন ১২ মাসই মাছচাষিদের মুখে হাসি লেগেই রয়েছে।
এরকম একজন মাছচাষি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের আইনুদ্দীন। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির মৎস্য ইউনিটের আওতায় তিনি পুকুরপাড়ে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। প্রয়াসের মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শে পুকুরপাড়ে সবজি চাষ করছেন। এতে তার পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বাজারে বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন।
মাছচাষি আইনুদ্দীন বলেন, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির কর্মকর্তারা পুকুরপাড় পরিত্যক্ত ফেলে না রেখে সবজি চাষের পরামর্শ দেন। তাদের পরামর্শেই পুকুরপাড়ে সবজি চাষ শুরু করেছি। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বাজারে বিক্রি করে কিছু টাকা আয়ও করতে পারছি। তিনি বলেন, পুকুরপাড়ে লাউ, কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, করলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ করি। এছাড়া পুকুরপাড়ে সবজি চাষের জন্য আলাদা কোনো পরিচর্যার দরকার হয় না। এখান থেকে যে টাকা পাই তা দিয়ে আমি মাছের জন্য খৈল কিনে থাকি। বর্তমানে চার মাসে পুকুরপাড়ের সবজি বিক্রি করে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করেছি, বলেন আইনুদ্দীন।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে সবজি চাষ নিয়ে কয়েক বছর আগে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)’র সহযোগিতায় কাজ শুরু করে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। জেলার সদর, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি পুকুরে মাছ ও পাড়ে সবজি চাষ হচ্ছে করছেন মাছচাষিরা।
পুকুরপাড়ে সবজি চাষ বিষয়ে কথা হয় প্রয়াসের মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকের সাথে। তিনি বলেন, আগে পুকুরপাড়গুলো পতিত পড়ে থাকত। আমরা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কারিগরি সহযোগিতায় পুকুরপাড়ে সবজি চাষ বিষয়ে মাছচাষিদের উদ্বুদ্ধ করি। নিয়মিত তাদের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এছাড়া কোনো পোকা-মাকড়ের উপদ্রব হলে সেটার জন্য কি কীটনাশক প্রয়োগ করলে মাছের কোনো ক্ষতি এবং সবজিতেও পোকামাকড় হবে নাÑ এ পরামর্শ দিয়ে থাকি।
প্রয়াসের এই মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, কোনো মাছচাষি তার পুকুরপাড় পতিত ফেলে না রেখে সেখানে যদি সবজি চাষ করে, তাহলে বছরে পরিবারের চাহিদা মিটিয়েও বাড়তি সবজি বিক্রি করে ২০-৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারবে।
গোমস্তাপুর উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, দেশে মানুষ বাড়ছে; কিন্তু কৃষিজমি বাড়ছে না। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে বলে তিনি মনে করেন। নাসির উদ্দিন বলেন, পুকুরপাড় পতিত ফেলে না রেখে সেখানে পুঁইশাক, পেঁপে, ঢেঁড়শ, মিষ্টি কুমড়া, পটোল ইত্যাদি চাষ করলে মাছের কোনো ক্ষতি হবে না। এতে দুই দিক থেকেই উপকার পাওয়া যাবে।
নাসির উদ্দিন বলেন, পুকুরপাড়ে সবজি চাষের কার্যক্রমটা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি করছে। তাদের অন্যান্য কার্যক্রমও আমি ঘুরে দেখেছি। তিনি বলেন, পুকুরপাড়ে সবজি চাষের ব্যাপারে অনেকেই জানত না। এখন প্রয়াসের মাধ্যমে অনেকেই জানতে পারছে। এই কার্যক্রমটা প্রয়াসের চালিয়ে যাওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন, আমরা শুধু মাছ চাষটাকেই চিন্তা করে থাকি। যারা এখনো পুকুরপাড় ফাঁকা রেখেছেন তারা যেন সেখানে সবজি চাষ শুরু করেন।
উপজেলার মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রতিবছর পুকুর থেকে যে মাটি তুলে উপরে রাখা হয়, সেখান থেকে অনেক জৈব সার তৈরি হয়। যার ফলে পুকুরপাড়ে সবজি চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পুকুরপাড় যথেষ্ট উঁচু থাকার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবজি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে।