দৃঢ় বন্ধন আজও অটুট আছে

7


উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা

আজ দৈনিক গৌড় বাংলার ৮ম জন্মদিন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রধান জনপ্রিয় দৈনিক গৌড় বাংলা প্রকাশনার ৭টি বছর পূর্ণ করল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকাটির সব সাংবাদিক এবং যারা এ পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। পাশাপাশি এর পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদেরও বর্ষপূর্তির শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। গত ৭ বছরে অনেক দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-সফলতার মধ্যে আপনারা এই পত্রিকার সঙ্গে ছিলেন এবং আছেন। আশা করি, ভবিষ্যতেও এর সঙ্গে থাকবেন।
আমি একজন গণমাধ্যমকর্মী। তবে সবার আগে একজন সম্প্রচারমাধ্যমকর্মী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একমাত্র কমিউনিটি রেডিও-রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম এ প্রথমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলাম। বর্তমানে প্রাণের প্রতিষ্ঠান রেডিও মহানন্দায় সহকারী প্রযোজক হিসেবে কাজ করছি। কর্মজীবনের শুরুটাই হয়েছে রেডিও মহানন্দায় কাজ করার মধ্য দিয়েই।
২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এ যাবৎ কাজ করছি। আর দৈনিক গৌড় বাংলা সম্পর্কেও প্রথম জানতে পারি রেডিও মহানন্দায় বিজ্ঞাপন শোনার পর। দৈনিক গৌড় বাংলা প্রত্রিকাটির প্রকাশনার শুরু ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। যদিও এর প্রথম প্রকাশনার সময় ছিলাম না। এর স্বপ্ন, ধারণা ও উদ্যোগ শুরু হয়ে গিয়েছিল আগে থেকেই। দেশজুড়ে আন্তরিক সাড়াও পড়েছিল। পাঠক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন মহলে জেগেছিল তীব্র কৌতূহল। তারই ছাপ পড়েছিল প্রকাশনা উপলক্ষে।
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম একজন ভালো সংবাদ উপস্থাপক ও দক্ষ সংবাদকর্মী হবো। কিন্তু সে তো আর হাতের মোয়া নয়, এর জন্য নিজেকে আগে তৈরি করতে হবে। সংবাদ মাধ্যম সম্পর্কে জানতে হবে, গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই আমি রেডিও মহানন্দায় কাজ শুরু করি। শুরুর প্রথম দিকে রেডিওতে শুনতে পাই, দৈনিক গৌড় বাংলা সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপন। সেটা শুনে নিজের কৌতূহলের জায়গা থেকেই, যারা আগে থেকেই রেডিও মহানন্দার সংবাদ বিভাগের সাথে সংযুক্ত ছিলেন তাদের কাছে জানতে চাই বিজ্ঞাপনটির বিষয়ে। আমার কথা শুনে রেডিও মহানন্দার সংবাদ বিভাগে কর্মরত সামিয়া আক্তার আপু বলেন, রেডিও মহানন্দা আর দৈনিক গৌড় বাংলা দুটি আলাদা আলাদা সংবাদ প্রকাশ মাধ্যম হলেও মাধ্যম দুটি একে অপরের সাথে জড়িত।
তখন মনে মনে ভাবছিলাম, বাহ্ ভালো তো! আমি কি তাহলে একসাথে দুই জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারব!! এরপর একদিন রেডিও মহানন্দার স্টেশন ম্যানেজার শ্রদ্ধেয় আলেয়া ফেরদৌস আপু আমাদের সবাইকে নিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণ আর ভালো সংবাদ উপস্থাপন বিষয়ক একটি ক্লাস নিচ্ছিলেন। সেসময় তিনি গৌড় বাংলা পত্রিকার একটি খবর ২-৩ লাইন পড়ার জন্য বলেন। তিনি বলেন, একজন ভালো সংবাদ উপস্থাপক ও দক্ষ সংবাদকর্মী হতে হলে, শুদ্ধ উচ্চারণ করতে হবে, বেশি বেশি বই পড়তে হবে, বেশি বেশি পত্রপত্রিকা পড়তে হবে। জেলার কোন জায়গায় কখন কি হচ্ছে, সেই সম্পর্কে জানতে হবে, মাঠপর্যায়ে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হবে, তারপর সেগুলো রেডিওতে সম্প্রচার উপযোগী এবং গৌড় বাংলা পত্রিকায় প্রকাশনা উপযোগী করে লিখতে হবে।
তখন আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জাগল, রেডিওতে সম্প্রচার করার বিষয়টি ঠিক আছে; কিন্তু পত্রিকায় ছাপানোর কথা জানতে চাইলে সামিয়া আপু বলেন, দৈনিক গৌড় বাংলার কথা, যার সম্পাদক ও প্রকাশক রেডিও মহানন্দার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিব হোসেন। আমাদের সংগ্রহ করে নিয়ে আসা সংবাদগুলোও নাকি এই পত্রিকায় ছাপনো হয়। তো সেটা জানার পর আমার সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার আগ্রহটা আরো একটু বেড়ে গিয়েছিল। কারণ ততক্ষণে আর বুঝতে বাকি রইল না যে, রেডিও মহানন্দার সাথে দৈনিক গৌড় বাংলার সম্পর্ক কতটা নিবিড়।
এরপর থেকেই মাঠপর্যায় থেকে খবর সংগ্রহ করে আনার পর সেগুলো গৌড় বাংলায় ছাপানোর জন্য আলাদা করে লিখতাম। এভাবে ধীরে ধীরে কোনটি কোন ধরনের সংবাদ, কোনটি অনুসন্ধানী সংবাদ, কোনটি জীবনধর্মী সংবাদ, কোনটি কলাম ও ফিচার-মিনি ফিচার, কোনটি প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার কিভাবে নিতে হয়, কিভাবে একটি সংবাদ সংগ্রহ করে আনার পর সেটা পত্রিকায় ছাপানোর উপযোগী করে লিখতে হয়Ñ সেই সমস্ত কিছু বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো আমাদেরকে। সব থেকে বড় যে বিষয়টি ছিল, যে কোনো সংবাদ রেডিওতে সম্প্রচারের জন্য একরকম করে সাজাতে হয় আর পত্রিকায় ছাপানোর জন্য আরেকভাবে। রেডিওতে কাজ করতে করতে এটাও জানতে ও শিখতে পারছি যে, একটি সংবাদ কিভাবে পত্রিকায় প্রকাশ উপযোগী করে লিখতে হয়।
আর এই বিষয়ে দৈনিক গৌড় বাংলার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আজিজুর রহমান শিশির আংকেলও, সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর যতœ নেয়ার মতো করে অতি যতœসহকারে আমাকে নানানভাবে হাতেকলমে শিক্ষা দিয়েছেন। অনেক সময় বলেও দিয়েছেন কোথায় গিয়ে কিভাবে খবর সংগ্রহ করতে হয়। এখনো একইভাবে শিক্ষা দিয়েই যাচ্ছেন তিনি। কারণ সংবাদ লেখার বিষয়ে এখনো অনেক কিছ্ইু শেখার বাকি আছে।
মনে আছে, একদিন শিশির আংকেল আমাকে বললেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে একটি বিশেষ ফিচার লিখতে হবে যেটি গৌড় বাংলায় ছাপানো হবে। উনার পরামর্শ এবং নির্দেশনা অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করি এবং ফিচারটি লিখে জমা দিই। পরদিন যখন বিশেষ কলামে আমার ফিচারটি ছাপানো দেখতে পেয়েছিলাম এবং এই লেখার জন্য সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনরা যখন আমার প্রশংসা করছিলেন তখন বেশ ভালো লাগা কাজ করছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছে রেডিও মহানন্দায় কাজ করার মধ্য দিয়েই এবং গৌড় বাংলার সাথে রেডিও মহানন্দার একটি সুদৃঢ় সম্পর্ক থাকার কারণেই। এখনো রেডিও মহানন্দার সূত্র ধরেই মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করে আনা অনেক সংবাদ প্রতিবেদন আকারে, কিংবা বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধানী বা জীবনভিত্তিক ঘটনা কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কথাগুলো গৌড় বাংলায় ফিচার আকারে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
যাই হোক, গৌড় বাংলা আমার পছন্দের সেরা পত্রিকা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারাণ মানুষেরও প্রিয় পত্রিকা বলেই আমার ধারণা। কারণ, আমি দেখেছি সাধারণ মানুষ গৌড় বাংলা কতটা পছন্দ করেন। পত্রিকাটির খবরের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। অনুসন্ধানী সংবাদসহ, কলাম ও ফিচার সবার দৃষ্টি কাড়ে। আর একজন সম্প্রচারমাধ্যমকর্মী বা গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সবসময় গৌড় বাংলাকে পাশে পেয়েছি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে অর্ধযুগ পেরিয়েও সেই জনপ্রিয়তার মূল কারণ সংবাদ পরিবেশনে পত্রিকাটির আপোষহীন অবস্থান ধরে রাখা। তবে রেডিও মহানন্দার সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে বলছি না, দৈনিক গৌড় বাংলা অন্যতম বলেই মনে হয়েছে।
দৈনিক গৌড় বাংলা আজ ৮ বছরে পা দিয়েছে, শুনে ভালো লাগছে। গৌড় বাংলা সততা, স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন এবং দেশীয় সংস্কৃতি বুকে ধারণ করে আপন সংস্কৃতির ধারায় পাঠকদের মন জয় করবে, সমাজের নানা অসঙ্গতি প্রকাশ করে মানুষকে সচেতন করে তুলবে, পাশাপাশি দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে থেকে তাদের কথা তুলে ধরবেÑ এটাই প্রত্যাশা।
সবশেষে বলব, রেডিও মহানন্দার সাথে গৌড় বাংলার যে অটুট বন্ধন ছিল, আছে সেটা আজীবন অব্যাহত থাকুক। গৌড় বাংলার আগামীর পথচলা আরো সুন্দর হোক, শুভ হোকÑ এই কামনা করি।

উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা : সহযোগী প্রযোজক, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম