নতুন পাঠ্যবইয়ের ভুল শুধরাতে এনসিটিবির কমিটি

62

indexনতুন পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র সমালোচনার পর ভুলগুলি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। যেসব ভুল নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সেগুলো ছাড়াও নতুন শিক্ষাবর্ষের সব বই পরিমার্জনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ইতোমধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা। গতকাল শুক্রবার তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ের সব ভুল-ক্রটি ঠিক করে সংশোধনী শিট দেওয়া হবে। এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) অধ্যাপক কাজী আবুল কালামকে আহ্বায়ক করে গঠিত তিন সদস্যের এই পর্যালোচনা কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন পেতে আরও সময় লাগতে পারে জানিয়ে অধ্যাপক নারায়ণ বলেন, ভুলগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে হয়। কোথায় কীভাবে ক্রটি হয়েছে পুরো বইগুলো দেখা হবে। কমিটি বলেছে, আরেকটু সময় লাগবে। যারা বই রচনা করেছেন, পা-ুলিপি দেখেছেন। প্রতি বছরই নতুন বই প্রকাশের পর পরিমার্জন করা হয় জানিয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন বই প্রকাশ করা হয়। এত কাজের মধ্যে কিছু ভুল-ক্রটি হয়, সবার সাহায্য নিয়ে তা সংশোধন করব। ভুল কোন পর্যায় থেকে এসেছে সেটা বের করা হবে। যেটা হয়েছে হয়েছে, একটা সংশোধনীতে যেতে হবে, আমরা সংশোধনী দেব। বছরের প্রথম দিন ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থীর হাতে এবার ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে সরকার। নতুন বই বিতরণের পরদিন গত ২ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বইগুলো দেওয়ার কথা জানিয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, তারা বইগুলো দেখছেন, এটা ধারাবাহিক পরিমার্জন। আমরা বিষয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলব। কি ধরনের ভুল সেগুলো দেখা হবে। ২০১২ সালে তৈরি করা নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী ২০১৩ সালের প্রথম দিন নতুন বই হাতে পায় শিক্ষার্থীরা। সে সময়ও ভুল-ক্রটি সংশোধন করা হয়েছিল জানিয়ে অধ্যাপক নারায়ণ বলেন, এখনও ওই কারিকুলামই আছে। তবে কোনো গল্প পরিবর্তন, ভুল থাকলে সেগুলো পরিবর্তন অর্থাৎ, পরিমার্জন করা হয়েছে। কোনো একটা কবিতা দেওয়া হয়েছে কিন্তু দেখা গেল ওই কবিতাটি ওই বাচ্চার জন্য কঠিন হয়ে গেছে তখন আমরা ওরকম একটা কবিতা রিপ্লেস করে দিই। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারও জানিয়েছেন, পাঠ্যবইয়ের ভুল দ্রুত সংশোধন করতে এনসিটিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব কর্মকর্তার অবহেলায় পাঠ্যপুস্তকে ভুল হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন মন্ত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন শেখ পাঠ্যবই প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে বলন, শিশুরা এখন থেকেই যদি ভুল শেখে তাহলে আজীবন তা তাদের মধ্যে থেকে যাবে। সবারই যে কোনো এক ধরনের বানানরীতি অনুসরণ করা উচিত। পাঠ্যপুস্তকে ভুল থাকার জন্য যারা দায়ী তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, শুধু সংশোধনী দিলেই হবে না। আমি মনে করি শিশুদের বইগুলো নতুন করে মুদ্রণ করে দেওয়া উচিত। গত ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ভুল-ক্রটি ধরে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। বানান ভুলের খতিয়ান তুলে ধরে অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন- শিশুদের পাঠ্যবইয়ে এসব কী শেখানো হচ্ছে। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে লেখা হয়েছে, ‘ও’-তে ওড়না চাই; যা নিয়ে ফেইসবুকে চলছে তুমুল সমালোচনা। ২০১২ সালে নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ২০১৩ সালে বিতরণ করা বইয়েও ‘ও’-তে ওড়না চাই বাক্যটি লেখা ছিল। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে শুনি ও বলি পাঠে একটি ছাগলের ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, অজ (ছাগল) আসে। আম খাই। এক সময় অ-তে অজগর শেখানো হলেও তার বদলে শিশুদের বইয়ে প্রায় অপ্রচলিত ‘অজ’ শব্দের ব্যবহার সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আবার আম খাওয়া বোঝাতে একটি আম গাছের নিচের অংশে দুই পা তুলে একটি ছাগলের দাঁড়িয়ে থাকায় ছবি দেওয়া হয়েছে সেখানে। এই ছবি নিয়ে কেউ কেউ ফেসবুকে লিখেছেন, ছাগল নাকি গাছে উঠে আম খায়। তৃতীয় শ্রেণির একটি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবির নিচে ইংরেজিতে একটি বাক্য লেখায় বানান ভুল হয়েছে। এই বাক্যে আঘাত করা বোঝাতে গিয়ে হার্ট বানান লিখতে ভুল হয়েছে। লেখা হয়েছে, উঙ ঘঙঞ ঐঊঅজঞ অঘণইঙউণ. তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় বেশ কয়েটি লাইন বিকৃত করার কথা জানিয়ে ফেসবুকে তারও সমালোচনা করেছেন অনেকে। মূল কবিতায় আছে ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’। আর বইয়ে ছাপা কবিতায় লেখা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে?’ এ ছাড়া ‘মানুষ হইতে হবে- এই তার পণ’ এর বদলে লেখা হয়েছে ‘মানুষ হতেই হবে’। অষ্টম শ্রেণির গল্পের বই আনন্দপাঠ নিয়েও সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ। এই বইয়ে সাতটি গল্পের সবগুলোই বিদেশি লেখকের গল্পের বাংলা অনুবাদ; দেশি লেখকের কোনো গল্প সেখানে নেই। পাঠ্যবইয়ে ভুল হওয়া উচিত নয় মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের স্ট্রং পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কারণ (শিক্ষাখাতে) যেটুকু সুনাম হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বইয়ে ঘন ঘন পরিবর্তন করলে শিশুদের ওপর তার প্রভাব পড়ে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নিজে বানিয়ে কিছু লিখে দিলাম সেটা উচিত নয়। ভাষারও একটা স্বকীয়তা আছে, সেটা না জানলে সমস্যা। পাঠ্যবই থেকে যুক্তাক্ষর তুলে দেওয়া ‘অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মনজুরুল। তিনি বলেন, সব কিছুকেই কেন সহজ করতে হবে? ছোটবেলায় যদি যুক্তবর্ণ না শেখে তাহলে কখন শিখবে? কানাডায় বিদ্যালয়গুলোতে তিনটি ভাষা শেখানোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মাতৃভাষা যদি সহজ করে শেখাতে হয় এটা তুঘলকি কা-, এগুলো পরিহার করতে হবে।