চাঁপাইনবাবগঞ্জের নামকরণ যাকে ঘিরে সেই চম্পারাণীর ডেরার খোঁজে

2140

ইমদাদুল হক মামুন ও মোস্তাক হোসেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নামকরণে নবাবগঞ্জের সাথে যে ‘চাঁপাই’ শব্দটি যুক্ত তা এই চম্পাবতীর নাম থেকেই নেওয়া হয়েছে। চম্পাবতী বা চম্পারাণী বা চাঁপা রাণী; এই চম্পা/চাঁপা রাণীকে নবাব সরফরাজ খাঁ (এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে সঠিক বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রমাণের অভাবে। কেউ বলেন নবাব আলীবর্দী খাঁ, কেউ বলেন মুর্শিদকুলি খাঁ) আদর করে ডাকতেন ‘চাঁপাই’ বলে। কারণ তিনিই প্রথম একবার শিকারে এসে এ স্থানটিতে ছাউনি ফেলেছিলেন। তাই পরে নবাবগঞ্জ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।১
চম্পাবতী আসলে মহেশপুরের সন্তান। কেউ বলেন নবাব আলীবর্দী খাঁ, কেউ বলেন মুর্শিদকুলি খাঁ, কেউ বলেন সরফরাজ খাঁ প্রথম মুর্শিদাবাদ থেকে শিকারে আসেন এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়। তখন ‘চাঁপাই’ বা ‘নবাবগঞ্জ’ নাম ছিল না এ এলাকার। আবার কেউ বলেন, “এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহার ভূমি। যার অবস্থান ছিল বর্তমান দাউদপুর মৌজায়।”২ তবে যেই হোক না কেন এ এলাকার চমৎকার মনোরম পরিবেশ আর শিকারের সহজলভ্যতা দেখে অবাক হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে নবাবরা এখানে নিয়মিত আসা শুরু করলেন। নবাবদের আনাগোনা বাড়তে থাকলে এ এলাকাকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে ওঠে। নবাবদের আনাগোনা বাড়তে থাকলে নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে (১৭৪০-৫৬ খ্রিস্টাব্দে) নবাবগঞ্জ নামকরণ হয়।৩
তারপর নবাবরা আরাম আয়েশ আর অবসর যাপনের কথা ভাবলেন। এবার এ এলাকায় আসার রুট কিছুটা পরিবর্তন করলেন। ঘন জঙ্গলে ঢাকা এ এলাকায় মুর্শিদাবাদ থেকে লালগোলা হয়ে বাবুডাইংয়ের রাস্তা ধরে সোজা গোকুল এলাকায় শিকার করতে এলেন। এ এলাকা শিকারের সহজলভ্যতায় বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। এবং মুর্শিদাবাদের এ এলাকার নাম ছড়িয়ে পড়ে।৪ শিকারের সময়টুকু বসবাসের জন্য তারা ভবন নির্মাণ করেন। শিকার করতে এসে গোকুল এলাকায় আবারও নতুন করে তাঁবু গেঁড়েছিলেন। গোকুলকে কেন্দ্র করে তখন আবারও নতুন করে শহর গড়ে উঠে। তখন তারা অর্থাৎ নবাবরা তাদের বাড়তি আরাম আয়েশের জন্য নাধাইয়ে গিয়ে নবাব ভবন নির্মাণ করেন। আর পূর্ণিমার চাঁদ উপভোগ করতে তার পাশে বিশাল দিঘী খনন করেন। যেটি ‘নাধাইয়ের দিঘী’ নামে পরিচিত, কেউ বলছেন ‘নবাব দিঘী’। আর ভবনের অদূরে নির্মাণ করেন আরেকটা ভবন। যেখানে হয়ত রান্নার কাজ হতো আর চম্পাবতীর শয়ন কক্ষ এবং সাজকক্ষও ছিল।
পরিত্যক্ত ও ধ্বংসস্তূপ ঠেলে ভিতরে ঢুকলে ভবনের দেওয়ালে ভালোভাবে লক্ষ করতে দেখা যাবে, পূর্বে রাণীদের সাজকক্ষ যেরকম ছিল অর্থাৎ দেওয়ালে সাজগোজ রাখার জায়গা, ঠিক সেরকম সাজগোজ রাখার জায়গা দেখা গিয়েছে সেই পরিত্যক্ত ভবনের দেওয়ালে। তা দেখে অনুমান করাই যায়, এটি চম্পাবাইয়ের সাজকক্ষ ও শয়নকক্ষ ছিল।
চম্পারাণী একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন যাত্রা, পালাগান বা কবিগানের আসরে গিয়ে তিনি নাচ করতেন। তিনি রূপবতীও ছিলেন। তাঁর ঘুঙুরের শব্দ আর মোহনীয় অঙ্গভঙ্গি; তার সাথে ছিল অপরূপ রূপ। এ তিনের সংমিশ্রণে তার সুনিপূণ নৃত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা এলাকায়। মহেশপুরের অপরূপা নৃত্যশিল্পীর নৃত্যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে পাশের এলাকা গোকুল শহর ও নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকা। এরকম যখন তার নৃত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তখন কোনো এক অলস সন্ধ্যায় নবাবের মহলে বাইজি হিসেবে নাচ দেখানোরও তার সুযোগ ঘটে যায়। চম্পাবতী তার ঢেউখেলানো মন মাতানো নৃত্য দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন নবাবকে। এরপর থেকে তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নবাব মহলেই চম্পাবতীর স্থায়ী আসন হয়ে যায়। তিনি নবাবদের নিয়মিত বাইজিতে পরিণত হন। আর এত অপরূপা বাইজি তো নবাবদের প্রিয়পাত্রীই হবেন তাতে আর সন্দেহ কি!
নবাব সরফরাজ খাঁ তখন নবাব। তিনি তাঁর প্রিয় পাত্রীর নাম অনুযায়ী তাঁকে অমর করে রাখতে এ এলাকার নাম রাখেন ‘চাঁপাই’।
চম্পাবতীর নামানুসারে যে এ এলাকার নাম চাঁপাই হয় তার প্রমাণ আমরা পাই এম ইসলামের ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থ থেকে। তবে এ বিষয়ে অবশ্য অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রদত্ত তথ্য থেকে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাজা লক্ষীন্দরের রাজধানী ছিল ‘চম্পক নগর’। তবে এ চম্পকনগরের সীমানা নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে পণ্ডিতদের মধ্যে। তবে মতভেদ যাই থাকুক না কেন ‘চসাই’ ‘চাঁদপুর’ আর ‘বেহুলা’ গ্রামের সন্ধান আমরা পাই। এ তথ্যের সাথে যোগ হয়েছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের মত। তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ গ্রন্থে লাউসেনের কাহিনীতে ‘চাঁপাই’ তীর্থভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। আর লাউসেনের শত্রুরা ‘জামুতি নগর’ দিয়ে গৌড়ে প্রবেশ করে।৫ এই জামুতিনগর বর্তমান জামবাড়িয়া। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অনেক গবেষক আবার এই ‘চাঁপাই’কে বেহুলার শ্বশুরবাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু লক্ষীন্দরের বাড়ির কোনো অস্তিত্ব এ এলাকায় পাওয়া যায় না। আবার বেহুলা লক্ষীন্দরের কাহিনী মঙ্গলকাব্য থেকে নেওয়া। সেহেতু তার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়। আর যদিও এ এলাকায় বেহুলা লক্ষীন্দরের নাম খুব জড়িয়ে আছে কিন্তু কিংবদন্তি হচ্ছে, এ এলাকায় বেহুলার ভেলা এসে ভিড়েছিল। তাই এখানে চম্পক নগর ছিল এ ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু নাধাইয়ের নবাব মহল, সেখানে পাথরের মঠ, পাথরের শান বাঁধানো পুকুর, পুকুরের নবাবী গেট এসব দেখে ঐতিহাসিক সত্যতার বস্তুগত প্রমাণ দেখা যায়।
নবাবের সেই প্রিয় এলাকা নাধাইকৃষ্ণপুরের সেই ‘নবাব মহল’, রয়েছে আজও। যেখানে চম্পাবতীকে নিয়ে আসরে বসতেন নবাবরা। যদিও সেই ‘নবাব মহল’ আজ ‘কালী মন্দিরে’ রূপান্তরিত। কিন্তু সেই ভবনের সামনের পিলার দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, এ কোনো মন্দিরের পিলার নয়; বাসভবনের পিলার। মন্দিরের মাটিতে কান পাতলে আজও চম্পাবতীর ঘুঙুরের শব্দ শোনা যায়। তারই অদূরে চম্পাবতীর সাজগোজ করার বা বসবাসের ভবন। সেখানে হয়ত নবাবদের জন্য রান্নাবান্নাও হতো। সেই ভবন আজ ধ্বংসস্তূপ। নবাব মহলের আরেকদিকে একটা মঠের মতো স্তম্ভ। যেটি গাছে আর লতাগুল্মে ঢেকে গেছে। তার পাশেই বিশাল দিঘী (এসব আজ ভূমিদস্যুদের দখলে প্রায়)। দিঘীর পাড়ে বসে জ্যোৎস্না উপভোগ করার জন্য রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। কোনো এক অলস সন্ধ্যায় হয়ত নবাবরা চম্পাবতীকে নিয়ে বসতেন এই পুকুর পাড়ে। আর উপভোগ করতেন নানান রকমের মজাদার খাবার আর মনোরম পরিবেশে উজ্জ্বল জ্যোৎস্না। এসবই আজ কল্পনার সাগরে ভেসে চলা অতীত ইতিহাস। তবে কল্পনার সাগরে ভাসলেও ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে।

ড. ইমদাদুল হক মামুন : ইন্সট্রাক্টর (বাংলা বিভাগ), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ; মোস্তাক হোসেন : সহকারী শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ