নতুনদের আগ্রহ কম, বংশপরম্পরায় টিকে আছে কাঁসা-পিতল শিল্প

15

উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা

আম কাঁসা-পিতল, লাক্ষা, রেশম ও নকশিকাঁথার ঐতিহ্য ধারণ করে আছে দেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। যদিও এসবের আগের সেই সুদিন আর ফিরে আসেনি। এর বিকল্প হিসেবে অন্যান্য পণ্য কম দামে পাওয়ায় কাঁসা-পিতলের চাহিদা কমতে শুরু করে। বলাবাহুল্য, আম এই জেলার অর্থনৈতিক কর্মকা-ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এইসব শিল্পের মধ্যে অন্যতম কাঁসা-পিতল। বাঙালির ঘর-গৃহস্থালি ও সংস্কৃতির সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঁসাশিল্পের নাম ছিল দেশজুড়ে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে কাঁসার জিনিসপত্র তৈরির জন্য বর্তমান পৌরসভার রামকৃষ্টপুর, শংকরবাটী, শান্তিমোড়, বটতলাহাট, মাঝপাড়া, আজাইপুর ও রাজারামপুর এলাকা ছিল বিখ্যাত। এসব গ্রামের মানুষের একসময় ঘুম ভাঙত হাতুড়ির টুংটাং শব্দে। ভোররাত থেকে সারা দিন কর্মব্যস্ত থাকতেন ওই এলাকার হাজার হাজার কারিগর। কোনো কারখানায় তৈরি হতো পিতলের কলস, আবার কোথাও কাঁসার বাটি, কোনোটিতে থালাসহ কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন তৈজসপত্র ও ঘর সাজানোর উপকরণ।
জেলাশহরের আজাইপুর এলাকার পুরোনো কারিগরদের একজন সাইদুর রহমান। প্রায় ৬৫ বছর ধরে কাঁসা-পিতলের বাসনপত্র তৈরির কাজ করছেন তিনি। বাবা মারার যাবার পরে পড়াশোনা ছেড়ে মাত্র ৭-৮ বছর বয়সেই তিনি এই কাজে যুক্ত হন। সে সময় তার গ্রামের প্রতিটি ঘরেই কাঁসা-পিতলের পণ্য তৈরির কারখানা ছিল।
সাইদুর রহমানরা ৪ ভাই একসঙ্গে এই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি জানান, দেশ স্বাধীন হবার পরে বেশির ভাগ কারখানায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেসময় নওগাঁ, নাটোর, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁসা-পিতল তৈরির কাজ শুরু হতে থাকে। তখন এই জেলার একেকটি গ্রুপে প্রায় ২০-৫০ জন করে কারিগর সেসব জায়গায় গিয়ে কাজ করতে শুরু করে।
সাইদুর রহমান বলেন, এই কাজে যেসব ভাংড়ি তামা লাগে, এইগুলো তো আমরা পাই না। বরং এইসব পণ্য জেলার বাইরে সরবরাহ করার পারমিট না থাকায় ধরপাকড় করা হতো। আবার বাইরে থেকেও কাঁচামাল আনতে না পারার কারণে কাঁসা-পিতলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, তাই মানুষের আগ্রহ থাকলেও চাহিদা কমে যাচ্ছে। যদি কাঁসার তৈরি জিনিসপত্র জেলার বাইরেও সরবরাহ বাড়ে, তবে তারা (কারিগর) কাজও বেশি করতে পারবেন এবং মজুরিও বাড়বে।
আজাইপুরের আরেকজন কাঁসার কারিগর শহীদুল ইসলাম জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে থেকে বংশপরম্পরায় এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা। তিনিও ৪০ বছর ধরে কাঁসার কাজ করে এলেও পারমিট (কাঁসা বহনের অনুমতিপত্র) পাননি। তিনি জানান, কাঁসার বাসনপত্র ভেঙে গেলেও এর ভালো দাম পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে ২০০০-২১০০ টাকা কেজি দরে কাঁসার বাসন-কোসন বিক্রি হচ্ছে। আর পুরাতন কাঁসা কেনা হচ্ছে ১৫০০ টাকা কেজি দরে।
শহীদুল ইসলাম জানান, সপ্তাহে ৩-৪ দিন তারা কাজ করে থাকেন। বাকি দিন অন্য কাজ না জানার কারণে অলস সময় কাটাতে হয়। একজন কারিগর প্রতিদিন কাজের ওপর ভিত্তি করে ৫০০-১০০০ টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন। তিনি বলেন, এই টাকায় ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। আয় কম, তার ওপর শারীরিক পরিশ্রমও খুব বেশি হয়; কিন্তু বাপ-দাদার পেশা হওয়ার কারণে ছেড়ে যেতে পারছি না।
কথা হয় আজাইপুরের এক কাঁসার কারখানার মালিক কাওসার আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, কাঁসা-পিতলের জিনিস তৈরির কাজ বাপ-দাদার আমল থেকেই চলে আসছে। তিনিও প্রায় ২০ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে ২০ থেকে ৩০ জন কারিগর।
কাওসার আলী বলেন, এই জেলায় এখন কাঁসার থালা তৈরির কারখানা আছে ১০টি, গ্লাস-বাটি বা অন্যান্য বাসন ও ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরির কারখানা আছে ২০টি। ৩০টি কারখানা থাকলেও তাদের মধ্যে পারমিট রয়েছে ২০ থেকে ২৫ জনের।
পরের প্রজন্ম এই কাজ শিখছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পরে কাঁসার বাসন তৈরির এই কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, বাজারে এই শিল্পের তেমন চাহিদা না থাকায় বর্তমান প্রজন্ম এই কাজ শিখতে আগ্রহী নয়। তিনি বলেন, এর কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। ব্যবহৃত রং ও তামার দামও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে ৩ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে রং কিনতে হয়। তামা কিনতে হয় ৯৫০-১০০০ টাকা কেজি দরে। তাই কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের দামও বেড়ে যাচ্ছে। সে কারণে এর ব্যবহার ও বিক্রিও কমে যাচ্ছে। এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে কাঁচামাল, রং ও তামা সহজ শর্তে আমদানিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
আরো একজন কাঁসার কারখানার মালিক রায়হান আলী জানান, কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির কাঁচামাল ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আনতে ব্যয় বাড়ছে। কারিগরের অভাব ও হাতে তৈরি করায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তবে এখন আধুনিক যন্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, তবে তাতে তৈরি বাসন-কোসন টেকসই হয় না। তিনি বলেন, কাঁসা-পিতলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং প্লাস্টিক, মেলামাইন, সিরামিক ও কাচের সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় এখন এর বেচা-কেনা কমে গেছে। তবে কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিস ক্রেতারা এখন যে দামে কিনছেন, পরবর্তীতে পুরাতন কাঁসা বিক্রির সময় তারা ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে পারবেন। তবে এর দাম ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এলে চাহিদা বাড়বে। তা না হলে দিন দিন কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
রায়হান আলী আরো বলেন, আমার মতো ২০-২৫ জন কারখানা মালিক ও প্রায় ২০০ কারিগর বাপ-দাদার এই পেশা ধরে আছেন। তবে আগে প্রায় ১০ হাজার কারিগর ছিল বলে শুনেছি। কিন্তু পরিশ্রম অনুযায়ী মজুরি কম হওয়ায় এবং কাঁসার তৈরি জিনিসের ব্যবহার কমে যাওয়ায় অনেকেই অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুরাতন বাজারের কাঁসা-পিতলের সামগ্রী ব্যবসায়ী ও বিক্রেতা জুয়েল বাসনালয়ের মালিক এরফান আলী জুয়েল জানান, আগে বিয়ের অনুষ্ঠান জন্মদিনের উপহার ও অতিথি আপ্যায়নে কাঁসা-পিতলের তৈরি উপহার ব্যবহৃত হলেও এখন এর উল্টো চিত্র। সহজলভ্যতা ও দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং বিভিন্ন রঙের বাহারি ডিজাইনের পণ্য হওয়ায় কাঁসা-পিতল ছেড়ে মেলামাইন বা সিরামিকের পণ্যের দিকেই ঝুঁকেছেন মানুষ। তবে বর্তমান বাজারে পণ্য বানাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প নতুন করে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।
তিনি আরো জানান, এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কাঁসা-পিতলের গুণাগুণ সম্পর্কে সকলেই আপডেট তথ্য পেয়ে আবারো কাঁসা-পিতলের তৈরি তৈজসপত্র ব্যবহার শুরু করছেন। সেই সাথে কাঁসাশিল্পীদের নিপুণ হাতে থালা, বাটি, গ্লাস, কলস, গামলা, বড় হাঁড়ি বা তামাড়ি, চামচ, বালতি, ফুলদানি, কড়াই, হাঁড়ি-পাতিল, পিতলের ক্রেস্ট, স্কুলের ঘণ্টা, পানদানিসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী, ঘর সাজানোর সামগ্রী ও ক্রেস্টের ওপর তৈরি ঐতিহাসিক সোনামসজিদ, বাংলাদেশের ম্যাপ, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ব্রিজ ও আমবাগানের মনোরম দৃশ্য সবার নজর কাড়ছে।
সচেতন মহলের অভিমত, আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শিল্প কাঁসা-পিতল। ধুঁকে ধুঁকে চলা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন কারিগররা। চলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাসনপত্র তৈরির কাজ। আর ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সহযোগিতা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে আবার খুলবে সম্ভাবনার দ্বার।