পাটের উচ্চ দামে কৃষকরা খুশি হলেও পাটকল মালিকরা হতাশ

4

দেশের বাজারে রেকর্ড পরিমাণ দামে বিক্রি হচ্ছে পাট। পাটের এমন আশাতীত দামে কৃষকর খুশি। বর্তমানে প্রতি মণ পাট সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবু মিলছে না পাট। ফলে পাটের দাম দিন দিন বাড়ছেই।
তবে এত চড়া দামে পাট কিনে পণ্য উৎপাদন করে দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। সেজন্য একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পাটকল। এরই মধ্যে সরকারি পাটকল বন্ধের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি পাটকলও বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও বন্ধের উপক্রম। আর বিগত ২০১৯ সরকারি সব পাটকল সালে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে যেন পাটের স্বর্ণযুগ ফিরে এসেছে। বাজারে পাট বিক্রি করে কৃষকরা খুশি এবং হাটবাজারগুলোতে প্রচুর পাট উঠছে। এবার সারাদেশে সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। ভালো ফলনের পাশাপাশি দামও ভালো। এবার সারাদেশে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর এবার দেশে পাটের উৎপাদনও বেড়েছে। যদিও দেশের প্রায় সব সরকারি পাটকলই বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি পাটকলও এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। পাটের বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পাটকল মালিকরা হতাশ। তাদের মতে, কারসাজি ও মজুতদারির কারণে পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এবার অধিক পরিমাণে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে অনেকে পাট মজুত করে রেখেছে। সেজন্য বাজারে পাটের জোগান কম থাকায় দাম বাড়ছে। এ বছর ৯২ লাখ ২৬ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। আর আগের বছর তা ছিল ৭৪ লাখ। কিন্তু বাজারে তেমন পাট নেই। কারণ সেগুলো বৈধ ও অবৈধ মজুতে আটকা পড়ে আছে। পাটশিল্পের এ ধারা দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ পাট ঘিরে চাষিসহ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সাড়ে ৪ কোটি মানুষের জীবিকা চলছে। পাটের উচ্চমূল্যে দেশের শতাধিক পাটকল বন্ধের পাশাপাশি দেড়শ’ কল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। আর এখনো চালু থাকা মিলগুলোও খুব বেশি দিন চালু রাখা সম্ভব হবে না। বিজেএমএ এবং জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) পাটকলের সংখ্যা ছিল ২৯৬টি। তাতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ২ লাখ। তার মধ্যে এখন দেড় লাখ শ্রমিকই বেকার।
সূত্র জানায়, বিগত কয়েক বছর থেকে দেশে পাটের চাষ কিছুটা থমকে গিয়েছিল। বর্তমানে সারাদেশে পাট চাষ বাড়ানো হচ্ছে। এবার ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষকরা তিন ধরনের পাট চাষ করেছে। প্রতি বিঘা পাট চাষ হয়েছে ৯ মণ। আর বাজারে প্রতি মণ পাট ৩২০০-৩৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, সরকার জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য পাট ও পাটবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সেজন্য উন্নত পদ্ধতি ও কলাকৌশল অবলম্বনে পাটবীজ উৎপাদনে এবং মানসম্মত পাট উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানে জোর দেয়া হচ্ছে। ওই লক্ষে পাট অধিদপ্তর কাজ করছে। পাট উৎপাদন বৃদ্ধিতে ৪৬টি জেলার ২৩০টি উপজেলায় প্রকল্পের কাজ চলছে। তার মধ্যে পাটবীজ উৎপাদন ৩৬টি জেলার ১৫০টি উপজেলায়, পাট পচন ২৮টি জেলার ১০০টি উপজেলায় কাজ করা হচ্ছে। এবার কুড়িগ্রাম, নাটোর, লালমনিরহাট, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা এবং মাদারীপুরে পাটের বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। এ মৌসুমে ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় ২২ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। ওসব এলাকায় প্রতি মণ পাট প্রকারভেদে ২৮০০ টাকা থেকে ৩৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকা আর পরিচর্যা ভালো হওয়ায় এবার কৃষক পাটের ভালো ফলন পেয়েছে। তাতে কৃষকরা অনুপ্রাণিত হওয়ায় আশা করা যায় আগামীতে পাটের আবাদ বাড়বে।
এদিকে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বিগত ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে ৪ দশমিক ২ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয় এবং উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩৮ লাখ টনে। ২০১০-১১ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যথাক্রমে ৭ দশমিক শূন্য ৮ এবং ৭ দশমিক ২৫ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয় এবং উৎপাদিত পাটের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৫ দশমিক ২৬ এবং ১৩ দশমিক ৭৪ লাখ টন। তবে দেশে পাট উৎপাদনে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ খান ইউছুফ (যুগ্ম সচিব) জানান, দেশের পাট উৎপাদন বাড়াতে নানা ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এবার কুড়িগ্রাম, নাটোর, লালমনিরহাট, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা এবং মাদারীপুরে পাটের বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য পাট ও পাটবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ক উন্নত প্রযুক্তির সম্প্রসারণের কাজ করা হচ্ছে। খবর এফএনএস।