জিআই পণ্য ফজলি আম : ঘরের চাবি অন্যের হাতে

270

জাহাঙ্গীর সেলিম

ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে দেশীয় ফলমূলের সমারোহ বছরজুড়েই দেখা যায়। প্রায় সবগুলো মৌসুমি ফল এবং উৎপাদনেও স্থানভেদে যথেষ্ট তারতম্য বিদ্যমান। তবে দেশের লোকজনের রসনা তৃপ্তিকারী সুমিষ্ট রসালো ফলের মধ্যে আম একমেবাদ্বিতীয়ম। মধুমাসের আকর্ষণ প্রধানত আমকে কেন্দ্র করেই। আমের মধ্যেও রয়েছে নানা জাত, বর্ণ, স্বাদ ও রসের বৈচিত্র্য। বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাচীন গৌড় অঞ্চলের অংশ এবং এর রাজধানীর খুব কাছাকাছি অবস্থান ছিল। সীমান্ত সংলগ্ন হবার সুবাদে গৌড়ের অনেক পুরাকীর্তি এ জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গৌড়ীয় সংস্কৃতির প্রভাব এখনো চলমান। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছরেরও আগে থেকে ভারতবর্ষ তথা গৌড়ীয় তথা বঙ্গদেশের এ অঞ্চলে আমচাষের প্রচলন ছিল। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ বহির্বিশ্বে সবার আগে ভারতের আমের গুণগান প্রচার করেন (৬৩০-৬৫০ খ্রিস্টাব্দ)। মুঘল সম্রাট বাবর আমকে ‘পৌর-ই-হিন্দ’ অর্থাৎ হিন্দুস্থানের সেরা ফল হিসেবে বিবেচনা করতেন। সম্রাট আকবর বলতেন ‘পৌর-ই-হিন্দুস্থান’ হিন্দুস্তানের সেরা। আইন-ই-আকবরীতে এক বড় অংশজুড়ে আমের বর্ণনা রয়েছে। সম্রাট হুমায়ুনেরও পছন্দের ফল ছিল আম এবং আমের মৌসুমে ৬ মাস গৌড়ে অবস্থান করেন। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ মালদা অঞ্চলে আমের সময় সৈন্য পাঠিয়ে কিছু আমবাগানে পাহারা দেবার ব্যবস্থা করতেন। ফলে প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের মালদা অঞ্চলের আম খুব প্রসিদ্ধ ছিল। ব্রিটিশ যুগের প্রথম দিকে Dr. Buchanan Hamilton হ (১৮০৮ সালে) আমের গুণাগুণ বর্ণনা করে বলেন… The mangoes called Malda have a highly reputation and may be considered as one of the finest fruits in the world. আমচাষে প্রাধান্য ছিল দক্ষিণ মালদার অংশে, সে কারণে ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর উপজেলায় বড় বড় আম বাগানের অস্তিত্ব ছিল এবং বর্তমানেও বিরাজমান। রাজশাহীতে আমের মোট উৎপাদন ৪০ হাজার টন, এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের উৎপাদন আড়াই লাখ টন। রাজশাহীতে আমচাষের ইতিহাস শুরু হয়েছে হাল আমলে। ফজলি আমের উল্লেখ করার মতো বাগান সেখানে নেই, ফলে উৎপাদনও সীমিত। অথচ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, রাজশাহীর নামে ফজলি আম জেলা ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাস্তব ঘটনা হলো, দেশভাগ ও স্বাধীনতা লাভের পর দেশের আপামর জনগণ আমের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের পানে চেয়ে থাকে। এ জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম। বছরজুড়ে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এ জেলার আম অর্থনীতির পরিমাণ ৪-৫ হাজার কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পূর্বে মালদা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিন্ন নদী পদ্মা, পাগলা, পুনর্ভবা, মহানন্দা নদীর কল্যাণে তরুছায়া-শ্যামলিমায় এ অঞ্চল নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য উৎপাদনের কৃতিত্বে ভরপুর। নদীবিধৌত এ অঞ্চলে একসময় প্রচুর পরিমাণে অনায়াসে তুঁত গাছ জন্মাত। তুঁত পাতা ছিল রেশমবস্ত্র তৈরির প্রধান উপকরণ। ঘরে ঘরে কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটে এবং এ কারণে এখানে প্রচুর রেশমবস্ত্র তৈরি হতো। এখানকার রেশমবস্ত্র উৎপাদনের ঐতিহ্য দুই হাজার বছরেরও অধিক পুরানো। এখানকার রেশমবস্ত্র গ্রিক ও রোমান সম্রাটরা পরিধান করতেন। এছাড়া দিল্লি, আগ্রা, কাশ্মীর ছাড়িয়ে প্রতিচ্যের বড় বড় শহর, লন্ডন, আমস্টারডাম, প্যারিসের ললনাদের আকর্ষণীয় পরিধেয় ছিল রেশমবস্ত্র। মুঘল দরবারে রেশমবস্ত্র উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হতো। ঢাকাই মসলিনের পরেই সমাদৃত ছিল মালদার রেশমবস্ত্র।
ইংরেজদের ভারতে আসার আগে থেকে মালদা বস্ত্র ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। এখানেই সর্বপ্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৭৬ সালে রেশম ব্যবসা শুরু করে। মালদা প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হলেও প্রধানত তিনটি স্থান-সাহাপুর (মালদার সন্নিকটে), শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার দুই উপজেলা) থেকে উৎপাদিত রেশমবস্ত্র সেখানে বাজারজাত করা হতো। অর্থাৎ এই দুই স্থান ছিল প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। দেশ বিভাগের পর প্রাথমিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও সদর উপজেলার কিছু স্থানে পুনরায় রেশমবস্ত্রের উৎপাদন শুরু হয় এবং হৃত গৌরব প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯৬২ সালে রাজশাহীতে একটি রেশম কারখানাসহ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর সেখানে ১৯৭৭ সালে রেশম বোর্ড গঠন করা হয়। কিন্তু উভয়েই কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই কারখানায় উৎপাদিত রেশমবস্ত্র গুণে-মানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সমকক্ষ ছিল না এবং কাক্সিক্ষত উৎপাদনে কোনো সফলতা বা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু বিরাট ক্ষতি ও সুনাম ক্ষুণœ করে সে সময়ের মহকুমা চাঁপাইনবাবগঞ্জের। শিবগঞ্জ-ভোলাহাটে উৎপাদিত রেশমবস্ত্র রাজশাহী সিল্ক নামে বাজারজাত করা হয়। গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে ভোলাহাটে উন্নতমানের রেশমবস্ত্র উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও রাজশাহী জেলার নামে জিআই নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। আরো একটি কৃষিপণ্য লাক্ষা। একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় উৎপন্ন হয়। দেশে আর কোনো স্থানে লাক্ষার উৎপাদন হয় না। একসময় প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হলেও বর্তমানে সেই রমরমা অবস্থা আর নেই, তবে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। এটিও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিজস্ব পণ্য। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হলেও বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক।
আম প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ পূর্বে মালদা জেলার অংশ হিসেবে আড়াই হাজার বছরের আমচাষ ও বিপণনের ঐতিহ্য বহন করে। সে সময় থেকে বর্তমানেও বড় বড় আমবাগান, এমন কী একক ব্যক্তিমালিকানায় একশ’-দেড়শ’ বিঘার বাগান এখনো বিদ্যমান। দেশ বিভাগের আগে ও পরে মধ্য আষাঢ়ের পর বারঘরিয়া, কানসাট, রহনপুর, ভোলাহাট থেকে নদীপথে ৪০০-৫০০ মণ আমভর্তি প্রচুর নৌকা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে বাজারজাত করার জন্য ঢাকুয়ালরা (ঢাকার আম ব্যবসায়ী) ছুটে আসত। তার আগে নৌকায় কলকাতায় নেয়া হতো। বর্তমানে উন্নত সড়ক অবকাঠামোর সুবাদে বাগান বা আড়ৎ থেকে ট্রাকযোগে আম দেশের অধিকাংশ জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। দেশের বৃহত্তম আমের বাজার বা ব্যবসা কেন্দ্র হচ্ছে কানসাট, যেখানে মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ আম কেনাবেচা হয়।
ফলে দেশভাগ এবং স্বাধীনতার পর এককভাবে আম উৎপাদন ও বিপণনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। দেশভাগের পূর্ব থেকে রাজশাহী পুরোনো জেলা হলেও আমচাষের প্রচলন সেভাবে ছিল না। যৎসামান্য চাষাবাদ হলেও খ্যাতি লাভ করেনি। সমসাময়িক কালে সেখানে আমের চাষাবাদ বাড়লেও ফজলি বাগান ও উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি, সাম্প্রতিককালে সেখানে উৎপাদন সব ধরনের আমসহ কমবেশি ৪০ হাজার টন। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত বছরেরও অধিক ফজলি আমের বাগানের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান এবং মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭%। দেশের পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলায় ফজলি মালদহি আম হিসেবে বয়স্কদের নিকট পরিচিত। যেহেতু ফজলি ও আশ্বিনা দেরিতে বাজারজাত করা হয়, সে কারণে এ জেলায় ফজলি শ্রাবণ মাস এবং আশ্বিনা ভাদ্র মাসেও গাছে ঝুলে থাকে এবং এ সময়ে দেশের অভ্যন্তরে অন্য কোথাও গাছে আম থাকে না।
সুইডেন প্রবাসী ও ব্যবসায়ী বদরুদৌজা নাচোলের লোক। তিনি ২০১৩ সালে নাচোলের এক বাগান থেকে সুইডেনের মতো পশ্চিমা দেশে সর্বপ্রথম মানসম্মত উপায়ে সীমিত পরিমাণে আম রপ্তানি করেন। পরের বছর থেকে ইউরোপের বৃহত্তর বাজারে দেশ থেকে রপ্তানি শুরু হয় এবং মাঝে একাধিক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়।
২০১৭ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হঠকারী সিদ্ধান্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ অঞ্চলের আম রপ্তানি থেকে বঞ্চিত করা হয়। সে সময় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আম রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। মেহেরপুর নিবাসী এক কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তা সে জেলার রপ্তানিযোগ্য আম গ্রহণযোগ্যতা লাভে ব্যর্থ হবার প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা করে দেশে কোনো রপ্তানিযোগ্য আম নেই। ফলে সে বছরে এতদঞ্চলের ৮ কোটি আম রপ্তানি করতে ব্যর্থ হয়।
মাত্র ৩০ হাজার টন উৎপাদন সক্ষম সাতক্ষীরা জেলার ব্যবসায়ীরা স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অসাধু পন্থা যথা আঁটি পোক্ত না হওয়া সত্ত্বেও কৃত্রিম উপায়ে আমের রঙ হলুদ করে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করে। এ ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালের মে মাসের মাঝামাঝির পর। এখানেও ছলনার আশ্রয় নেয়া হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহীর আম হিসেবে এগুলো রপ্তানি করা হয়েছিল।
রপ্তানিকৃত সমস্ত আম ফেরত আসে এবং আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে আম রপ্তানি। এ সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ৮ কোটি আম রপ্তানির উদ্দেশ্যে পরিচর্যা করা হয়, এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেই ছিল সাড়ে ছয় কোটি। দেশের সব ধরনের গণমাধ্যম সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তর কর্মকর্তাদের অপকর্মের কার্যকলাপ প্রধান শিরোনাম হয় ও সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে ওঠে।
দেশভাগ রাজশাহীর জন্য শাপে বর হয় এবং কপাল পুড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার। শিবগঞ্জ-ভোলাহাটের আম রাতারাতি রাজশাহীর আম নামে দেশে পরিচিতি লাভ করে, সে ধারা আজও আংশিক বিদ্যমান। রেশমের মতো শিবগঞ্জের চমচম, মহারাজপুরের বিখ্যাত তিলের খাজা রাজশাহী নামে এখনো দাবি করে। মহারাজপুরের তিলের খাজা একসময় লন্ডনে রাজদরবারে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। ফলে এসবের দাবিদার হয়ে বসল রাজশাহী, তবে এখনো বাকি রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সূচিশিল্প সুজনীকাথা, লাক্ষা ও কালাই রুটি। এ সবকিছু চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থান, ভূপ্রাকৃতিক গঠন, জলবায়ু, আবহাওয়া ইত্যাদি আবহমানকাল থেকে সুমিষ্ট আমচাষের উপযোগী। অন্যদিকে এ জেলার মনোলোভা ও বিখ্যাত গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা আমে রয়েছে নিজস্ব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য। ফলে ফজলি, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আশ্বিনা আমের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বীকৃতি লাভের দাবিদার। তবে যুগের প্রয়োজনে উন্নতমানের আমচাষের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে এ জেলাতেই একটি Mango Research Institute প্রতিষ্ঠা করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। জাতীয় স্বার্থে এটি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
সর্বোপরি আমের গুণগত মান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কীটনাশক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাগানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেচ সীমিত করা, নতুন জাত উদ্ভাবন ও গবেষণার পরিধি বাড়ানো, ফ্রুট প্রোটেক্টিং ব্যাগের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য ‘জাতীয় আম নীতির’ প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ফজলিসহ গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আশ্বিনা আমের জেলা ব্র্যান্ডিয়ের একমাত্র দাবিদার চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এই জেলার জনগণের সাথে আমের হার্দিক সম্পর্ক ছাড়াও রয়েছে গভীর সংস্কৃতিক বন্ধন। গণমানুষের চাওয়া পাওয়া, জীবন জীবিকা, আশা-ভরসার প্রতীক, কুটুম্বিতা রক্ষার প্রধান উপকরণ আম। এ কারণে মেয়ের বিয়ে দেবার পর ঘটা করে ব্যাভার পাঠাতে হয় নতুন বা পুরাতন বেহাই বাড়িতে। ব্যাভার উপকরণের সিংহভাগ হচ্ছে আম। এ জেলার ঘরে ঘরে তৈরি হয় আমসত্ত্ব, আমচুর ও নানা ধরনের আচার। এগুলো বছরজুড়েই খাবার প্রচলন রয়েছে। ঢাকার পথেঘাটে যে আমসত্ত্ব পাওয়া যায় সেসব কানসাট ও আশপাশের গ্রামের মহিলাদের সুনিপুণ হাতের পরশে তৈরি। এসব কারণেই জেলায় শত শত বা হাজার বছর ধরে বিরাজমান রয়েছে ‘আম সংস্কৃতি’ এবং এসবই শিকড়ের পরিচয় বহন করে। মধ্যযুগে গৌড়ের ফজলি বিবি যে মনভোলানো আম খাইয়ে অতিথি আপ্যায়ন করেন- সেটি পরবর্তীকালে ‘ফজলি আম’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
পরিশেষে ফজলিসহ গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আশ্বিনা আমগুলোর জিআই পণ্যস্বত্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনুকূলে নিবন্ধনের জন্য জেলা প্রশাসনসহ অত্র জেলাবাসীদের উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।

জাহাঙ্গীর সেলিম : গবেষক ও লেখক