টানা ৫৪৪ দিন পর বাজল ক্লাসের ঘণ্টা : শিক্ষার্থীদের মাঝে উৎসবের আমেজ

23

টানা ৫৪৪ দিন বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বাজল ক্লাসের সেই ঘণ্টা। মাঝে মধ্যে অনলাইনে ক্লাস হলেও সরাসরি বিদ্যালয়ে এসে ক্লাস রুমে বসে পড়ার মজাই যেন আলাদা। গতকাল রবিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি যেন তেমনটাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ঢুকতে দেয়া হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার বহরম ঘোড়াপাখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ আলী। তার মনের ভাব প্রকাশ করে এভাবে। ‘স্কুলে না আসলে তো, পড়ালেখায় মন বসে না। কতদিন আগে যে পড়তে বসেছি ভুলেই গেছি। অনেকদিন পর বন্ধুরা সব একসাথে হলাম, শিক্ষকদের দেখলাম। স্কুলের ক্লাসগুলো খুবই মিস করছিলাম। স্কুল খোলাই খুবই ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে নতুন শ্রেণিতে উঠে প্রথম ক্লাস করছি।’
তার মতো উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী পাওয়া গেল জেলাশহরের গ্রিন ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী তিসা জানায়, দেড় বছর পর স্কুল খুলল, আমার খুব ভালো লাগছে। ভালো লাগছে স্কুলে এসে সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে। স্কুলের পরিবেশটাও অনেক ভালো লাগছে।’
৫ম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী সিয়ামুল ইসলাম জানান, বাড়িতে বসে না থেকে এখন স্কুলে যাওয়া ভালো, স্কুল খোলাতে ভালো লাগছে, এখন থেকে সব বন্ধুদের সাথে দেখা হবে, স্কুল বন্ধ রাখায় আমাদের পড়ালেখা পিছিয়ে যাচ্ছিল।
স্কুলে আসতে পেরে যেমন শিক্ষার্থীদের মনে আনন্দ, তেমনি অভিভাবকরাও খুশি তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাতে পেরে। গ্রিন ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে আসা কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা হলে তারা জানান, এতদিন বাড়িতে থেকে তাদের সন্তানেরা অনেকটাই মানসিক অশান্তির মধ্যে ছিল; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমরা সেখান থেকে মুক্তি পেলাম। আমরা খুবই খুশি। কারণ ছেলে-মেয়েরা এত বিরক্ত বোধ করছিল যে পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিল। বাইরে যেতে পারছিল না, বন্ধুদের সাথে দেখা করতে পারছিল না, স্কুলে আসতে পারছিল না। যার জন্য আমরা আপসেট হয়ে গেছিলাম বাচ্চাদেরকে সুস্থ রাখার জন্য। শুধু ঘরবন্দি হয়ে তো সুস্থ থাকা যায় না। বাইরেরও একটা আবহাওয়ার ব্যাপার আছে। যাই হোক করোনা ভাইরাসের জন্য আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, বাচ্চারা মানসিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখন আমরা খুব খুশি স্কুল খুলে দেয়ায়। এভাবে ক্লাস হবে, বাচ্চারা স্কুলে আসবে লেখাপড়া করবে খুবই ভালো লাগবে।
গ্রিন ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকশানা আহমদের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমরা সরকারের দেয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে ক্লাস নেয়া শুরু করলাম। তবে আমরা গতবছর ২০২০ সালের মে মাস থেকে অনলাইন ক্লাস নিয়মিত করেছি। এটি করার ফলে যেটি হয়েছে, তা হলো শিক্ষার্থীদের সাথে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগটা ছিল। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই ঝড়ে পড়েনি। আজকে আমার বিদ্যালয়ে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল এটি আমাদের ভালো লেগেছে।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশমুখে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়।
শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শরিফুল আলম জানান, কলেজের প্রবেশমুখে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রবেশ করতে দিচ্ছি। আমাদের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শতভাগ।
অন্য স্কুল-কলেজগুলোতেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ, নবাবগঞ্জ হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পদচারণায় মুখরিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম ক্লাসে অংশ নিয়ে উচ্ছ্বসিত তারা।
নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, গত ১৭ মাস বাসায় বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এছাড়া আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনলাইনে ক্লাসের সাথে পরিচিত না। তাই অনলাইনে ক্লাসের প্রতিও আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। বাসায় বসে, শুয়ে, মোবাইল টিভি দেখেই সময় পার করেছি। পড়াশোনার অনেক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আশা করি, স্কুল খোলার পর তা সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারব। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পাব এখন।
নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে সদর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা পরিমল কুন্ডু জানান, এখানে ৫ম শ্রেণির ১৬৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল খোলার প্রথম দিনে সবাই উপস্থিত ছিল। এদের মধ্যে একজন ছাত্রের দেহে অতিরিক্ত তাপমাত্রা পাওয়া গেলে, অভিভাবককে ডেকে তাকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। তার প্রতি আলাদা নজর দিয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হবে।
নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসা. তোহমিনা খাতুন বলেন- দেড় বছর বিরতি দিয়ে স্কুল খোলার পর আজকে (রবিবার) শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেখে আমরাও আনন্দিত। তাদেরকে খুব মিস করেছি গত ১৭ মাস। অনলাইনে ক্লাস নিলেও তাদের সাথে দূরত্ব ছিল অনেক বেশি। প্রিয় ছাত্রদের ক্লাসে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গতকাল রবিবার থেকে সব পর্যায়ের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মাদরাসাগুলোতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আগমন উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ। এই উপলক্ষে কোনো কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুম সাজানোও হয়েছিল। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিশেষ ব্যবস্থায় বরণ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৭০৫টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২২৮টি, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৩টি, সরকারি কলেজ ৬টি, বেসরকারি কলেজ ৪৯টি, পলিটেকনিক ২৪টি, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৯টি, পিটিআই ২টি ও মাদরাসা রয়েছে ১৩২টি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল  হাফিজ ও জেলা শিক্ষা অফিসার মোহা. আব্দুর রশিদসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন এবং সবাইকে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানান।