ছন্দকবি রবিউলের ৫০ বছর ধরে জীবন চলে হাতুড়ির ছন্দে

1

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ব্যস্ততম এলাকা মেডিকেল মোড়। এর সংলগ্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দিকে এগোলেই হাতুড়ির টুং-টাং শব্দ কানে ভাসবে যে কারোরই। এখানেই ছন্দকবি রবিউলের কামারঘর। একাগ্রচিত্তে লোহা পিটিয়ে ধাতব বস্তু তৈরি করে চলেছেন। কোনোটার বা করছেন মেরামত। হাতুড়ির ছন্দে তার জীবনেরও ছন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে। পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন ছন্দে ছন্দে কথা বলা। যে কারণে একনামে তার পরিচিতি উপজেলায়।
ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলামের হাতে হাতুড়ি উঠেছে, ১০-১২ বছর বয়সে। দরিদ্র পরিবারের রুটি-রুজির জোগান দিতে তাকে বেছে নিতে হয় কামার পেশাকে। এই পেশায় হাতুড়ি চালাতে চালাতেই জীবনের অঙ্ক কষেছেন, মিলিয়েছেন হিসাবও; একাডেমিক বিদ্যা অর্জন ছাড়া। তবে ভুল করেননি সন্তানদের শিক্ষা দিতে। একমাত্র ছেলেকে রাজশাহীতে রেখে পলেটেকনিকে ইলেক্ট্রনিক্সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং করিয়েছেন। এসএসসি পাস করার পর দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে সুখী এই মানুষটি কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছেন হাতুড়ি চালিয়ে।
ছন্দে ছন্দে কথা বলা রবিউল ইসলামের বাড়ি ভোলাহাট উপজেলার মুশরীভূজা গ্রামে। বাবা শতায়ু আনেস আলী, এখন বিছানায়। বার্ধক্য তাকে চেপে বসেছে। বিছানায় অসার পড়ে থাকতে হয়।
একসময় কামার পেশার জয়-জয়কার থাকলেও যুগের হাওয়ার টান লেগেছে এই পেশায়। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে চাহিদা বাড়ে তাদের। বাকি সময়টা টানাপোড়নের মধ্য দিয়েই জীবন পার করতে হয়। রবিউল বলেন, আয় না থাকলেও ৬২ বছর বয়সেও বাবার পেশা আঁকড়িয়ে আছি। হাতে হাতুড়ি উঠেছে সেই ১০-১৩ বছরে বয়সে। কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, এতটা বছর আগুনে পুড়িয়ে শক্ত লোহাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে চলতে হাঁপিয়ে উঠেছি।
ছন্দকবি জানান, নিজে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও তিন সন্তানকে সাধ্যমতো পড়ানোর চেষ্টা করেছেন। ছেলেকে রাজশাহীতে রেখে ডিপ্লোমা পড়িয়েছেন। দুই মেয়েকেও এসএসসি পাস করিয়েছেন।
জীবনযুদ্ধে লড়াকু সৈনিক রবিউল আক্ষেপ করে বলেন, ভোলাহাট উপজেলার প্রায় মানুষের কাছে আমি ছন্দকবি নামে পরিচিত। ছন্দে ছন্দে কথা বলার মধ্যদিয়ে সারাটা দিন পার করি। গেল মহামারি করোনায় কাজকর্ম বন্ধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। সেই ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তিনি বলেন, নিজের অসচ্ছলতার কথা কাউকে সম্মানের ভয়ে বলতে পারি না। সরকার বিভিন্ন মানুষকে করোনার সময় সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু আমার ভাগ্যে কানাকড়িও জোটেনি। শুনেছি কামারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহযোগিতা দিয়েছেন। সে সহযোগিতা থেকেও বাদ পড়েছি।
সমাজসেবক মো. রৌশন জানান, রবিউল ইসলাম একজন ভালো মানুষ। তাকে ভোলাহাটের প্রায় মানুষ ভালোবাসেন। তিনি সব সময় পরিচ্ছন্ন অবস্থায় চলাফেরা করেন। তাঁর আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও চলাফেরা শিক্ষিত মানুষের মতো। তাকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তার দাবি করেন তিনি।