দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে কৃষিতে ব্যাপক হারে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ

133

gourbangla logoসরকার কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কেবল জমি চাষই নয়, জমিতে নিড়ানি, সার প্রয়োগ, কীটনাশক ছিটানো, ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও ধান থেকে চাল করা সবই যন্ত্র নির্ভর করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কম শ্রমিক দিয়ে অধিক ফসল উৎপাদনের বাড়িয়ে খাদ্য চাহিদা মেটানো। সেজন্য সম্প্রতি সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ রোডম্যাপ অনুমোদন করেছে। যা কৃৃষি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনবে। আর তা হবে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী কর্মযজ্ঞ। এই মহা কর্মপরিকল্পনায় তিন ধাপে ২০৪১ সাল পর্যন্ত কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিভিন্ন টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।  সে লক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে শস্য রোপণে ২০ শতাংশ পর্যন্ত যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। আর রোপণ প্রক্রিয়ায় বর্তমানে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার। তবে সরকার চাচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষেত্র বিশেষে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্য থাকলেও ২০৪১ সালের মধ্যে কৃষির প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যবহারের প্রসার ঘটানো। সরকারের ওই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রান্তিক কৃষকের মাঝে যান্ত্রিক সুবিধা সম্প্রসারণে কৃষক পর্যায়ে ভাড়ায় কৃষি যন্ত্রপাতি সেবা প্রদান প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কৃষিতে জমি তৈরি, সেচ, শস্য মাড়াই ও মিলিংয়ের কাজ প্রায় পুরোটাই হবে যন্ত্রনির্ভর। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখনো নাজুক। বীজ বপন, রোপণ ও ফসল কর্তনের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়নি। তবে সম্প্রতি কৃষক পর্যায়ে যন্ত্র ব্যবহারের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধিকমাত্রায় যন্ত্রের প্রসার ঘটেছে। ক্রমাগত কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যন্ত্রনির্ভর কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারই শ্রমিক স্বল্পতার অভাব দূর করতে পারবে। পাশাপাশি বাড়তে পারবে উৎপাদনও।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ৮০-৮২ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আর কৃষিতে শ্রমিক সংখ্যা কিছুদিন আগেও ছিল ৬০-৭০ শতাংশ। বর্তমানে কমে ৪০ শতাংশে নেমেছে। উন্নত বিশ্বে খুবই কম শ্রমিক দিয়ে যন্ত্রনির্ভর পদ্ধতিতে অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে দেশে কৃষি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। কৃষি খাতে মাঠে কার্যকর রয়েছে এমন যন্ত্রের সংখ্যার মধ্যে পাওয়ার টিলার ৭ লাখ, ট্রাক্টর ৩৫ হাজার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ৩শ’, সিডার ৫ হাজার, দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র ৮শ’, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্র ১৮ হাজার ও স্প্রেয়ার ১৩ লাখ। তাছাড়া সারাদেশে সেচ পাম্প (গভীর নলকূপ, অগভীর ও শক্তি চালিত পাম্প) রয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫২টি, আর সৌর পাম্পের সংখ্যা ৩২০টি। আর কম্বাইন্ড হারভেস্টার ৮০, উইডার ২ লাখ ৫০ হাজার, রিপার ৫০০, জুট রিবনার ৪০ হাজার, ওপেন ড্রাম থ্রেসার ১ লাখ ৫০ হাজার, ক্লোজড ড্রাম থ্রেসার ২ লাখ ২০ হাজার, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র ১৫ হাজার, আখ মাড়াই যন্ত্র ৫০ হাজার, উইনোয়ার ২ হাজার, ড্রায়ার ৫০০, ধান ভাঙ্গানো যন্ত্র ১৫ হাজার ও ৭০টি ইম্প্রুভড পারবয়েলিং ট্যাংক কৃষি ও কৃষির সাথে সম্পৃক্ত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে গবেষণা করছে। ইতিমধ্যে সংস্থাটি ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছে। আর সীমিত আকারে হলেও ওসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে। যেমন আলু তোলা মেশিন, ঘাস কাটা মেশিন ইত্যাদি। তবে সরকার কৃষিতে যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ হারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। ওই ক্রমহ্রাসমান জমিতে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য যান্ত্রিকীকরণ অতি জরুরি। সেজন্য পরিকল্পনায় উপযোগী ও গুণগত মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকরণের ওপর জোর দিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে যন্ত্রের ব্যবহার যেখানে বাড়ছে সেখানে এক ফসলী জমি দো ফসলী, দো ফসলী জমি তিন ফসলী হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান জানান, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি সাথে যেমন কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে, একইভাবে গ্রাম অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের সঙ্কটও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে কৃষির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে কৃষিকে যান্ত্রিক কৃষিতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। মাঠ চাহিদার নিরিখে কৃষি যন্ত্র উদ্ভাবন, আমদানীকৃত যন্ত্র দেশীয় উপযোগীকরণ ও কৃষক পর্যায়ে সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার কৃষি যন্ত্রপাতিসহ অন্যখাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। কৃষিতে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও বাড়বে।