দেবে গেছে ২০-২১টি বাড়ি, আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে গ্রামবাসী : সরেজমিন কানসাট জোহরপুর

39

চোখের সামনে বাড়ি দেবে যাওয়ার দৃশ্য ভুলতে পারছে না শিশু ছোটন

রবিবার দুপুর। এই সময় চোখের সামনে নিমিষেই ৩ কক্ষের পাকা বাড়ির পুরোটাই দেবে যেতে দেখে ৭ বছরের শিশু ছোটন। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই মূর্ছা যায় সে। একদিকে বাড়ি দেবে যাওয়ায় নিঃস্ব হওয়ার জোগাড় মা-বাবার; অন্যদিকে সন্তানের এই অবস্থা। দেরি না করে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসকের পরামর্শ, তার সামনে কাঁদা যাবে না, আঘাত দেয়া যাবে না, যা চাইবে তাই যেন দেয়া হয় শিশু ছোটনকে।
রবিবার দুপুর থেকে গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অনেকবারই মূর্ছা গেছে ছোটন। এই প্রতিবেদকের সামনেও বেশ কয়েকবার মূর্ছা যায় সে। সন্তানের এহেন অবস্থা দেখে মায়ের গগনবিদারী চিৎকার আশপাশের সব মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অনেকেরই চোখ জলে ভিজে ওঠে। ছোটনের বাবাও পাগলপ্রায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা মাথার ওপর চেপে বসলেও সন্তানের মঙ্গল কামনায় এলাকা ছেড়ে পালাতে চান তিনি। কমবেশ এইরকম দৃশ্য ২০-২১টি বাড়িতে দেখা গেছে।
যে গ্রামের এই ঘটনা, সেটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। গ্রামের নাম জোহরপুর। তবে কানসাট জোহরপুর নামেই পরিচিত। কানসাট বাজারের শেষে সেতুটি (এর পশ্চিম পাশে কানসাট স্লুইস গেট) পার হলেই হাতের ডান দিকেই রাস্তাটি শুরু হয়েছে জোহরপুরের। গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি দাঁড়া (জমিতে পানি সেচের জন্য কাটা নালা এবং অনেক পুরোনো)। সোনামসজিদ সড়ক থেকে গ্রামটির দূরত্ব আধা থেকে পৌনে এক কিলোমিটার হবে।
তিন দিন ধরে এই গ্রামটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে জেলার গ-ি ছাড়িয়ে অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছে এই গ্রামের কথা। আলোচনার বিষয়- এই গ্রামের ঘরবাড়ি দেবে যাওয়া। গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত এই গ্রামের ২০-২১টি বাড়ি সম্পূর্ণরূপে দেবে গেছে।
সোমবার সকালে সরেজমিন ওই গ্রামে যাওয়া হয়। গ্রামের প্রবেশমুখেই উৎসুক মানুষের আনাগোনা। কেউ দেখতে যাচ্ছেন, কেউবা দেখে ফিরছেন। যেন ঐতিহাসিক নিদর্শন অবলোকন!
প্রথমেই কথা হয় পেশায় দরজি তপন হালদারের স্ত্রী সুন্দরীর সঙ্গে। এই দুজনই বারবার মূর্ছা যাওয়া ছোটনের মা-বাবা। এই সময় সুন্দরীর ৯০ বছর বয়সী শ্বশুর শ্রী চৈতন্য হালদার বারান্দায় পাতা চকিতে বসেছিলেন। চোখেমুখে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টের ছাপ। কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ এই মানুষটি ক্ষণে ক্ষণে বলে উঠছিলেন, এখানটা গড় ছিল, আমবাগান ছিল। মাটি কেটে, বাগান কেটে ঘরবাড়ি করা হয়েছে।
সুন্দরী জানান, বুধবার (১০ নভেম্বর) সকালে প্রথম বাড়িতে ফাটল দেখতে পান। কিন্তু গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার ফাটলের মাত্রাটা বেশি দেখা যায় এবং শনিবার রাতে কিছু অংশ ধসে পড়ে। তবে রবিবার দুপুরে ৩ কক্ষের পুরো পাকা বাড়িটি চোখের সামনেই ধসে পড়ে।
এরপর আর কথা বলতে পারছিলেন না সুন্দরী। কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বামী দরজির কাজ করে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে জমি কিনে বাড়িটি বানিয়েছিলেন। কষ্টের এই বাড়িটি এইভাবে দেবে যাবে, কখনো কল্পনাও করেননি ২ ছেলে ও ১ মেয়ের জননী সুন্দরী। মন্দির লাগোয়া ছিল তপন-সুন্দরীর বাড়ি।
কথা বলার সময়ই ছেলে ছোটন এসে মায়ের কোলে এসে বসে। বসতে বসতেই মূর্ছা যায়। তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর একদিকে শ্রী চৈতন্য হালদার দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তবে শুধু চৈতন্য হালদারই নন, আরো ২১টি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মানুষের হাহাকার ভরা দীর্ঘশ্বাস উৎসুক মানুষের ভিড়ে চাপা পড়ে যায়।
পেশায় জেলে দয়াল হালদার। দুই মেয়ে, এক ছেলে তার। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আগে অন্যত্র দাঁড়ার নামোতে (খাস জমি) থাকলেও বছর আটেক আগে এখানে এসে জমি কিনে বাড়ি করেন। তারও একদিকের বাড়ি পুরোটাই দেবে গেছে। টিকে আছে একটি ঘর। আতঙ্কে সে ঘরেও রাত কাটাতে ভয় পাচ্ছেন দয়াল-অলকা রানী দম্পতি। কথা বলার সময়ই দেখা গেল তাদের জামাইকে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে।
দয়াল হালদার জানান, আগে কখনোই এরকম ঘটনা ঘটেনি। তবে গতবছর তার বাড়িতে ফাটল দেখা গেলেও সেটা পুডিং দিয়ে বন্ধ করেন। ১৫ থেকে ২০ দিন আগে নতুন করে হালকা ফাটল দেখতে পান। প্রথম দিকে গুরুত্ব দেননি এ নিয়ে। ৫-৬ দিন আগে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং একসময় বাড়ির পুরো একটা সাইড দেবে যায়।
আক্ষেপ করে তার স্ত্রী অলকা রানী জানান, ঋণ করে টয়লেটসহ বাড়ির কিছু কাজ করা হয়েছিল। ঋণটাও শোধ করা হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, এখন কী যে হবে?
সবচেয়ে করুণ দশা রহিমার। স্বামীহারা এই নারীর দুই ছেলে বলতে গেলে পাগল, এক মেয়েও তাই; এরকমটাই জানালেন গ্রামবাসী। কানে কম শোনেন, চেয়ে-চিন্তে খান। মেয়েটা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালায়। কয়েক বছর আগে গ্রামের মানুষ চাঁদা তোলে কেনা জমিতে দুটি ঘর বানিয়ে দেয়। সে ঘরও চলে গেল। এখন কোথায় ঠাঁই নেবেনÑ এই দুশ্চিন্তায় রহিমার দশা পাগলপ্রায়। এই আপদকালে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় চলছেন তিনি। রহিমার পাশেই আরেকটি বাড়ি প্রতিবন্ধী এক নারীর। সেটাও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তপন, দয়াল, রহিমা ছাড়াও আরো যেসব ব্যক্তির বাড়ি পুরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা হলেন- মিষ্টো, নবা, জীবন, সুবাস, ডুবারু, তালকুর, আফজাল, রশিদ, রূপচান, অনিল, ডাবলু, শওকত, কবির, মোবারক, নবাব, নজরুল, আহাদুর ও কুরবান। এদের মধ্যে মিষ্টো, নবা, জীবন, সুবাস, ডুবারু, রশিদ ও অনিলের বসবাস খাসজমিতে বলে জানা গেল গ্রামবাসীর কাছ থেকে। ক্ষতিগ্রস্তদের মর্মান্তিক অবস্থা দেখে কথা বলা সম্ভব হয়নি অনেকের সঙ্গে।
গ্রামের প্রবীণ মানুষ সুকিত মোমিনসহ আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই গ্রামে স্বাধীনেরও আগে থেকেই মানুষ বসতি গড়েছে। বিশেষ করে নি¤œআয়ের মানুষ। আগে দাঁড়ার নামোতে (খাস জমি) বসবাস করলেও পরে পাশেই জমা জমি কিনে ঘরবাড়ি তৈরি করে। উল্লেখ্য, দাঁড়ার ১০ থেকে ২০ ফিট পরেই এসব ঘরবাড়ি।
তারা আরো জানান, এই গ্রামটি আগে গড় এবং বাগান ছিল। গড় কেটেই এখানে ধীরে ধীরে বসতি গড়ে ওঠে। ঘরবাড়ি দেবে যাওয়ার কারণ হিসেবে সুকিত মোমিন ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা দাঁড়ার পানি কমে যাওয়াকেই দায়ী করেন। তারা বলেন, গ্রীষ্মকালেও যেখানে এই দাঁড়াতে এক মানুষ পানি থাকত এবং সে পানিতে গোসলও করা হতো। কয়েক বছর থেকে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির প্রবাহ না থাকায় এইরকমটি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
তবে তাদের এই মতের বিপক্ষে বললেন কেউ কেউ। তাদের যুক্তি, দাঁড়ার পানি কমে যাওয়ার কারণে যদি হতো, তবে দুই পাড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু দক্ষিণ পাশে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আরেক পক্ষ জানালেন, ওপরওয়ালাই ভালো জানেন, এর কারণ কি?
পক্ষ-বিপক্ষে মত যাই হোক, এ ঘটনার পর নির্ঘুম রাত কাটছে গ্রামবাসীর। আরো দুটি বাড়ি দেখা গেল, একদিকে কাত হয়ে পড়েছে। গ্রামবাসীর ধারণা, রাতের মধ্যেই (গতকাল সোমবার) একটি বাড়ি ধসে পড়বে। অন্যটি আরসিসি পিলার হওয়া সময় লাগবে। তবে বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
গতকাল সোমবার সেখানে থাকাকালীন দেখা যায় স্থানীয় দুজন সমাজসেবী মনিরুল ইসলাম মানিক ও ফাইজুদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে চাল ও আলু দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে। সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করেছে কানসাটের বিশ্বাস স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তার দানবাক্স চালু করে দর্শনার্থীদের কাছ সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছেন। এরই মধ্যে এক দফা চাল-ডাল বিতরণ করেছে সংগঠনটি।
কথা হয় এর সভাপতি মমিন আলীর সঙ্গে। শিক্ষার্থী এই তরুণ জানান, দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা না পর্যন্ত তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকবেন। তিনি বলেন, এই আতঙ্কের মধ্যে কেউ কাজে যেতে পারছেন না। ফলে দিনমজুর মানুষগুলো দিনাতিপাত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই যতটুকু সহযোগিতা করা যায়, সে চেষ্টাই করছি।
ঘরবাড়ি দেবে যাওয়ার কারণ হিসেবে তার মত ভিন্ন। মমিন আলী জানালেন, আসলে এখানকার মাটি পাকা বাড়ি করার উপযোগী কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। এর উত্তর বিশেষজ্ঞরাই ভালো দিতে পারবেন।
এরই মধ্যে এই এলাকা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব-আল-রাব্বি। তবে গ্রামবাসীর আক্ষেপ এখন পর্যন্ত (সোমবার) ইউপি চেয়ারম্যান একবারের জন্যও আসেননি।
গতকাল সোমবার দুপুরে কথা হয় শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব-আল-রাব্বির সঙ্গে, তার কার্যালয়ে। তিনি বলেন, এলাকাটি পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মানুষকে, বিশেষ করে যারা খাসজমিতে বসবাস করছেন, তাদেরকে গুচ্ছ গ্রামে আবাসনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরো জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন।
নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণে বিধিনিষেধ দেয়া হবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, সবগুলোই যেহেতু খাসজমি নয়, তাই এটা বলা যাবে না। তবে এ বিষয়ে এক্সপার্টদের মতামত পেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।