জামায়াত ত্যাগের কৌশল খুঁজছে বিএনপি

82

জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের রাজনীতিতে এ দলটি এখন বিএনপির গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। দেশী-বিদেশী প্রচ- চাপের মুখে বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারছে না, আবার ধরে রাখতেও পারছে না। বরং উভয় দলের মধ্যেই অবিশ্বাস ও সন্দেহ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিএনপির রাজনীতির বর্তমান সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে বিদেশীদের আস্থা অর্জনে জামায়াতকে ত্যাগ করার কৌশল খুঁজছে বিএনপি। খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে বিএনপির হাইকমান্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। বিএনপি সংশ্লিষ্ট একাধিক নীতিনির্ধারক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক মহলে জামায়াতে ইসলামীর ভাবমূর্তি ভালো নয়। তাছাড়া জামায়াতের নীতি-আদর্শকেও আন্তর্জাতিক মহল পছন্দ করছে না। এমনকি বিএনপির চেয়ে জামায়াতের দলের নীতি-আদর্শও সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাছাড়া দু’দলের গঠনতন্ত্র ও কর্মকৌশলের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তারপরও রাজনৈতিক ও ক্ষমতার স্বার্থে পরস্পরের সাথে জোট বেঁধেছিল দুটি দল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতকে ছাড়ার জন্য বিএনপি পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে রয়েছে। জামায়াতকে না ছাড়ার কারণে বিএনপি আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। বরং সরকার জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দায়দায়িত্ব বিএনপির চাপিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির হাইকমান্ড জামায়াতকে ত্যাগের পথ খুঁজতে শুরু করেছেন। সূত্র জানায়, সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী ৯টি দেশ ও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কূটনীতিকরা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কাছে সরাসরি জামায়াতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানতে চায়। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গুরুত্বপূর্ণ দেশের পক্ষ থেকে কোনো রাখঢাক না করেই বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়ার কথা বলা হয়। এমনকি বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের তাগিদ দেয়া হয়েছে বিএনপিকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জুনে বাংলাদেশ সফরকালে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতি রাজনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আলোচনা হবে তার আগেই জামায়াতের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
সূত্র আরো জানায়, জামায়াতকে ত্যাগের বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- সরকার জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেই পারে। তাতে বিএনপিকে আর জামায়াতের সাথে রাজনীতি করার কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না। পাশাপাশি বিএনপি কিভাবে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করবে তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছে বলে পশ্চিমাদের জানানো হয়েছে। কারণ পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিতে জামায়াত সরসারি একটি জঙ্গিবাদ সংগঠন। এ পরিস্থিতিতে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করুক আর নাই করুক বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করবে কিনা তা বিএনপিকেই স্পষ্ট করতে হবে। ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়াও জোটের একটি শরিক দলের দুজন প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে জামায়াতকে ত্যাগের আভাস দিয়েছেন। বেগম জিয়া জোটের ওই নেতাদের জানিয়েছেনÑ আগামী দিনের আন্দোলন হবে একেবারেই শান্তিপূর্ণ। তাতে তৃতীয় পক্ষের কাউকে কোনো রকমের সন্ত্রাস বা নাশকতা করতে দেয়া হবে না।
এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক অন্যান্য দলও জামায়াতের নাশকতার দায় নিতে রাজি নয়। তাদের মতে জোটের ভেতরে এমন কিছু অংশ আছে যারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নাশকতা চালায়। এমনকি সব সময় কুপরামর্শ দিয়ে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের মধ্যে একটি ঝগড়া-ফ্যাসাদ লাগিয়ে নিজেদের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু আগামীতে ২০ দলীয় জোটের রাজনীতিতে ওই চক্রটি এমন সুবিধা আর পাবে না।
অন্যদিকে জামায়াত ত্যাগের বিষয়ে বিএনপির পরিকল্পনার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীও সচেতন রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতা বিএনপির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিএনপিকে দিয়ে এদেশে কোনো আন্দোলনই সফল হবে না। কারণ যে দলের প্রধান তার দলের নীতিনির্ধারকদের বাদ দিয়ে অফিস কর্মচারীদের কথায় দলীয় কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেন সে দলের ভবিষ্যৎ কি হবে তা সহজেই বোঝা যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত-বিএনপি কে কাকে ছাড়ে বা না ছাড়ে তা আগামী কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একজন উপদেষ্টা জামায়াত সম্পর্কে বলেন- জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির পক্ষে আর পথ চলা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকে পরিষ্কার ভাষায় বিএনপিকে জামায়াতকে ত্যাগ করার আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দল জামায়াতকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করে। যা এর আগে করা হতো না। এমনকি ঢাকার বিদেশী কূটনৈতিক কোরের পক্ষ থেকেও জামায়াত সম্পর্কে একই কথা বার বার বলা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান জানান, জামায়াতের সাথে বিএনপির এমন কোনো স্থায়ী বন্দোবস্তু নেই যে সারাজীবন তাদের সাথে রাখতে হবে। রাজনীতিরক ক্ষেত্রে বিএনপিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়েই সব সময় চলতে হবে। বর্তমানে সারাবিশ্বের সেন্টিমেন্ট জামায়াতের বিরুদ্ধে। তারা চায় বিএনপি জামায়াত থেকে দূরে থাকুক। কারণ তাদের দৃষ্টিতে জামায়াত আপাদমস্তক একটি সহিংস দল।