চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃষির সম্ভাবনা

4

ড. পলাশ সরকার

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত সংলগ্ন জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই জেলায় মোট আবাদি জমি ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৫৬ হেক্টর। বর্তমানে শস্যের নিবিড়তা ২২৭ (%)। একসময় যেখানে শুষ্ক মৌসুমে কিছু রবিশস্য আর বর্ষা মৌসুমে শুধু পাট এবং গভীর বোনা আমন ধানের মতো অনিশ্চিত আবাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে নিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ পরিকল্পনা, উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসলের জাতের প্রবর্তন, বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একসময়ের খাদ্য ঘাটতির চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আজ উদ্বৃত্ত খাদ্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
এ জেলায় মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ মেট্রিক টন এবং খাদ্য চাহিদা ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দানা শস্যের পাশাপাশি ডাল-জাতীয় ফসলেও উদ্বৃত্ত এবং তেল ফসলে চাহিদা পূরণের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
বাংলাদেশের সুমিষ্ট আমের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিখ্যাত। বর্তমানে এ জেলার আমের খ্যাতি দেশের গ-ি পেরিয়ে বহির্বিশে^ ছড়িয়ে পড়েছে। এ জেলায় ৩৭ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে ৩৫০ প্রজাতির আম উৎপাদন হয়। ২০২২-২০২৩ মৌসুমে এ জেলা থেকে ১২টি জাতের ৩৭৬ মেট্রিক টন আম বিশে^র ১৫টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। এ জেলা থেকে আমের পাশাপাশি পেয়ারা, বরইসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও রপ্তানি হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪টি আমের জাত-ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আশ্বিনা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে সনদ পেয়েছে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি এ দুইয়ের বিপরিতমুখী অবস্থান কৃষির অন্যতম চ্যালেঞ্জ। একই সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, বিশেষত খরা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার নানাবিধ কৃষিবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিশেষত অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনার পতিত জমি ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ, কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি কাজে ৭০ ভাগ যন্ত্র ব্যবহার। এছাড়াও কৃষি উপকরণ ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের নিকট সহজলভ্য করে সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এ বছর ৪ হাজার ৫০০ বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছে, যা এ জেলায় পেঁয়াজের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে অন্যদিকে তেমনি কৃষককে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে সহযোগিতা করেছে।
সরকারের প্রণোদনা কার্যক্রম এ জেলার কৃষিকে আরো বেগবান করেছে। গত বছর এ জেলায় বিভিন্ন ফসলের আওতায় ৩৯ হাজার ৪২০ জন কৃষকের মধ্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্যাংকগুলোর সাথে কৃষকের যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৯০০ জন কৃষকের জন্য কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছে।
ফসলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজ করার বিশেষত ফল ও সবজি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে পরিকল্পনা রয়েছে। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে বিশ্ববাজারে সুপার মার্কেটে গ্রহণযোগ্য করার জন্য গ্যাপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আম বাগানগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাগানের পাশাপাশি আন্তঃ ও মিশ্র ফসল হিসেবে বিভিন্ন্ ধরনের ফসল চাষ করা হচ্ছে, যা এ জেলার কৃষিকে স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করছে।
পরিশেষে বলতে চাই, এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মাটি সোনাফলা মাটি। বরেন্দ্র এলাকার রুক্ষ লাল মাটিসহ সব মাটিতেই যে কোনো ফসল ফলানো যায়। এই জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল হচ্ছে আম। এরপরই রয়েছে ধান। সেই সঙ্গে সরিষা, গম, ভুট্টা, পাট ও আখসহ অন্যান্য ফসলও পর্যাপ্ত উৎপাদন হয়। প্রাকৃতিক সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এইসব ফসল ফলাতে কৃষি সম্প্রদারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ