জান্নাতের নাম ও তাৎপর্য

97

20জান্নাত আরবি শব্দ। অর্থ বাগান। জান্নাত শব্দের মৌলিক অর্থ হচ্ছে, গোপন বা আবৃত থাকা। বাগান যেহেতু গাছপালা দ্বারা আবৃত থাকে তাই বাগানকে জান্নাত বলা হয়। আর পরকালের বেহেশ্ত অসংখ্য নিয়ামত দ্বারা আবৃত, তাই তাকে জান্নাত নামে নামকরণ করা হয়েছে।
ইসলামী পরিভাষায় জান্নাত বলা হয় সেই স্থান বা ঘরকে, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের জন্য রেখেছেন, যা দিগন্তবিস্তৃত, এর মধ্যে রয়েছে অফুরন্ত ও অসংখ্য সর্বপ্রকার নিয়ামত, চিরস্থায়ী অনাবিল সুখ-শান্তি ও আনন্দ যার তলদেশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বিভিন্ন ঝর্ণাধারা।
জান্নাত চির শান্তির স্থান। মানুষ ও জিনদের চরম ও অন্তহীন চাওয়া-পাওয়া পরম সুখ-শান্তি এবং ভোগ-বিলাসের অকল্পনীয় পূর্ণতা লাভের একমাত্র স্থান। এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে শেষ করার মতো নয়। তাই রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য (এমন নিয়ামত) প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চু দেখেনি, কোনো কান তা শ্রবণ করেনি এমনকি কোনো মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না’ (বুখারি ও মুসলিম)।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ জান্নাত বোঝানোর জন্য জান্নাতের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় বিভিন্ন শব্দ বা নাম ব্যবহার করেছেন। যেমন-
১. জান্নাতু আদন : আদন অর্থ কোনো স্থানে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বসবাস করা ও চিরঞ্জীব। জান্নাত যেহেতু চিরস্থায়ী আবাস কখনো শেষ হবে না তাই এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- ‘জান্নাতু আদন, তারা তাতে প্রবেশ করবে, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ বয়ে গিয়েছে। তাদের জন্য সেখানে তারা যা চাইবে তাই রয়েছে, এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকিদের পুরস্কার দিয়ে থাকেন’ (সূরা আল নাহল : ৩১)।
২. খুলুদ : খুলুদ শব্দের অর্থ স্থায়ী হওয়া। জান্নাতিরা সেখানে চিরস্থায়ী হবে, কখনো বের হবে না তাই জান্নাতিদের অবস্থার আলোকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘তোমরা তাতে শান্তির সাথে প্রবেশ কর এটাই (খুলুদ) স্থাযড়ত্বের দিন’ (সূরা আল ক্বাফ-৩৪)।
৩. জান্নাতুন নাযড়ম: নাযড়ম অর্থ হচ্ছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, দান নিয়ামত। জান্নাত খাদ্য-পানীয়, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অবাঁধ স্বাধীনতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নিয়ামতে পরিপূর্ণ, তাই নাযড়ম নামে নামকরণ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে নিয়ামাতপূর্ণ জান্নাত’ (সূরা আল ক্বলম : ৩৪)।
৪. জান্নাতুল মাওয়া : মাওয়া শব্দের অর্থ ঠিকানা বা প্রকৃত আশ্রয়স্থল। নেককার ও শহীদদের রূহগুলো এখানে এসে আশ্রয় নেবে, এখান থেকে তারা আর বাইরে বের হবে না। এ জন্য এর নামকরণ করা হয় ‘জান্নাতুল মাওয়া’। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আর যারা ঈমান আনবে ও নেক আমল করবে তাদের জন্য তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া’(সূরা আস্ সাজদা : ১৯)।
৫. দারুস সালাম : এর অর্থ হচ্ছে- শান্তির ঘর। যেহেতু জান্নাতে থাকবে শান্তি ও নিরাপত্তা; সেখানে অশান্তির কিছু থাকবে না। এবং তারা পরস্পরে সালাম বিনিময় করবে। আল্লাহ ও ফেরেশ্তারাও সালাম জানাবে, তাই একে দারুস সালাম বা নিরাপত্তা ও শান্তির ঘর বলে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : ‘আর আল্লাহ (দারুস সালাম) শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন সরল পথের দিকে’ (সূরা ইউনুস : ২৫)।
৬. দারুল মাকাম : দারুল মাকাম অর্থ স্থায়ী আবাসের বাড়ি। জান্নাত হচ্ছে প্রকৃত স্থায়ী আবাসের বাড়ি, এখান থেকে কাউকে কখনো উচ্ছেদ করা হবে না। তাই এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা ফাতিরে বলা হয়েছে ু ‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে (দারুল মাকাম) স্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোনো কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং কোনো কান্তিও আমাদেরকে স্পর্শ করে না’ (সূরা আল ফাতির : ৩৫)।
৭. জান্নাতুল ফিরদাউস : ফিরদাউস এমন বাগানকে বলা হয়, যাতে সব ধরনের গাছপালা এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তা সবই এক জায়গায় এখানে পাওয়া যায়। জান্নাতগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। এ জান্নাতের ওপর আল্লাহর আরশ অবস্থিত। আল্লাহ নিজ হাতে এটি তৈরি করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন : ‘আল্লাহ তিনটি জিনিস নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন : আদমকে তাঁর হাতে সৃষ্টি করেছেন ও তাওরাত নিজ হাতে লিখেছেন এবং ফিরদাউস নিজ হাতে স্থাপন করেছেন’ (দায়লামি)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস’ (সূরা আল কাহাফ : ১০৭)।
৮. দারুল কারার : দারুল কারার অর্থ স্থায়ী আবাস, যার শুরু আছে কিন্তু কোনো শেষ নেই। আখিরাতে বিচার-ফায়সালার পর জান্নাতে বসবাস শুরু হবে আর কোনো দিন তা শেষ হবে না। মহান আল্লাহ বলেন- ‘হে আমার কওম, এ দুনিয়ার জীবন কেবল ণকালের ভোগ; আর নিশ্চয়ই আখিরাত হলো (দারুল কারার) স্থায়ী আবাস’( সূরা আল গাফির : ৩৯)।
লেখক : প্রবন্ধকার