পনের পার হলো প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের

30
শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিম-লে একটি পরিচিত নাম ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট’ (পিএফটিআই)। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে সংগঠনটি আজ ১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সফলতার ১৬ বছরে পদার্পণ করল। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোকজ সংস্কৃতিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষায় গোটা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট। স্বীকৃতিস্বরূপ নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ টেলিভিশন, চ্যানেল আই, আমেরিকান দ্রুতাবাস, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে। দেশের অন্যান্য জেলা শহরেও পারফর্ম করে চলেছে পিএফটিআই।
২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর পথচলা শুরু প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের। এটি গঠনে উদ্যোগী হন চাঁপাইনবাবগঞ্জের উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা সংগঠনটি আজ অত্যন্ত সফলতা এবং সুনামের সঙ্গে দেশের সাংস্কৃতিক পরিম-লে কাজ করে চলেছে।
বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বলেই বাংলার জনমানুষের আকার, অবয়ব, চেহারায় এত বৈচিত্র্য। তেমনি নানা ভাষাজাতির আগমনে সংস্কৃতিতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। তবে পল্লী ও কৃষিপ্রধান এই বাংলাদেশে গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির প্রভাবই বেশি। আবার নদীর খেয়ালি আচরণ আর প্রকৃতির ঋতুবৈচিত্র্য বাঙালিমানসকে বিচিত্রভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আর তাই বাঙালির সংস্কৃতি বুঝতে এই বৈচিত্র্যময় পটভূমি খেয়ালে রাখতে হয়।
লোকসংস্কৃতি লোকসম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস ও আচার-আচরণ, জীবনযাপন প্রণালী, চিত্তবিনোদনের উপায় প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি। এটা সম্পূর্ণই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি তাদের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মাধ্যমে আনন্দময় পরিবেশে লোকশিক্ষা প্রদান করার লক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (পিএফটিআই)’। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধারণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, গবেষণা ও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার লক্ষে কাজ শুরু করে সংগঠনটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকজ সংস্কৃতি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতেও কাজ করেছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট।
প্রত্যেক বাঙালির শিরা-উপশিরায় তার নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত। কাজেই যে কোনো তথ্য জনগণের অন্তরে গেঁথে দিয়ে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এই আঙ্গিকগুলো অধিক কার্যকরী। প্রাচীন বাংলার উল্লেখযোগ্য জনপদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নিজস্ব সম্পদ গম্ভীরা। গম্ভীরার মূল উদ্দেশ্যই থাকে সমাজের নানা অসঙ্গতি হাস্যরসাত্মকভাবে তুলে ধরা। এতে মুখ্য চরিত্রে থাকেন একজন নানা ও একজন নাতি। সঙ্গে কয়েকজন বাদ্যযন্ত্র বাদক ও দোহারী।
গম্ভীরায় নানা-নাতি দুজনেই পাড়াগাঁয়ের অতি সহজ-সরল মানুষের ভূমিকায় বিভিন্ন তথ্য আঞ্চলিক ভাষায় অভিনয়, নৃত্য ও গানের সুরে সুরে দর্শকদের মাঝে উপস্থাপন করে থাকেন। যাতে করে সাধারণ মানুষ বিনোদনের মাধ্যমে নানা-নাতির পরিবেশিত তথ্যগুলো খুব সহজেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। তবে গম্ভীরার এই নানা-নাতির পোশাক, কথা বলার ঢং সবকিছুর মধ্যেই ফুটে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গ্রামের সহজ সরল কৃষকের ছবি। গম্ভীরার প্রধান চরিত্র নানার পরনে থাকে ছেঁড়া লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি, মুখে পাকা দাড়ি, মাথায় মাথল, হাতে লাঠি। নাতির পরনে থাকে হাফ প্যান্ট বা লুঙ্গি, ছেঁড়া গেঞ্জি, কোমরে গামছা, কখনো গামছার আঁচলে বাঁধা থাকে ছাতু ও কালাইয়ের রুটি। গম্ভীরার আরেকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। আর তাহলো তাৎক্ষণিক বিভিন্ন তথ্য এতে সন্নিবেশ করা। অর্থাৎ গম্ভীরা দল যে কর্মসূচিতে যোগ দিতে যায়, তখন সে কর্মসূচির উদ্দেশ্যের আলোকেই গম্ভীরা সাজিয়ে থাকেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি এই গম্ভীরায় প্রয়াস ফোক থিয়েটার ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সাধারণত প্রচলিত ধারার গম্ভীরায় নানা ও নাতির মধ্যে শুধু গান ও আলাপচারিতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এর মূল বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে ছোট-বড় অনেক তথ্যই দর্শক-শ্রোতার কাছে বোধগম্য হয় না। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গম্ভীরার পূর্বনির্ধারিত বিষয়বস্তুর তথ্যগুলো আরো সহজতরভাবে দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে উপস্থাপন করার জন্য কয়েকটি নাট্যাংশ তৈরি করে পিএফটিআই। যাকে তারা বলছে ‘গম্ভীরা নাট্য’। এক্ষেত্রে গম্ভীরার প্রতিটি কথাই হয় তথ্যনির্ভর।
গম্ভীরা ও গম্ভীরা নাট্যের পাশাপাশি বাংলার প্রায় হারিয়ে যাওয়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একটি মাধ্যম পটগান নিয়ে কাজ করছে পিএফটিআই। দর্শকদের মাঝে তথ্য পৌঁছে দেবার জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এটি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। পটগান এমনই এক মাধ্যম, যা দ্বারা সব ধরনের দর্শকদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়। কারণ পটগানে ছবিও প্রদর্শিত হয় এবং সেই ছবির বর্ণনা নৃত্য ও গানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। এতে করে ছবি দেখেই কাক্সিক্ষত তথ্য পেয়ে যান কোনো কোনো দর্শক। আবার কিছু কিছু দর্শক আছে, যারা গান শুনেই নির্ধারিত বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হন। আবার একইসাথে ছবি ও গান শুনে বিষয়টি বুঝতে সহজ হয় কোনো কোনো দর্শকের। এভাবে দর্শক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে পটগানও বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেছে।
প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের গম্ভীরা, পটগান ছাড়াও অন্য আঙ্গিকগুলো হচ্ছেÑ আলকাপ গান, কবিগান, কিচ্ছা কাহিনী, লাঠিখেলা, সত্য পীরের গান, মনসার গান, মেয়েলী গীত এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি। এই আঙ্গিকগুলোর মধ্যে থেকে পিএফটিআই কয়েকটি নিয়ে পরীক্ষামূলক নাট্য নির্মাণ করেছে এবং ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট, তিনি হলেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন। সংস্কৃতি অনুরাগী এই মানুষটি বলা যায়, ‘অক্সিজেন’ দিয়ে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউটকে ১৫ বছর ধরে টেনে নিয়ে চলছেন। কেননা বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যাওয়া একটা খরুচে বিষয়। সেটাকে মেনে নিয়েই ফোক থিয়েটারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি।

লেখক: অফিসার, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি