চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আদিবাসী নারী ও শিশুরা

52

উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা

একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান এই পরিস্থিতিতে এখনো বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী অন্য সকল জনগোষ্ঠী অপেক্ষা প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। তারা মানবাধিকার এবং জীবনমানের সার্বিক দিক দিয়ে আজও নানাভাবে বঞ্চিত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাতসমূহের হানাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা। আর এদের মধ্যে দেশের সমতল অঞ্চলের ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন আদিবাসী সর্বাধিক নিগৃহীত জনগোষ্ঠী নারী-শিশু, যারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা অভিঘাতের চরমতম শিকার।
তেমনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ৪নং পার্বতীপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ধর্মপুর গ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষরা রয়েছেন সুপেয় ও নিরাপদ পানির সংকটে এবং স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নাজুক সংকট তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। গোমস্তাপুর উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূগর্ভস্থ পানি বেশি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
ডব্লিউএইচও/ইউনিসেফ জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রামের (জেএমপি) ‘পরিবারের খাবার পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) বিষয়ে ২০০০-২০২২ পর্যন্ত অগ্রগতি : লিঙ্গভিত্তিক বিশেষ দৃষ্টি’ শীর্ষক পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসছে, নারী, শিশু ও মেয়েরা ডায়রিয়া ও তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মতো শুধুমাত্র ‘ওয়াশ’ সম্পর্কিত সংক্রামক রোগের সম্মুখীন হয় না, তারা এর বাইরেও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হয়, কারণ যখন পানি সংগ্রহ বা শুধুমাত্র টয়লেট ব্যবহার করার জন্য তাদের বাড়ির বাইরে যেতে হয় তখন তারা হয়রানি, সহিংসতা ও আঘাতের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আর সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সকল নারী ও শিশুর মৌলিক মানবাধিকার। আর এই পরিষেবাগুলোর অনুপস্থিতির কারণে রোগের সৃষ্টি হয় এবং নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের আমারক গ্রামের নারীরা প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে গিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা এবং ছয় শতাংশ মানুষকে ১ ঘণ্টা থেকে ৩ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয় শুধুমাত্র পানি সংগ্রহের কাজে। এসব পানীয় জলের ৮৫ শতাংশ নারীরা এবং ৪.৭ শতাংশ বালিকারা সংগ্রহ করে থাকে। তাছাড়া নাচোল, গোমস্তাপুর ও পার্বতীপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির স্তর এতটাই নেমে গেছে যে নলকূপ তো দূরে থাকুক কোনো কোনো এলাকায় গভীর নলকূপেও পানি ওঠে না।
সেখানকার নারীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, তাদের নেই ভালো স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা। অনেক সময় সেখানকার মেয়ে ও শিশুদের খোলা জায়গায় গিয়ে মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়, যা সত্যিই ভয়ঙ্কর ও বিব্রতকর। এছাড়াও তারা বলেন, গ্রামের ১০-১৫টি টিউবওয়েলের সবক’টি অকেজো হয়ে পড়েছে, যার কারণে দৈনন্দিন কাজের জন্য গ্রামের খাল-ডোবা বা পুকুরের পচা পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর এতে করে বড়দের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের রোগ-জীবাণুর দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে শিশুরাও বলে জানান তারা।
ধর্মপুর গ্রামের আদিবাসী জনপ্রতিনিধি বিষ্টু মিঞ্চ বলেন, ধর্মপুর গ্রামের প্রায় ১০০টি আদিবাসী পরিবারের ৫শোর এর বেশি মানুষ পানির সমস্যায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগীরা আরো জানান, পানি সংকট আরো বাড়ছে। এখন পানির সংগ্রহে নারীদের প্রায় ২ কিলোমিটার হেঁটে পার্শ্ববর্তী গ্রামে যেতে হচ্ছে। নিরাপদ পানির সুব্যবস্থা করা না গেলে, অদূর ভবিষ্যতে পানির সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। আর তাই এই বিষয়ে ন্যূনতম উদ্যোগ নেবার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
এদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এবং হ্রাসকরণে করণীয় বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূগর্ভস্থ পানি বেশি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। যার কারণে ধর্মপুরের মতো অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানি পাচ্ছে না। তাছাড়া, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মৌলিক পানীয় জলের প্রাপ্যতা থাকলেও এসব পানীয় জলে ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণ থাকে। যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব, পানীয় জলের ১০ শতাংশেরও বেশি উৎসে আর্সেনিকের অবাঞ্ছিত রাসায়নিক দূষণ এবং জলবায়ু সমস্যার ফলে সমুদ্রের জলের অনুপ্রবেশ পানি দূষণের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।
পানির অধিকার মানবাধিকার, কিন্তু কেবল সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায় ও দরিদ্র বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগ তাদের পানির সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। যার ফলে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য একটি উপাদান পানির অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত।
অপরদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের আরো একটি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম কামারজগদইল। এই গ্রামে ২৫ থেকে ২৬টি পরিবারে প্রায় ১০০ জন আদিবাসী সাঁওতাল মানুষের বসবাস। গ্রামের মানুষদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সমস্যা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার সময় সেখানে গিয়ে চোখে পড়ে কামারজগদইল গ্রামের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
গ্রামের নারীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, এই গ্রামের সব থেকে বড় সমস্যা সেখানকার অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং নেই ব্যবহারের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানির সুব্যবস্থা। এমনকি নারীদের মাসিক বা পিরিয়ডের সময় অন্যের টয়লেটে যেতে হয়, তবে সেটিও খুব একটা ভালো নয়। তাই বাধ্য হয়েই তাদের সেখানে যেতে হয়। তারা বলেন, রাতের বেলা খোলা জায়গায়ও টয়লেট করতে হয় তখন অনেক ভয় লাগে, আর আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে যেতেও নিরাপদ মনে হয় না।
খাবার পানির জন্য রয়েছে একটি মাত্র টিউবওয়েল, নেই কোনো ড্রেনেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। দৈনন্দিন কাজের জন্য ব্যবহার করেন গ্রামের কোল ঘেঁষে থাকা পুকুরের ময়লা-আবর্জনাযুক্ত নোংরা পানি। আর এতে করে নানারকম রোগ-জীবাণুতে সংক্রমিত হচ্ছে গ্রামের শিশুরা।
কামারজগদইল গ্রামের গ্রামচিকিৎসক ডা. আমিনুল ইসলামের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, গ্রামের শিশুরা বেশির ভাগ সময়ই অসুস্থ থাকে। তারা পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ, যেমনÑ ডায়রিয়া, জ্বর, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর এর প্রধান কারণ হলো এখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির অভাব, অনিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা না থাকার কারণে এরা খোলামেলা জায়গায় অনেক সময় পায়খানা-প্রস্রাব করে। আর তাছাড়া পাশেই যে বিরাট পুকুরটি আছে, সেই পুকুরের পানিই তারা তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে থাকে। আবার সেই পুকুরে তারা সকল ময়লা-আবর্জনা ফেলে থাকে। এমনকি কোনো পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অস্বাস্থ্যকর টয়লেটের বর্জ্যও গিয়েও পড়ে সেই পুকুরে। আর সেখানকার আদিবাসী নারী-পুরুষ, শিশু থেকে শুরু করে বয়ঃবৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেই সেই পুকুরের পানি ব্যবহার করে দৈনন্দিন কাজের জন্য, যা এখানকার শিশুদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকির কারণ।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের অভ্যাসটি যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে আনতে সফল হয়েছে। তবে, নারী, শিশু এবং মেয়েদের জন্য নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করে পরিষেবাগুলোকে মৌলিক ও নিরাপদে পরিচালিত পয়ঃনিষ্কাশনের পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আর অনিয়ন্ত্রিত পয়ঃনিষ্কাশন কোনো প্রকার শোধন ছাড়াই অপসারণ করার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যা নারী ও শিশুদের ভয়ঙ্করভাবে বিপন্ন করে তুলছে এবং রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
তাই আমাদের পরিষ্কার পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেসব এলাকায় পরিষেবাগুলো অপেক্ষাকৃত কম উন্নত, বিশেষ করে এমন আদিবাসী বা পিছিয়েপড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস এমন এলাকা, শহুরে বস্তি, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা, জলবায়ুজনিত ঝুঁকিতে থাকা এলাকা ও রাসায়নিক দূষণে ভুগছে এমন জায়গা ও জনগোষ্ঠীর ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, সকল শিশু ও নারীর মতো আদিবাসী নারী ও শিশুদের জন্যও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট উপরোক্ত সমস্যার বিপরীতে মানসম্মত স্বাস্থ্যবিধি, জলবায়ুু নিরাপদ গ্রাম, পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা, বিকল্প টয়লেট এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা ও ওয়াশ পরিষেবাগুলোর স্থায়িত্ব শক্তিশালীকরণ করে পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ও মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবা নিশ্চিত করার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবাগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার তিনগুণ বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।