পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি : এখনো অজানায় রয়ে গেছে গ্রামের নারীর কাছে!

62

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

এখন চাইলেই যে কোনো সক্ষম নারী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করে জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। হাত বাড়ালেই এ সুবিধা এখন সারা দেশে পাওয়া যায়। তবুও আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামের নারীদের এখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। আর এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো সামাজিক কুসংস্কার ও জড়তা। যেখান থেকে এখনো খুব কমসংখ্যক গ্রামের নারীই বেরিয়ে আসতে পারছে, ফলশ্রুতিতে বছর পেরিলেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়তেই থাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে খাদ্যের চাহিদাও। যার প্রভাব গিয়ে পড়ে সমগ্র দেশের ওপর।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রামের নারীদের মনোভাব সরেজমিন জানতে প্রতিবেদক কথা বলেন বেশ কয়েকজন দম্পতির সঙ্গে। তবে জড়তা কাটিয়ে উঠে কথা বলতে সময়ও নিয়েছেন এইসব দম্পতি।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চরবাগডাঙ্গা গ্রাম। এ গ্রামটিতে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বিষয়ে কথা হয় কয়েকজন দম্পতির সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগেরই বাল্যবিয়ের স্বীকার এবং সন্তান-সন্ততি দুইয়ের অধিক। এই বিষয়ে খুব একটা সচেতনও নন তারা, এটি তাদের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি।
তবে জড়তা কাটিয়ে উঠে তাদের আশার আলো দেখাতে পেরেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’ এফএম ৯৮.৮ এর সামাজিক সংলাপ। এই সংলাপের মাধ্যমে ওইসব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পেরেছেন, যা পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। চলতি মাসের ২১ তারিখ চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে রেডিও মহানন্দার পক্ষ থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক একটি সামাজিক সংলাপের আয়োজন করা হয়েছিল।
সামাজিক সংলাপের পরে কথা হয় দীর্ঘমেয়াদে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বেছে নেয়া কয়েকজন দম্পতির সাথে। এদের একজন মহালি, বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, বাড়ি চরবাগডাঙ্গা গ্রামেই। তিনি বলেন, আমার দুটি সন্তান আর সন্তান নিতে চাই না, তাই আমার স্বামীর সাথে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি নিয়েছি। এতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না আমার, এমনকি স্বামীর দিক থেকেও কোনো অসুবিধে নেই।
পঁচিশোর্ধ্ব লাবনীর বাড়িও একই গ্রামে। স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজের সুবাদে বেশির ভাগ সময়ই বাইরে থাকেন। আর তাই ৩ বছর মেয়াদি ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতি নিয়েছন বলে জানান তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি কর্মসূচির সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের নানা রকমের পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে খাবার বড়ি (পিল), কনডম, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইইউডি, ভ্যাসেকটমি (এনএসভি), টিউবেকটমি (লাইগেশন) পদ্ধতি। একেক পদ্ধতি একেক ধরনের। দম্পতিগণ শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং পদ্ধতির ধরন বুঝে তাদের পছন্দসই পদ্ধতি গ্রহন করে থাকেন ।
আগের চেয়ে বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। আগামীতে এ পদ্ধতি আরো অনেক দম্পতিই গ্রহণ করবেন বলে আশা করছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা জানাচ্ছেন, খাবার বড়ি খেলে ১/৪ দিন বড়জোর ৭ দিন গর্ভধারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতিদিন খাবার বড়ি খাওয়া বা কনডম ব্যবহার করা অনেকের কাছেই ঝামেলার মনে হচ্ছে। তাছাড়া এক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ থেকে বাঁচার জন্য অনেক দম্পতি ১৫ দিন বা ১ মাস আবার কেউবা কয়েক মাসের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির খোঁজ করেন। সে জায়গা থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল আজিমের কাছে ইমপ্ল্যান্ট সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র প্রজেস্টোরেন হরমোন সমৃদ্ধ অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যা মহিলাদের বাহুতে চামড়ার নিচে স্থাপন করা হয়। ৩-৫ বছর মেয়াদি এই পদ্ধতির কার্যকারিতার সময় নির্ভর করে এর রডের সংখ্যা এবং হরমোনের ধরনের ওপর। ইমপ্ল্যান্ট প্লাস্টিক বা সিলিকন রাবারের তৈরি এক বা একাধিক ক্যাপসুল বিশিষ্ট ডিভাইস, যার ভিতরে কৃত্রিম প্রজেস্টোরেন হরমোন থাকে। চামড়ার নিচে স্থাপনের পরপর ক্যাপসুলের গায়ের অসংখ্য অণুবীক্ষণিক ছিদ্র দিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় হরমোন নিঃসৃত হতে থাকে।”
ইমপ্ল্যান্ট কাদের জন্য উপযোগী এ প্রসঙ্গে আনোয়ারুল আজিম বলেন নবদম্পতি, “যারা দীর্ঘদিনের জন্য জন্মবিরতি চান, যারা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান, যারা ইস্টোজেন সমৃদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন না, তাদের জন্য উপযোগী।” এছাড়া ইমপ্ল্যান্টের সুবিধাদি সম্পর্কে তিনি বলেন, “খুলে ফেলার সাথে সাথেই গর্ভধারণ ক্ষমতা ফিরে আসে। নবদম্পতিরাও ব্যবহার করতে পারেন। যৌনইচ্ছা বা যৌনমিলনে বাধার সৃষ্টি করে না। প্রসব-পরবর্তী মা, যারা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন যাদের সন্তানের বয়স ৬ সপ্তাহ তারা এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন। যারা ইস্ট্রোজেন সমৃদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন না তাদের জন্য এটি উপযুক্ত একটি পদ্ধতি।”
দীর্ঘমেয়াদি অন্য পদ্ধতি হচ্ছে আইইউডি যা কপারটি নামে পরিচিত দেখতে “ইংরেজি ‘T’ অক্ষরের মতো। উপকরণটি পলিথিলিন প্লাস্টিকের তৈরি এবং এর দ-ে তামার সূক্ষ তার জড়ানো থাকে, যা মহিলাদের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ফলে শুক্রানু এর সংস্পর্শে আসলে এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। যেসব দম্পতি আর সন্তান নিতে চান না তাদের জন্য আইইউডি পদ্ধতি সবচেয়ে বেশী (১০০%) কার্যকর ।
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে আইপাস-বাংলাদেশ। কথা হয় এর বিভাগীয় সমন্বয়কারী আসলাম সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি বলেন, “মানুষের মাঝে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে আরো বেশি বেশি ধারণা দিতে হবে। আর এরই অংশ হিসেবে ইউকেএইডের অর্থায়নে, আইপাস-বাংলাদেশ এবং বিএনএনআরসি’র সহযোগিতায় রেডিও মহানন্দা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে এ বিষয়ে সামাজিক সংলাপের আয়োজন করছে। যেখানে নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী থেকে সব বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে।” তিনি বলেন, “এমন অনেক দম্পতিই আছেন, যারা বিয়ের পর দ্রুত গর্ভধারণ করতে চাচ্ছেন না, এসব দম্পতিগণ বড়ি বা কনডম এর ঝামেলা এড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।
সঠিক তথ্য না জানার কারণে বেশিরভাগ মানুষ প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিতে আগ্রহী হচ্ছে না। তবে সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই বলে মনে করেন আসলাম সিদ্দিকী।
বর্তমানে সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে কাজ করছে দেশের কমিউনিটি রেডিওগুলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও “রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম” পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে নিয়মিত রেডিও টকস্, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সচেতনতা বিষয়ে প্রোমো বাজিয়ে থাকে। বর্ণনা দিয়ে চলেছে পরিবার পরিকল্পনার সুফল সম্পর্কে। আর মাঠপর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা এবং সঠিক তথ্য জানাতে সাধারণ মানুষদের নিয়ে সামজিক সংলাপের আয়োজনও করছে তারা।
দেশের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সচেতনতাবৃদ্ধির পাশাপাশি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিকগুলো পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের সূর্যের হাসি ক্লিনিকের ক্লিনিক ম্যানেজার শামিমা আক্তার বলেন, “কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করার আগে সে সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রহীতাদের যখন একটা স্বচ্ছ ধারণা হবে, তখনই তাদের পক্ষে একটি পদ্ধতি বেছে নেয়া সহজ হবে।”
তিনি আরো বলেন পরিবার পরিকল্পনা করা স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দায়িত্ব, যদিও এ সম্পর্কিত পদ্ধতিগুলো বেশির ভাগই নারীদের জন্য ব্যবহার্য। তবে একজন পুরুষও তার জন্য যেসব পদ্ধতি প্রযোজ্য, সেগুলো ব্যবহার করতে পারে এবং একজন নারীকে পদ্ধতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমর্থন ও সহযোগিতা করতে পারে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বিষয়ে স্বামীর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পেলে স্ত্রীরা এ পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী হবেন বেশি, অনেকেই তাই মনে করেন। আর তা হলে গড়ে উঠতে পারবে একটা সুখী সমৃদ্ধ পরিবার।