দেশীয় রিফাইনারিগুলো অকটেন উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে

7

দেশে উৎপাদিত অকটেনের চেয়ে আমদানিতেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশস (বিপিসি) বেশি আগ্রহী। আর আমদানি করা কনডেনসেটে (অকটেনের কাঁচামাল) উৎপাদিত অকটেনের দাম ঠিক না করায় বন্ধ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদন।
দেশীয় রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব কনডেনসেটের পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি করে ওই উপজাত থেকে অকটেন-পেট্রোল উৎপাদন করত। আর বিপিসি ওই অকটেন তা খোলাবাজারে বিক্রি করত। বিপিসি এতদিন ৫৭ টাকা দরে প্রতি লিটার অকটেন (দেশীয় কাঁচামালে উৎপাদিত) ক্রয় করে আসছিল। কিন্তু গত জুন থেকে রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো কনডেনসেট আমদানি করে রাখলেও উৎপাদনে যেতে পারছে না। কারণ বিপিসি দেশীয় রিফাইনারিগুলো থেকে কী দরে অকটেন কিনতে তা ঠিক করছে না। আর ওই কারণেই দেশীয় রিফাইনারিগুলো অকটেন উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। তবে দেশীয় কনডেনসেট থেকে অকটেন উৎপাদন অব্যাহত আছে। আর শুধু দেশীয় কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত অকটেন বিপিসি কিনছে। ঘাটতির বাকি অকটেন বিদেশ থেকে বিপিসি আমদানি করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের বেসরকারি ৪টি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড মিলে অকটেনের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু বিপিসি রহস্যজনক কারণে দেশীয় অকটেন ক্রয়ের চেয়ে বিদেশ থেকে আমদানিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে অকটেন বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। তার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার ৯১৭ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। ওই হিসাবে গড়ে অকটেনের চাহিদা ধরা হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন। আর গড়ে প্রতিদিন চাহিদা ৯৫০ থেকে ১০০০ মেট্রিক টন।
সূত্র জানায়, সরকারি কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ ব্যারেল বা সাড়ে ৪ লাখ লিটার অকটেন উৎপাদন করছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের কাছে প্রতিদিন ৩ হাজার ৭০০ ব্যারেল বা ৬ লাখ লিটার অকটেন উৎপাদন করার মতো আরো একটি রিফাইনারি প্ল্যান্ট আছে। কিন্তু অকটেনের কাঁচামাল কনডেনসেট না থাকায় ওই প্ল্যান্টটি উৎপাদন না করে বসে আছে। সরকার যদি সিলেট গ্যাস ফিল্ডসকে বিদেশ থেকে কনডেনসেট আমদানি করার সুযোগ দিত তাহলে ওই প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন ৬ লাখ লিটার অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
বিপিসি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড থেকে প্রতি লিটার ৫৭ টাকা দরে অকটেন ক্রয় করছে। আর ওই অকটেন খোলাবাজারে বিক্রি করছে ১৩৫ টাকায়। উৎপাদনের পর ওই অকটেন সিলেট গ্যাস ফিল্ডস তাদের নিজস্ব যানবাহনে বিপিসির ভা-ারেও পৌঁছে দিচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, দেশে বর্তমানে সাড়ে ৬ হাজার ৫০০ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন হয়। তার মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডসকে দেয়া হয় ৪ হাজার ২০০ ব্যারেল কনডেনসেট। বাকি ২ হাজার ৩০০ ব্যারেল কনডেনসেট সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ ৫টি বেসরকারি রিফাইনারি অ্যাকোয়া, পারটেক্স, সুপার পেট্রো কেমিকেল ও পেট্রোম্যাক্সকে দেয়া হয়। দেশীয় কনডেনসেটের পাশাপাশি বেসরকারি ৪টি রিফাইনারি বিদেশ থেকে কনডেনসেট আমদানি করেও অকটেন উৎপাদন করছে। আর বিদেশ থেকে আমদানি করা কনডেনসেট দিয়ে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদন করার সক্ষমতা দেশীয় রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আছে। আর পেট্রোলসহ ওই উৎপাদন ৬০ হাজার মেট্রিক টনের মতো। ওই হিসাবে দেশীয় রিফাইনারিগুলোর বছরে ৭ লাখ মেট্রিক টন অকটেন-পেট্রোল উৎপাদনের সক্ষমতা আছে।
দেশে প্রতিবছর পেট্রোলের চাহিদা গড়ে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ মেট্রিক টন। অকটেন-পেট্রোল মিলে বছরে চাহিদা সর্বোচ্চ ৭ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিপিসি দেশীয় রিফাইনারিগুলোকে আমদানি করা কনডেনসেট দিয়ে অকটেন-পেট্রোল উৎপাদনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অথচ বেসরকারি রিফাইনারিগুলো গত জুনে উচ্চমূল্যে কনডেনসেট আমদানি করে রাখলেও ওই কাঁচামাল দিয়ে অকটেন-পেট্রোল উৎপাদন করতে পারছে না। তারা স্থানীয়ভাবে পাওয়া কনডেনসেট দিয়ে এখন স্বল্প পরিমাণে অকটেন-পেট্রোল উৎপাদন করছে।
এদিকে বেসরকারি রিফাইনারী সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অকটেনের দাম ঠিক না করলে দেশীয় অকটেন উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে। বিপিসি বর্তমানে আমদানি করা অকটেন-পেট্রোল দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণ করছে। যদি আমদানি করা কনডেনসেটের দাম ঠিক করে দেয়া হয়, তাহলে দেশীয় রিফাইনারিগুলোর উৎপাদিত অকটেন-পেট্রোল দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণ সম্ভব হতো।
নিয়ম হলো বিপিসি যে দরে বিদেশ থেকে অকটেন আমদানি করছে, তার থেকে ২-৩ শতাংশ কম দরে দেশীয় রিফাইনারিগুলো থেকে কিনবে। তার আগেও বিপিসি বেসরকারি রিফাইনারিগুলো থেকে ৬৭ টাকা দরে আমদানি করা কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত অকটেন ক্রয় করত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজরে কনডেনসেটের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত জুন থেকে নতুন দাম ঠিক করা হচ্ছে না। গত জুন থেকে দাম ঠিক করা হচ্ছে না। ফলে দেশে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কনডেনসেট থাকলেও তা দিয়ে অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অল্প সময়ের মধ্যেই অকটেনের দাম ঠিক করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যেই কিছু কিছু পণ্যের দাম ঠিক করা হয়েছে। শিগগিরই অকটেনের দামও ঠিক করা হবে। খবর এফএনএস।