তুলা চাষে আশার আলো বরেন্দ্রর কৃষকদের : বিঘাপ্রতি আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা

58

নয়ন আলী

বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা। সময়ের ব্যবধানে এ অঞ্চলে এখন প্রায় সব ধরনের ফসল ফলানো হচ্ছে। হচ্ছে তুলা চাষও। বিনা সেচে তুলা চাষ করা যায় বলে অনেক চাষিই এর প্রতি ঝুঁকছেন। লাভও হচ্ছে বিঘাপ্রতি ২৫-৩০ হাজার টাকা। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা তাই আশার আলো দেখছেন তুলা চাষে।
উপজলার পূর্ব লক্ষণপুর গ্রামের বাসিন্দা জুসেন টুডু। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু জায়গায় জমি হওয়ায় সেচের অভাবে কোনো ফসল চাষ করতে পারতেন না তিনি। বাধ্য হয়েই আমবাগান গড়ে তুললেও গাছের পরিচর্যাও সেভাবে করা যেত না। ২০১৮ সালে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নাচোল ইউনিট অফিসার বিশ্বজিৎ বর্মনের মাধ্যমে জানতে পারেন তুলা চাষ সম্পর্কে। তুলা একটি গভীর মূলী ফসল, যা খরা সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে এবং সময়মতো লাগালে বিনা সেচে এটি চাষ করা যায়। জুসেন টুডু বিষয়টি শুনে উদ্বুদ্ধ হন এবং দেরি না করে প্রশিক্ষণ নিয়ে তুলার চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর তুলার চাষ করছেন তিনি।
চলতি বছর ৫ বিঘা জমিতে তুলার চাষ করছেন জুসেন টুডু। তিনি জানান, তুলা চাষে বিঘাপ্রতি তার খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন হয় প্রায় ১০ মণ করে। তিনি বলেন, এ বছর তুলা বিক্রি করেছি ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে। সে হিসাবে খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা করে লাভ হবে।
জুসেন টুডু আরো জানান, তুলা বিক্রিতে ঝামেলা নেই। বাজারেও বেচতে যেতে হয় না। ক্রেতারাই কিনে নিয়ে যান। দাম কম হলে পরে বিক্রি করি। লোকশানের কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি জানান। সামনে বছর আরো বেশি জমিতে তুলা চাষের পরিকল্পনা তার। তাকে দেখে এলাকার অনেকেই তুলা চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং পরামর্শ নিয়েছে।
জুসেন টুডুর মতো একই গ্রামে তুলা চাষ করেছেন শ্রী সুনিল হেমব্রম। তুলা চাষ করে তিনিও লাভবান হচ্ছেন।
জানা গেছে, রাজশাহী জোনের আওতায় ৭টি ইউনিটের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলে তুলার চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নাচোল ইউনিটের কটন অফিসার বিশ্বজিৎ বর্মন জানান, সাধারণত উঁচু জমি তুলা চাষের জন্য উপযোগী, কেননা তাতে পানি জমে না। আর উঁচু জমিগুলোতে সাধারণত সেচের অভাবে কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না, পতিত পড়ে থাকে। সেই জমিগুলো তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। তিনি বলেন, যে জমিতে দীর্ঘদিন থেকে একই ধরনের ফসল চাষ এবং অধিক পরিমাণে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে জমির উর্বরতা কমে গেছে; সেই জমিতেও তুলা চাষ করা যাবে। তুলা চাষের ফলে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বজিৎ বর্মণ আরো জানান, বাংলাদেশে তুলার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশে মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ চাষ হয়, বাকি ৯৮ শতাংশ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। তিনি বলেন, আমারা যদি পতিত জমিগুলোকে কাজে লাগিয়ে তুলা চাষ করতে পারি তাহলে বিদেশ নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ তুলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে ৫ বছর ধরে তুলা চাষ হচ্ছে। এখানে উন্নত প্রযুক্তিতে তুলা চাষের জন্য এই বছর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তুলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে এবং কিভাবে তুলার ফলন বৃদ্ধি করা যায় সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে।

  1. চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জ তুলা গবেষণা কেন্দ্রের তুলা গবেষণা প্রদর্শন প্লট স্থাপন করা হয়েছিল সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের মহাডাঙ্গায়। সম্প্রতি সে প্লট পরিদর্শন করেন তুলার গবেষণা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্প খামারবাড়ীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (প্রেষণ) রণজিত কুমার ভৌমিক ও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহী জোনাল কার্যালয়ের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মোজাদ্দীদ আল শামীম।
    পরিদর্শনকালে রণজিত কুমার ভৌমিক গৌড় বাংলাকে বলেন, সরকারের একটা সিদ্ধান্ত হলো বরেন্দ্র অঞ্চলে কম পানিতে চাষাবাদ করা যায় এমন ফসলের আবাদ করা। সেক্ষেত্রে কম পানি ব্যবহার করে তুলা চাষ করা যায়। তাই আমরা চাচ্ছি বরেন্দ্র অঞ্চলে তুলা চাষের সম্প্রসারণ করতে। তিনি জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ হেক্টর উঁচু জমি আছে। যেগুলো তুলা চাষের উপযোগী। আমাদের লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার হেক্টর জমি তুলা চাষের আওতায় নিয়ে আসা।
    রণজিৎ কুমার ভৌমিক জানান, এখানে একটি প্লটে দুটি পদ্ধতিতে তুলা চাষ করা হয়েছে। একটি মালচিং, আরেকটি সাধারণ পদ্ধতি। মালচিং পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো মাটির রস ধরে রাখা। এতে দেখা গেছে, তুলার বলের সাইজ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বলের সংখ্যাও বেড়েছে। দেখা গেছে, প্রতিটি বলের ওজন সাড়ে ৭ থেকে ৮ গ্রাম। যেখানে দেশের অন্য কোথাও এত বড় সাইজের বল হয়নি। ফলে তুলার বলের সাইজ বাড়ার সাথে সাথে ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে। আরেকটি প্লটে সাথী ফসল হিসেবে মাস কলাই ও মুলার চাষ করা হয়েছিল। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে মুলা খুব একটা ভালো হচ্ছে না। তাই আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, সাথী ফসল হিসেবে মাসকলাই চাষ করা।
    মোজাদ্দীদ আল শামীম গৌড় বাংলাকে জানান, এখানে উঁচু জমিতে ধানের চাষ ভালো হয় না। সেখানে যদি তুলার চাষ করা যায়, তাহলে চাষিরা লাভবান হবে। কারণ এই অঞ্চলে তুলার ভালো ফলন হচ্ছে। খরচ বাদে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারবে তারা। যা অন্য ফসল আবাদ করে এত পরিমাণ আয় করা সম্ভব নয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে যেহেতু সেচের সমস্যা রয়েছে, তাই আমরা সেচবিহীন তুলা চাষ করছি। তিনি বলেন, তুলার চাষ সাধারণত জুন মাসের শুরু থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে করতে হয়। তুলা চাষের জন্য সাধারণত ২ হাত পরপর লাইন করে ১ হাত পরপর তুলার বীজ বা চারা লাগাতে হয়। কেউ মনে করলে সরাসরি বীজও বুনতে পারে। আবার চাষিরা ইচ্ছা করলে বীজতলায় চারা করে সেই চারা জমিতে লাগাতে পারে। পরবর্তীতে পরিচর্যা হিসেবে গাছের গোড়ায় মাটি উঠিয়ে দিলে আগাছা দমন করতে হয় না। সেই সাথে পোকামাকড় দমনের জন্য কিছু কীটনাশক স্প্রে করলেই হয়।