চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মরক্ষার কৌশল শিখছে কিশোরীরা

37

সোনিয়া শীল

পড়ন্ত বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে একঝাঁক কিশোর-কিশোরীর হাত-পায়ের নানা কৌশল আর সেনসির (প্রশিক্ষককে সেনসি বলা হয়) কণ্ঠে ‘সেজেনতাই’, ‘নাওতে’, ‘নো রেই’, ‘কামাতে’ ইত্যাদি নানান শব্দ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জুডো-কারাতে ও বক্সিং একাডেমির তত্ত্বাবধানে এই স্টেডিয়ামে প্রতিদিনই এই শব্দগুলো শুনতে পাওয়া যায় পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই।
কারাতে শিখতে আসা প্রশিক্ষণার্থীদের শারীরিক কসরত আর চিৎকার করা শব্দগুলোই বলে দেয় নিজেকে আত্মনির্ভরশীল, কর্মঠ আর প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে।
আমাদের গৃহে থাকা নারীরা প্রায় সময়ই মারধর, যৌন হয়রানির মতো সহিংসতার শিকার হয়। কখনো স্বামী, পরিবারের সদস্য দ্বারা বা রাস্তাঘাটে বখাটে-ছিনতাইকারীদের দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে বেশি। এছাড়া বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের কারণেও শিশু ও নারীরা নিপীড়নের শিকার হয়।
কারাতের কথা মনে হলে প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে বিখ্যাত কারাতেকা ব্রুস লির চেহারাটি। চীনের কেনপো থেকে বিকাশ লাভ করে এই কারাতে। কারাতে হলো এমন একটি আঘাত করার কৌশল; যা ঘুষি, লাথি, হাঁটু এবং কনুইয়ের আঘাত ও মুক্ত বা খালি হাতের কৌশলের মাধ্যমে করা হয়।
অন্যান্য খেলার মতো কারাতেও শিখছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়েরা। শিশু থেকে তরুণÑ সব বয়সীদের জন্যই এই কারাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
দ্বিতীয় শ্রেণী পডুয়া নূর শামিহা ফাতিন স্নেহা বাবা না থাকলেও তার নানি ও মা তাকে এই প্রশিক্ষণ নিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যাতে নিজের নিরাপত্তা নিজে নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎটা যেন মায়ের মতো না হয়।
স্টেডিয়ামে বসেই স্নেহার নানি পারভীন আক্তারের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার নিজের অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। সংসারে ২ ছেলে আর একমাত্র মেয়ে। সংসারের ভালোমন্দ সব সিদ্ধান্ত আমার স্বামী নেই। আমার স্বাধীনতা বা মতামতটা রান্নাঘর আর সংসারেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু যখন আমার মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া হয় এবং সে স্বামী নিগৃহীত হয়ে ২ বছরের সন্তান নিয়ে ফিরে আসে, তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
পারভীন আক্তার আরো বলেন, আমি ভেবেছি নাতনিকে মানুষ করতে হবে। একদিকে মেয়ের চলে আসা অপরদিকে তার কোলে সন্তান, কি করব, কি হবে এই ভাবনা। এখন মেয়ে আমার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে টুকটাক হাতের কাজ করে। আর স্নেহাকে স্কুলে ও কারাতে একাডেমিতে ভর্তি করে দিয়েছি; যাতে সে নিজে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। এই কারাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্নেহা যশোর এবং ঢাকার মিরপুর ও ধানমন্ডিতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে।
এই কারাতেকাদের আরো একজন শংকরবাটী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মাহফুজা খাতুন বিলাসী। সে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিজের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় একজন কারাতেকা হিসেবে। স্পন্সরশিপ পেলে খেলতে চায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে। তার ভাষায়, প্রতিটা শিশু ও মেয়েকেই যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, সহিংসতা প্রতিরোধ করতে এই কারাতে শেখা প্রয়োজন। চার বছর ধরে সে কারাতে শিখছে।
স্বর্ণজয়ী মাহফুজা খাতুন বিলাসী জানান, আত্মরক্ষার এই কৌশল সে পরবর্তী জীবনেও কাজে লাগাতে চায়।
জেলার প্রথম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জুডো-কারাতে ও বক্সিং একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি ও পরিচালক বাবলু জামান। তিনি নিজে প্রায় ৪০ বছর ধরে এর সাথে জড়িত। তিনি জানান, প্রথম দিকে মেয়েরা আসতে না চাইলেও এখন অভিভাবকরাই বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। অভিভাবকরা মেয়েশিশুদের আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে কারাতে-জুডো ও বক্সিং শিখতে আগ্রহী। আবার ২৪ বছর বয়সের পরেও কেউ কেউ আসছেন শিখতে।
প্রশিক্ষক বাবলু জামান বলেন, এই কারাতেটা যে কেউ শিখতে পারবে। তবে আমাদের জেলায় এখনো অনেক অভিভাবক আছেন, যারা এই কারাতে শেখাতে নিয়ে আসেন আবার নিয়েও চলে যান। অনেকে আবার নারী প্রশিক্ষক চান। যার ফলে মাঝে কিছু দিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠার জন্য আমি আমার স্ত্রী, ৩ মেয়ে, ভাতিজি, স্ত্রীর বোন তাদেরকে কারাতে শেখাই। আমার ৩ মেয়ের পাশাপাশি প্রায় অনেক মেয়েই কারাতে জুডোতে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। প্রায় ৫ হাজার প্রশিক্ষণার্থী এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বেল্ট অর্জন করেছে। অনেকে সেনাবাহিনী, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন জায়গায় কর্মসংস্থান করতে পেরেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের একাডেমির দক্ষ ছেলেমেয়েরা দেশে-বিদেশে কারাতে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও অর্থাভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। সহযোগিতা পেলে আমাদের জেলার ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কারাতে সুনাম অর্জন করতে পারবে।
শুধু আত্মরক্ষা নয় বরং একটি নিরাপদ জীবনের সঠিক পথপ্রদর্শক হিসেবে কারাতে শিখতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও আগ্রহী হচ্ছে। এই একাডেমিতে শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও কারাতে শিখছেন।
অভিভাবকরা বলছেন, সন্তান যাতে অবসর সময়টা কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি আত্মরক্ষাটাও রপ্ত করতে পারে।