পরিবারের হাল ধরতে ‘মৃৎশিল্পী’ হয়ে উঠছেন শিশু মলি

50

মৌটুসী চৌধুরী

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সেতুর উত্তর পাশে রাইফেল চত্বরের ডান দিক দিয়ে চলে গেছে নতুন বাজারের রাস্তা। সদর উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত জনবহুল এই রাস্তা দিয়ে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়বে মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিস রোদে শুকানোর জন্য আশপাশে রাখা আছে। যে কেউ এ দৃশ্য দেখলেই অনুমান করে নেবেন, এটি পালপাড়া। যেখানে নারী-পুরুষ মাটি নিয়েই সারাদিন কাজ করেন।
পালপাড়ার সেই গলিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে একেকজনকে একেক কাজ করতে। কেউ মাটি মাখছে, কেউবা চরকি ঘুরাচ্ছে; আবার কেউ নিপুণ হাতে রংতুলি দিয়ে পুতুল বা অন্যান্য সামগ্রী রং করতে ব্যস্ত। গলির ভেতরে ৪-৫টা বাড়ির পর চোখে পড়ে একটা ভাঙচোরা বাড়ি। আর বাড়ির সামনেই একটি কিশোরীকে আনমনে কাজ করতে দেখা যায়। বাড়িটা একেবারেই ছোট, সামনের দরজাটা খোলা। সেখানে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে মাটির তৈরি সব কাঁচামাল।
জরাজীর্ণ বাড়িটির একপাশে কোনোরকম ইটের দেয়াল থাকলেও সামনের দিকে গাঁথুনি ছাড়াই থরে থরে গোছানো আছে ইট। হাত দিলেই হয়তো পড়ে যাবে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও, কমজোরি বাল্বের আলো বাড়ির দীনতাকে আরো ফুটিয়ে তুলছে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবে স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে বাড়িটি।
এই বাড়িতেই বাস কিশোরী মলির। পুরো নাম মলি রানী পাল। বয়স আর কত হবে, ১৩ বা ১৪। অথচ এই বয়সে পরিবার আগলে রাখার দীপ্ত প্রত্যয় তার চেহারায়। এই বয়সেই তিনি বুঝতে শিখে গেছেন, জগৎ সংসার কী জিনিস! যে বয়সে হেসে-খেলে-গেয়ে আর পড়াশোনা নিয়ে থাকার কথা; সেখানে তাকে সংসারও সামাল দিতে হচ্ছে। পরিবার সামলাতে হয়ে উঠছেন মৃৎশিল্পী। তবে দমে যাননি, মায়াবী এই কিশোরী। সবকিছু সামলিয়ে গানের চর্চাটা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছেন। গান আর হারমোনিয়াম বাজানো শিখতে সপ্তাহে একদিন একটি প্রতিষ্ঠানেও যাচ্ছেন।
পরিবারে দরিদ্রতা ভর করলেও ছিল আনন্দ; কিন্তু সে আনন্দে ভাটা পড়ে দেড় বছর আগে। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মলির বাবা দীপক পাল মারা যান। বড়ভাইও আলাদা থাকেন। আরেক ভাই পঙ্গু। সড়ক দুর্ঘটনায় তার পা দুটো অকেজো হয়ে যায়। এই অবস্থায় পরিবারের ছোট্ট মেয়েটির ঘাড়েই যেন সব দায়িত্ব এসে পড়ে। যে ছোট্ট নরম হাতে খেলনা নিয়ে খেলার কথা মলির, সে ছোট্ট হাত দিয়ে সুনিপুণভাবে তৈরি করে চলেছেন শিশুদের জন্য খেলনাসহ অন্যান্য মৃৎসামগ্রী।
বয়সে ছোট হলেও এলবিসি আইডিয়াল গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মলির মনোবল অনেক শক্ত। মা সন্ধি রানী পালও অসুস্থ। কোমরের ব্যথায় হাঁটাচলা খুব কমই করতে পারেন। কাজও করতে পারেন না সেরকমভাবে। যেটুকু করেন, বসে থেকেই করতে হয়। আর জোগাড়যন্ত সবই মলিকে করে দিতে হয়। সহযোগিতা করতে হয় হেঁসেলঘরেও।
“আমার বাবা নাই, তাই জীবনে আমাদের কিছু নাই। মার অসুখ। তাই সংসারের কাজের পাশাপাশি মাটির কাজ করে পড়ালেখা করছি। আমার প্রয়োজন বা ইচ্ছা থাকলেও আমি প্রাইভেট পড়তে পারি না।”
মাটির ঢাকনা তৈরি করতে করতে এক নিঃশ^াসে কথাগুলো বলছিলেন মলি। আবেগ থাকলেও কথাগুলো ছিল স্পষ্ট। আর মায়াভরা চোখ দুটিতে ছিল করুণ আক্ষেপ। মৃৎশিল্পের দুর্দিনে এই শিল্পকর্ম করে সংসার সামলাচ্ছে সে, এই যেন তার অভিব্যক্তি।
মলির লেখাপড়া স্কুল পর্যন্তই। অর্থাৎ অর্থাভাবে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ার সুযোগ নেই। স্কুলে যেটুকু শিখেন, তাই বাড়িতে বসে নিজের চেষ্টায় তা ঝালিয়ে নেন। মা-ও অসুস্থ। তাই খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠতে হয় মলিকে। পরিবারের জন্য খাবার তৈরির পাশাপাশি নিজের জন্যও বেঁধে নেন। স্কুল থেকে এসে আবারো মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে হয়। এরপর বসতে হয় মৃৎসামগ্রী বানাতে।
আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয় মলির জীবনটা। আগে হেসেখেলে বেড়ালেও বাবা মারা যাবার পর ধীরে ধীরে এসব কাজ রপ্ত করতে হয় তাকে, পরিবারকে ঠিক রাখতে। যতটুকু সময় পান, সংসারের কাজ আর মাটির আসবাব তৈরিতে সময় চলে যায়। মলি এই কষ্টটুকু স্বীকার না করলে যে তাদের দুমুঠো খাবার জুটবে না।
আসবাব বানানোর জন্য মাটি কোথা থেকে নিয়ে আসে, কিভাবে এসব মাটির জিনিস তৈরি করেÑ জিজ্ঞাসা করতে ঠোঁটের কোণে সামান্য শুকনো হাসি দিয়ে মলি বলে উঠেন, ২০০ টাকার মাটি কিনলে ৩০০ থেকে ৪০০টি সামগ্রী বানানো যায়। যেগুলো বিক্রি করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়। তবে এই পরিমাণ সামগ্রী বিক্রি করতে ১০ থেকে ১৫ দিন লেগে যায়। কখনো ১ মাসও পার হয়ে যায়। আবার সবসময় এই কাজ করা যায় না। বিশেষ করে বর্ষার সময়। আর এভাবেই কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন চলছে, সরল স্বীকারোক্তি মলির।
কথা হয় মলির মা সন্ধি রানী পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ১ কাঠারও কম জায়গায় বাড়িটি। বাড়ি করব বলে ইট কিনি; কিন্তু দেড় বছর আগে মলির বাবা ক্যানসারে মারা যান। আর বাড়ি করা হয়ে ওঠেনি। ইটগুলো ওইভাবেই পড়ে আছে। তিনি বলেন, মলির বাবা মারা যাওয়ার পর চোখেমুখে অন্ধকার দেখি। মেয়ে মানুষ, তাই বাইরে কোনো কাজ করতেও যেতে পারি না। তাই কষ্ট হলেও বংশপরম্পরায় পাওয়া এই মাটির কাজই করি।
সন্ধি রানী বলেন, আমার ছোট ছেলে অ্যাকসিডেন্ট করে পঙ্গু। স্বামীও নেই। আমার কষ্টের আর সীমা নেই। এখন আমি দুই বেলা খাবার জোগাড় করতে পারি না, সেখানে এই বাড়ি করা, মলিকে মানুষ করা স্বপ্নের মতো লাগে। তিনি বলেন, আমাদের বেশি জায়গাজমি নাই, এই জন্য মাটির জিনিস বানিয়ে সেটি শুকানোর জন্য কোনো জায়গা থাকে না। প্রতিবেশীরা অনেক ভালো, তাই অন্যের জায়গায় শুকাতে পারি।
“আমি কাজ করে সংসার চালাব, না আমার ওষুধ কিনব, না জামাকাপড় কিনব। কোনোকিছুই ভেবে স্থির করতে পারি না। বাবামরা এই মেয়েটা (মলি) যদি পাশে না থাকত, তাহলে আমরা হয়তো ভেসে যেতাম। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একা হাতে সংসারের সব কাজ করে আবার স্কুলে যায়। একদিনও স্কুল বাদ দেয় না। তার খুব ইচ্ছা পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হবে। আর আমিও চাই না, আমার ছেলেমেয়েরা মাটির কাজ করুক।” আর কথা বলতে পারেন না সন্ধি রানী পাল।
মলির প্রতিবেশী কাকি পপি রানী পাল জানান, বাবা (মলির) মারা যাবার পর অনেক কষ্টে দিন যাপন করছে তারা। আমরা তো সেরকম সাহায্য করতে পারি না। তারপরও চেষ্টা করি, পাশে দাঁড়াবার জন্য। পপি রানি পাল আরো বলেন, যদি মলির স্কুলের বেতন কিংবা পড়ালেখার জন্য কেউ সাহায্য করত, তাহলে হয়তো মেয়েটা ঝরে পড়ত না।
বারঘরিয়ার এই নতুন বাজারে আরো অনেকেই বংশপরম্পরায় মৃৎসামগ্রীর কাজ করেন। যদিও এই শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একে অবলম্বন করে জীবনযাপন করা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে পরিশ্রম অনুযায়ী পারিশ্রমিকও মেলে না। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে মলির গল্পটা যেন পালপাড়াকে নতুনভাবে চেনাচ্ছে।