পাঁচ বিষয় নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জেলা প্রশাসন : চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বাল্যবিয়ে ও মাদক মুক্ত করতে শুরু হয়েছে উঠান বৈঠক

30

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের অধিক নারী, যাদের বয়স এখন ২০ এর মাঝামাঝি তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে।
জানা গেছে, বাল্যবিবাহের এই হার চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরো বেশি। নানাবিধ কারণে প্রাপ্ত বয়সের আগেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। সামাজিক এই ব্যাধির কারণে মেয়েরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন-কাউকে পেছনে ফেলে নয়Ñ এই নীতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মেয়েরা দেশের উন্নয়নে সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাল্যকালে বিয়ে হওয়া মেয়েরা অল্প বয়সেই মা হচ্ছে। এতে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি তালাকের শিকার হচ্ছে। যে মেয়েকে বোঝা মনে করে মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিল অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েটি তালাকপ্রাপ্ত হয়ে মা-বাবার ঘাড়েই চেপে বসছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকিউল ইসলাম জানান, গত বছর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সময় মাত্র তিন মাসে ৫৬২টি বাল্যবিয়ে হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। আইনের হাত থেকে বাঁচতে অনেকের বিয়ে রেজিস্ট্রেশনই হয়নি। এর ফলে ছেলেপক্ষ খুব সহজেই তালাক দিতে পারছে। কারণ বিয়ের কোনো প্রমাণই মেয়েপক্ষের হাতে নেই। এর থেকে উত্তরণের জন্য ইউনিসেফের সহযোগিতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৪৫টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এই উঠান বৈঠকে জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সচেতনতামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, শুধু বাল্যবিবাহ বন্ধই নয়- নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ, প্রতিবন্ধী কিশোর-কিশোরীদের অধিকার, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মাদক প্রতিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় থাকছে।
জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন- গতানুগতিক সভা-সেমিনারের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি ওয়ার্ডে, পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে গ্রামের মানুষদের নিয়ে উঠান বৈঠক করছি। উঠান বৈঠকে বাল্যবিবাহের কুফল, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ, প্রতিবন্ধী কিশোর-কিশোরীদের অধিকার, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে। এই উঠান বৈঠকের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। মানুষ দেখছে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা গ্রামে গ্রামে যাচ্ছে।
গত বুধবার সন্ধ্যার পর নাচোল উপজেলায় ২টি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নাসিরাবাদ-দুলাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম উঠান বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক আনিছুর রহমান খাঁন, নাচোল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিথিলা দাস, নাচোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম, নাসিরাবাদ-দুলাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
পরে নেজামপুর ইউনিয়নের নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক আনিছুর রহমান খাঁন, নাচোল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিথিলা দাস, নেজামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হক, নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিনসহ অন্যরা।
এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় শীতবস্ত্রও বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সুশীল সমাজ।