পথ চলতে হবে করোনাকে সঙ্গে নিয়েই…

48

সাজিদ তৌহিদ

পুরো বিশ্ববাসী এখন আতঙ্কে। নিকট অতীতে এভাবে কেউ এরকম আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে কিনা, তা কেউই মনে করে বলতে পারছেন না। এই আতঙ্কের বয়স পাঁচ মাস অতিক্রম হতে চলেছে। আরো কতদিন এভাবে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পার হতে হবে তার কোনো সঠিক হিসাবও এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারেননি, সামনেও আসেনি। আদৌ এই হিসাব পাওয়া যাবে কিনা, তাও পরিষ্কার নয়। গবেষণা চলছে। চলছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টাও। হাজির করা হচ্ছে একেক সময় একেক তত্ত্ব। কোনটি সঠিক, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরূপণ করা সম্ভব নয় তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্বব্যাপী এই মহাআতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। গত বছর ডিসেম্বরের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে প্রথম এই ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। তারপর উহান থেকে ছড়িয়েছে গোটা বিশ্বব্যাপী। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ (২২ মে, দিবাগত রাত ১টা ৩৮ মিনিট) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৫ জন। মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৪১। করোনার মহামারিতে আক্রান্ত কিংবা মৃতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা জানার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
সর্বোচ্চ আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জনস হপকিনস বিশ্ববদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৯ জন। যে দেশ থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি, আক্রান্ত তালিকায় সেই চীনের অবস্থান ১৩ নম্বরে। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৪ হাজার ৮১ জন। মৃতের তালিকায়ও প্রথমে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে মৃতের সংখ্যা ৯৫ হাজার ৪৯৫ জন। আর চীনে মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৮ জন।
এখানে একটা কথা উল্লেখ করতেই হয়, তাহলো এই লেখা প্রকাশের সময় এসব পরিসংখ্যানের অবশ্যই পরিবর্তন ঘটবে।
এই মহামারি করোনার বীজ বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে সরকারিভাবে প্রথম আক্রান্তের কথা ঘোষণা করা হয় গত ৮ মার্চ। এরপর প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন এ বিষয়ে; যা এখনো চলমান। বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ২৭ নম্বরে। দেশে প্রতিদিনই রেকর্ড শনাক্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৩০ হাজার ২০৫ জন। আর মৃতের তালিকায় বাংলাদেশ ৩৮ নম্বরে। মৃতের সংখ্যা ৪৩২ জন।
করোনা ভাইরাস নিয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতি গণমাধ্যম মারফত অবগত হলেও দেশে তা স্বচক্ষে অবলোকন করা গেছে। করোনার কারণে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। থমকে যায় কর্মকাÐ। ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে চলছে সাধারণ ছুটি। এর মেয়াদ আগামী ৩০ মে পর্যন্ত। ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ গণপরিবহনও। সরকারিভাবে আক্রান্তের ঘোষণার পর নানা বিধিনিষেধও জারি হয়েছে।
করোনায় একটি শব্দের সঙ্গে দেশের মানুষের পরিচয় ঘটেছে তা হলো ‘লকডাউন’। দেশের কোনো এলাকায় কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে তার বাড়ি ক্ষেত্রবিশেষে তার পুরো গ্রাম, কখনোবা পুরো এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এসবই চলছে দুই মাস ধরে। করোনায় সামাজিকতার সংজ্ঞা বদলেছে। ধারণা, হয়তো বর্তমান সংজ্ঞায় ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত হয়ে যাবে।
কথা হলো, জনজীবন স্থবিরতার শেষ কোথায়? কতদিনই বা মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখা যাবে? সরকারিভাবেই বা কতদিনের জন্য সাধারণ মানুষের খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করতে পারবে?
অথচ গত কয়েক দিন থেকে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। সেক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপে কি আরো কঠোরতা অবলম্বন করা হবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
তবে এটা ঠিক যে, করোনা ভাইরাস নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা, পর্যালোচনা পড়ে-শুনে নিজের কাছে মনে হয়েছে, আগামী দিনে করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে। কেননা পেটের তাগিদ, বড় তাগিদ। তাকে উপেক্ষা করে চাইলেই ঘরবন্দি থাকা সম্ভব হবে না। সরকারের পক্ষ থেকেও বিধিনিষেধ মেনে চলে সীমিত আকারে কার্যক্রম চালানোর জন্য বলা হচ্ছে। কেননা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। কাজেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে ঘর থেকে বের হয়েই করোনার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার, ঘরবন্দি হয়ে নয়। সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ঘরবন্দি থাকলে দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। যদিও বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কয়েক মাস যাবৎ বিশ্ববাণিজ্যও স্থবির হয়ে আছে।
এখন যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তাহলো ঘর থেকে বের হলেই কি জীবনযাত্রা আগের মতো স্বাভাবিক হবে। মনে হয় না তা হওয়ার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে আছে। সেক্ষেত্রে বিকল্প কি? বিকল্প বলতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সামাজিক দূরত্ব মেনে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে পাঠদান চালাবে, অফিস-আদালতগুলোও সামাজিক (এর চেয়ে শারীরিক বলাটাই ভালো) দূরত্ব মেনে কার্যক্রম চালাবে। তারপরও কথা থেকে যায়, পরিবহনের অর্থাৎ যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে কি হবে। অটোরিকশাতে গাদাগাদি করে বসতে হয়, বাসে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে হয়, ট্রেনের সিটেরও একই অবস্থা। বাস-ট্রেনের এক সারি সিট থেকে আরেক সারির দূরত্ব ৩ ফিটেরও অনেক কম। আরো নানান সমস্যা রয়েছে। সেসবের ক্ষেত্রে সমাধান কি হতে পারে বা হবে, তা জানা নেই। জানার বলতে এটুকুই, ঘর থেকে বের হতেই হবে করোনার চোখ রাঙানির সত্তে¡ও। করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে এ লড়াই করতেই হবে।

সাজিদ তৌহিদ : গৌড় বাংলার বার্তা সম্পাদক ও লেখক