ঝুঁকিতে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প

7

ঝুঁকিতে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে স্ক্র্যাপের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ বা জাহাজের ভাঙা অংশের দামের নিম্নমুখিতা এবং ডলার সংকটে এলসি বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের টনপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা লোকসান করতে হচ্ছে। আর মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি প্রায় ৫৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সম্ভাবনাময় খাতটি নিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাতে দেশের ইস্পাত শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিএসবিআরএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডলার সংকটে এলসি বন্ধ থাকায় স্ক্র্যাপ ছোট জাহাজ আমদানির সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি আমদানি খরচ এবং বর্তমান বাজার দরের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ধারা চলতে থাকলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইয়ার্ড চালু করাই সম্ভব না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে দেশের বাজারে কেজিপ্রতি ৫৪ টাকা স্ক্র্যাপ এবং ৭৩ টাকায় প্লেট বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ টনপ্রতি স্ক্র্যাপের দাম পড়ছে ৫৪ হাজার এবং প্লেটের দাম ৭৩ হাজার টাকা। অথচ দুই মাস আগেও স্ক্র্যাপ ৬৫ টাকা এবং প্লেট ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় বেশি দামে স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনে ব্যবসায়ীরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। গত দু-তিন মাসে টনপ্রতি আমদানিতে গড়ে ৫৩০ ডলার খরচ হলে তা অঙ্কের হিসাবে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার টাকা। তার সঙ্গে কাটিং, ব্যাংকের সুদ ও ভ্যাট-ট্যাক্স মিলে টনপ্রতি ব্যবসায়ীদের মোট খরচ দাঁড়ায় ৬৫ হাজার ৭০০ থেকে ৬৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৫৪ হাজারে স্ক্র্যাপ বিক্রি করলে ব্যবসায়ীরা টনপ্রতি ১২ হাজার টাকা লোকসান দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত শিপ ইয়ার্ডে ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৪ দশমিক ৩৩ টনের ১২৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। আর গত বছরের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছে ২২ লাখ ৭৫ হাজার ৬৯১ টনের ২৩৭টি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এক বছরের ব্যবধানে ১০ মাসে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি কমেছে ১১২টি এবং ১২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৭৬ দশমিক ৬৭ টন। অর্থাৎ মোট আমদানি কমেছে ৫৬ শতাংশেরও বেশি। গত দু-তিন মাসে যারা স্ক্র্যাপ আমদানি করে বাজারে বিক্রি করছে তাদের তুলনায় যারা আগে আমদানি করে রেখেছিল তাদের ক্ষতি প্রায় দ্বিগুণ।
দেশে প্রায় ১৮৫টি নিবন্ধিত ইয়ার্ড থাকলেও প্রতি বছর ৪০-৫০টি শিপ ইয়ার্ডে কাজ হয়। কিন্তু এখন ওই সংখ্যা ২০টিতে নেমে এসেছে। চালু থাকা শিপ ইয়ার্ডগুলোর বেশ কয়েকটিতে ঠিকাদারি প্রথার মাধ্যমে কাজ হয়। স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি বন্ধ হলে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।
সূত্র আরো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে গত ২৫ অক্টোবর প্রতি টন স্ক্র্যাপ ৩৬৫ দশমিক ৫০ ডলারে বিক্রি করা হয়। আর ১০ আগস্ট টনপ্রতি প্রায় ৪০০ ডলার দামে বিক্রি হয়েছিল। চলতি বছরে ২৭ ফেব্রুয়ারি ৬৪৫ ডলারে সর্বোচ্চ দামে স্ক্র্যাপ বিক্রি হয়। অথচ ২০ ফেব্রুয়ারি ওই স্ক্র্যাপ আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০৫ ডলারে বিক্রি হয়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষ ৮ দিনে স্ক্র্যাপের দাম বাড়ে একলাফে ১৪০ ডলার হয়েছে। মার্চ ও এপ্রিলের শেষ দিক পর্যন্ত স্ক্র্যাপের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মে মাসে ৪৬০-৪৮৫ ডলারে বিক্রি হয়। তবে ১৯ জুন থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত স্ক্র্যাপের আন্তর্জাতিক দাম ৩৬৫ ডলার।
এদিকে এ প্রসঙ্গে জাহাজ ভাঙা মালিকদের সংগঠন বিএসবিআরএর সিনিয়র সহসভাপতি এবং ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিন আহমদ জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী জানুয়ারিতে এলসি খোলা সম্ভব হবে বলে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে। চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডগুলো এখন কার্যত বন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে যাবে এবং ব্যবসা একেবারেই বন্ধ করতে বাধ্য হবে। সেজন্য সরকারের কাছে এই শিল্প খাতটি বাঁচতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। খবর এফএনএস।