পিএফটিআই’র দশ বছরের সন্তান আমি

14

শ্যামল বর্মন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার একটি গ্রাম খেসবা। প্রত্যন্ত এই গ্রামেরই সন্তান আমি। এই গ্রামে থেকেই সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আর এই চর্চা পূর্ণতা পায় প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটে (পিএফটিআই) যোগ দেয়ার পর।
প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটে যোগদান করি, প্রতিষ্ঠানের পথচলার শুরুর তারিখে অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে। বলাবাহুল্য, এই প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয় ২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির একটি অঙ্গসংগঠন পিএফটিআই। এই প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক নানান কর্মকা- ও ইস্যুতে জনসচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকে।
এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি। কারণ জীবন চলার পথে যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদন যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটাই বিদ্যমান এখানে। একজন মহা জ্ঞানী বলেছেন, মানুষ খাদ্যের অভাবে মরে না, বিনোদনের অভাবে মরে।
আমি ছোট থেকেই গান ভালোবাসি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দুই-একটা বাদ্যযন্ত্রও বাজাতে শিখেছি। চেষ্টা করি অভিনয়ও করার। এবার আসি, প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটে স্থান করে নেওয়ায় কেন আমি গর্বিত? সত্যি বলতে কি, এখানে যোগ দেয়ার পর অনেক শিক্ষাই অর্জন করেছি, এখনো শিখছি। অজপাড়াগাঁয়ের একজন সাধারণ ঘরের ছেলের জন্য এ অনেক বড় পাওয়া।
যখন প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটে যোগদান করি, তখন কয়েকজন সাংস্কৃতিকমনা মানুষ ও তাদের গভীর সংগীতপ্রেম আমাকে কাছে টেনে নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছে। দিয়েছে সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বোধ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট আমাকে বিভিন্নভাবে করে তুলেছে প্রতিভাবান, বাড়িয়ে দিয়েছে পরিচিতি।
আমি থিয়েটারকর্মী, তাই যে কোনো অপরাধ আমার শত্রু। কারণ থিয়েটারের মাধ্যমে বুঝতে পারি কোনটা অপরাধ, কোনটা অপবাদ, কোনটা জীবনের জন্য অপরিহার্য, কোনটা গ্রহণযোগ্য আর কোনটা পরিত্যাজ্য। থিয়েটার মানুষকে ভুল পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে সঠিক পথের দিশা দেখায়। তাই প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট আমার প্রাণ, আমার প্রেরণা, আমার এগিয়ে যাওয়ার বড় হাতিয়ার।
এই পিএফটিআইয়ে অনেক কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে। একটি সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য যেমন একটি পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি আমার থিয়েটারকর্মী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ভূমিকা অতুলনীয়। বেশ কিছু চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি মেশার সুযোগ হয়েছে। যেমনÑ কণ্ঠশিল্পী, নাতি, নানা, ভিন্ন চরিত্র, ইত্যাদি। এইসব গুণে গুণান্বিত হতে যে মানুষটি পরামর্শ আর নির্দেশ দিয়ে চলেছেন তার কৃতজ্ঞতা কখনই ভোলার নয়। তিনি হলেনÑ প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ও রেডিও মহানন্দার নির্বাহী কর্মকর্তা আমার পরম শ্রদ্ধেয় হাসিব হোসেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক ছায়াতলে আমার জীবন-জীবিকা জড়িত।
প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট আমার জীবনে সফলতার চাবিকাঠি। কেননা ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাড়ি উদ্বোধন উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার সল্লা গ্রামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গম্ভীরায় নানা চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে গম্ভীরা দেখে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, যা বলার ভাষা নেই। আমার জীবনে এটা স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।
এছাড়াও বিভিন্ন মিডিয়া, ভিআইপি স্টেজে পারফরমেন্স করতে পেরেছি। বর্তমানে নানার পাশাপাশি নাতি চরিত্রেও অভিনয় করি এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের জন্য। এজন্য কৃতজ্ঞতা। আমি মনে করি প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের অন্যান্য সহকর্মীগণ আমার মা, বাবা, ভাইবোনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কারণ আমরা সবাই সবার দুঃখে দুখি, সুখে সুখি।
পিএফটিআই একটি পরিবার, আর আমি এই পরিবারের একজন দশ বছরের সন্তান।
থিয়েটার একটি শক্তিশালী সম্পদ, এটি সমাজ পরিবর্তনে অতুলনীয় ভূমিকা রাখে। কেননা থিয়েটার হচ্ছে এমন একটি জিনিস, যা জীবনের কথা বলে। একটি বদ্ধঘরের মধ্যে থিয়েটার করে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, পরিবর্তনের জন্য সারাদেশে ছড়িয়ে যেতে হবে মানুষের দ্বারে দ্বারে। তাহলে হয়তো মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করা যাবে; যেমনÑ পথনাটক। সমাজ যখন অসুস্থ ও অস্থির হয়ে ওঠে তখন পথনাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়, চেতনাকে শাণিত করা হয়। সে হিসেবে আমি মনে করি, থিয়েটারের মাধ্যমে নাট্যকর্মীরা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এটাই সমাজে থিয়েটারের প্রয়োজনীয়তা।
প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকতে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

শ্যামল বর্মন : পারফরমার, প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট