চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অগ্রগতি

20

সামসুল ইসলাম টুকু

আম এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ শব্দ দুটি একে অন্যের সাথে জড়িয়ে আছে বহু শতাব্দী ধরে; একে অন্যের পরিচয় বহন করে। জেলার নাম না বলেও অনেক জেলাকে চেনা যায়। যেমন চা ও কমলা বললে সিলেট বোঝায়, আনারস বললে মধুপুর বোঝায়, কাঁচাগোল্লা বললে নাটোর বোঝায়, চিরুনি বললে যশোর বোঝায়, সমুদ্র সৈকত বললে কক্সবাজার বোঝায়, সমবায় সমিতি বললে কুমিল্লা বোঝায়। তেমনি আম, রেশম, লাক্ষা, গম্ভীরা, কাঁসা, কালাই রুটি বললে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বোঝায়। এটা কোনো গল্পকথা নয়। এর উজ্জ্বল অতীত ইতিহাস আছে।

আমের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬৩২-৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ভারত ভ্রমণে এসে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণে এসেছিলেন এবং সেখানকার আম খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন ও আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেছিলেন। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে মোগল স¤্রাট আকবর ভারতের বিহার রাজ্যের দারভাঙ্গায় ১ লাখ আমের চারা রোপণ করে একটি উন্নত আমবাগান সৃষ্টি করেন। এই দারভাঙ্গার সাথে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকেই গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত মালদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যাপক হারে আমবাগান সৃষ্টি হতে থাকে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আ¤্রকাননে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদৌলার মর্মান্তিক পরাজয় হয়। সে আ¤্রকাননও ছিল শতাধিক বছরের পুরনো। ১৮০০ সালে মালদহের জেলা কালেক্টর রাজভেনস সরকারি কাজে সীমান্তবর্তী গৌড় নগরীতে আসেন। কালেক্টরের আগমনের কথা শুনে গৌড়ের এক কুঠিতে বসবাসরত জনৈক বৃদ্ধ ফজল বিবি তার কাছে আমের উপঢৌকন নিয়ে যান। সেই আম খেয়ে আমের নামকরণ হয় ‘ফজলি’, যে ইতিহাস সর্বজনবিদিত।
মালদহ বা গৌড়ের যত বড় বড় আমবাগান ছিল মালদহের দক্ষিণাংশে তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমন্তবর্তী এলাকায়। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ইতিহাস ৬০০ বছরের পুরনো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপর পূর্ব বাংলার অন্যান্য স্থানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সম্প্রসারণ ও বিস্তৃতি।
১৯৬০ সালে দশ বছর বয়সে গৌড়ের পিরোজপুরে আমার ছোট ফুফুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পথে দেখেছিলাম বিশালকায় গাছের বড় বড় সব আমবাগান। কাঁচা-পাকা প্রচুর আম পড়ে থাকত গাছের তলায়। খাওয়ার লোক পাওয়া যেত না। কারণ তখন জনবসতি ছিল দূরে দূরে। বাগানগুলো ছিল বন-জঙ্গলে ভরা, সুনসান, জনমানবশূন্য। একা কেউ কখনো বাগানে প্রবেশ করত না। ফুফু বলতেন, এগুলো কমপক্ষে ১০০ বছরের পুরনো আমবাগান।
এত পুরনো আমগাছ ও বাগান বাংলাদেশের কোথাও নেই এবং দুই শতাধিক জাতের আম শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জেই সম্ভব। দেশের অন্যান্য আমসমৃদ্ধ জেলাতে ২৫/৩০ জাতের বেশি আম পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজও প্রচলিত আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের সাথে। তাহলো, অন্য যে কোনো জেলার মানুষ প্রথম আলাপেই মন্তব্য করেন, আমের দেশের লোক, তা আপনার কত বিঘা আমবাগান আছে?
আর বর্তমান আমসমৃদ্ধির যুগেও কয়েকটি জেলার আমের ডালা রেখে যদি কোনো গ্রাহককে কিনতে বলা হয়, তাহলে প্রথমেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ডালাটাই কিনবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম সম্পর্কে এর চেয়ে বড় মূল্যায়ন ও প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না। এসব ঐতিহাসিক যুক্তি ও বাস্তবস্মমত উদাহরণ প্রমাণ করে আমের রাজধানীর স্বীকৃতির কোনো বিকল্প নেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া।
দেশ ভাগের পরও প্রায় দশ বছর পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের অন্যত্র পরিবহনের একমাত্র পথ ছিল জলপথ বা বড় বড় নৌকা। আম তখন ঝুড়িবন্দি করা হতো না। কোনো প্যাকেট ছাড়াই নৌকার পাটাতনে ঢালা আম পরিবাহিত হতো হাজার হাজার মণ। এরপর রাস্তাঘাট হলে স্থলপথ তথা ট্রাকে এবং সাম্প্রতিককালে রেলপথ ব্যাবহার করা হচ্ছে । মৌসুমি ফল হিসেবে আমের চাহিদা দেশব্যাপী। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে আমের ওপর নির্ভরশীল। জেলার অন্তত অর্ধেক মানুষ আম উৎপাদন বিপণন ও পরিবহনের সাথে জড়িত, সেই যুগ থেকেই।
আম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা জলবায়ু মাটি সবচেয়ে উপযোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ বলে স্বীকার করেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। আমের ওজনে ঢলতা নেয়া প্রথা আজও চালু আছে। অর্থাৎ ৪০ কেজিতে ৫০ কেজি। এ এক সামন্ততান্ত্রিক প্রথা চালু আছে। বাগানে গিয়ে যারা আম কেনে এসব বজ্জাত ফড়িয়ারা বাগানমালিককে বিভিন্ন কায়দায় চাপে ফেলে এই ঢলতা নেয়া চালু করে। আমের আড়তগুলোতেও ছোট আম বা ক্যাট আমের অজুহাতে আমের ঢলতা নেয়া হয়। এ ব্যাপারে সাম্প্রতিককালে আপত্তি উঠেছে এবং এই কুপ্রথার বিলোপ চেয়ে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মানুষও ক্রমে সচেতন হচ্ছে। একসময় হয়তো এ প্রথা বন্ধ হয়ে যাবে।
আমের উৎপাদন প্রচুর বৃদ্ধি হলেও আমবাজারগুলো বৃদ্ধি হয়নি। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতার এত ভিড় হয় যে, যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের বড় বড় আমবাজার ভোলাহাট, রহনপুর, কানসাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাজারকে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন ।

আমের জিআই স্বীকৃতির লড়াই
প্রায় দশ বছর ধরে বেশ কিছু জেলায় আমচাষ শুরু হয়েছে। যে সূচনাই হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন নার্সারি থেকে অথবা উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের উদ্ভাবিত নতুন জাতের আমের চারা নিয়েই। তারাই এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ঈর্ষার চোখে দেখতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, উৎপাদন সামান্য কিছু বেড়েছে বলে নিজ জেলাকে আমের রাজধানী দাবি করছে। আদি ও উৎসকে অস্বীকার করতে চাইছে। এ অজ্ঞতা উগ্র আঞ্চলিকতার প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। তাতে পিতৃ-মাতৃপরিচয় ছিন্ন করা যায় না।
সাম্প্রতিককালে জেলা প্রশাসন থেকে প্রকাশিত ‘ম্যাংগোপিডিয়া’ বইয়ে কৃষিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিভাগীয় কমিশনার সকলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী উল্লেখ করে বাণী প্রদান করেছেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অজ্ঞাত কারণে আটকে রয়েছে।
২০১৭ সালে জেলাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পক্ষে খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমের জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। এতে তথ্যগত বিষয়ে সহযোগিতা করে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ। প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি খিরসাপাত আম জিআই স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ ৪ বছর যাবত ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমের জিআই স্বীকৃতির ব্যাপারটি ফাইলচাপা পড়ে আছে।
অন্যদিকে সেইসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুটি বিখ্যাত আম গোপালভোগ এবং ফজলি আমকে জিআই স্বীকৃতির তালিকাভুক্ত করা হয়নি কেন, সেটাও জানা যায়নি। আর এই সুযোগটাই গ্রহণ করে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র। যে কর্মকর্তাগণ কিছুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রেই কর্মরত ছিলেন। তারা ফজলি আমের ইতিহাস ঐতিহ্য ও উৎপাদন সম্পর্কেও পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত ছিলেন। তারপরও ‘বাঘাফজলি’ জাত নাম দিয়ে রাজশাহীর পক্ষে জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে। যেন চাঁপাইনব্বগঞ্জ শুধু একাই জিআই স্বীকৃতি পাবে কেন? রাজশাহীরও কিছু পাওয়া উচিৎ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ওই সকল ফল গবেষণা কর্মকর্তা ও কৃষিবিদের বাড়ি রাজশাহী জেলাতেই। স্বাভাবিকভাবে রাজশাহীর প্রতি তাদের বিশেষ টান থাকতেই পারে। শুধু তাই নয়, খিরসাপাতের জিআই স্বীকৃতি আবেদনের কিছুদিন পরই রাজশাহীর পক্ষে বাঘাফজলি নামে জিআই স্বীকৃতির আবেদনের মধ্যে একটা যোগসূত্র ছিল বৈকি।
যাই হোক, রাজশাহীর ফজলি জিআই স্বীকৃতি লাভ করে ২০২১ সালে। তখন টনক নড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর। বুঝতে পারে খিরসাপাতের জিআই স্বীকৃতি পেয়ে তৃপ্ত না হয়ে অন্যান্য আমের স্বীকৃতির জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হতো। শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পথ ধরতে হলো। জেলার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, প্রশাসনে স্মারকলিপি প্রদান এবং সাংবাদিকরা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখেন। কারণ ফজলি আম একান্তভাবেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের সম্পদ। শুধু তাই নয়, জিআই স্বীকৃতির জন্য যে সকল শর্ত পালন করতে হয় তার শতভাগ পূরণ করতে পারে একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের শর্ত অনুযায়ী ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, উৎপাদন, বিপণনের তথ্য-সংবলিত আপিল আবেদন করা হলো ওই দপ্তরে। জেলাবাসীর পক্ষে ওই আপিল করল কৃষি অ্যাসোসিয়েশন চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আবেদনে উল্লেখ করা হলো, রাজশাহীর পক্ষে জিআই স্বীকৃতি বাতিল করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পক্ষে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য।
ইতোপূর্বেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আমের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। সেক্ষত্রে রাজশাহী তেমন কোনো ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারেনি। তাছাড়া ‘বাঘাফজলি’ নামে যে স্বীকৃতি দাবি করা হয় সে নামে আদৌ কোনো জাতই নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফজলি আম উৎপাদিত হয় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন, অন্যদিকে রাজশাহীতে উৎপাদন হয় মাত্র ২৮ হাজার মেট্রিক টন। স্বাদে গন্ধে মিষ্টতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রাজশাহীর চেয়ে অনেক ভালো; যা কৃষিবিদরাই বলেন।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে চলতি বছরের ২৪ মে শুনানি সম্পন্ন হয়। বিচারক রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে যৌথভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। যেহেতু রাজশাহীকে পূর্বেই স্বীকৃতি প্রদান করা হয় সেহেতু এটা প্রত্যাহার করতে পারেননি।
এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। তাহলো দেশভাগের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ মালদহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং রাজশাহীর একটি মহকুমা হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৮৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় উন্নীত হওয়ার আগ পর্যন্ত ৩৭ বছর রাজশাহী দাদাগিরি করে এসেছে। তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নিজেদের বলে দাবি করতেই পারে ওই সময় পর্যন্ত। যেমনটা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট থানা রেশমের সূতিকাগার। দেশে মোট উৎপাদিত রেশম সুতার ৬০/৭০ শতাংশই ভোলাহাটে উৎপাদিত হয়। শুধু তাই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, হরিনগর, লাহারপুরে হস্তচালিত তাঁতে বোনা রেশম বস্ত্র দেশখ্যাত আজও। কিন্তু রাজশাহী শহরে গুটিকয় পাওয়ারলুম বসিয়ে ভোলাহাটের সুতা দিয়ে বস্ত্র তৈরি করে সিল্ক সিটি নাম দিয়ে রেশমের জিআই স্বীকৃতি ছিনিয়ে নিয়েছে।
[চলবে]

সামসুল ইসলাম টুকু : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক