চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অগ্রগতি

23

সামসুল ইসলাম টুকু

২.
আম গবেষণাগার ও কার্যক্রম
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সুখ্যাতির কারণেই ১৯৮৫ সালে এখানে আম গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। যেটি ছিল মূলত লাক্ষা গবেষণাগার। লাক্ষা গবেষণা কেন্দ্রটি স্থানান্তর করা হয় কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারে। ৩০ বিঘা জমি বিশিষ্ট এই স্থানে আম গবেষণার কাজ শুরু হয় পুরনো কিছু আমগাছ নিয়ে। এটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা শাখা। ১৯৯০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব ও গবেষণা কেন্দ্র রাখা হয়।
স্থানীয় সাংবাদিকরা এই নাম পরিবর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিউজ প্রকাশ করেন। নিউজে তারা উল্লেখ করেন, এটি একটি ষড়যন্ত্র এবং এখানে শুধু আমের গবেষণা হবে না। অন্যান্য ফল গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা হলো।
বর্তমানে এখানে ৬৫ জাতের প্রায় ৩০০ আমগাছ রয়েছে। ২০০১ সাল পর্যন্ত এখানে ১৪ জন গবেষণা কর্মকর্তার পদ ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমিয়ে ১০ জন করা হয়েছে। কিন্তু কখনোই নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষক কাজ করেননি। বিভিন্ন কারণে বাইরে থেকেছেন। সর্বোচ্চ ৬/৭ জন কাজ করেছেন।
এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে আম চাষের ওপর বিস্তর গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে আমের জাতগত উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি । দীর্ঘ ৩৭ বছরের যাত্রায় এ কেন্দ্রটি আম চাষের উন্নত পদ্ধতি দিয়েছে, আমগাছের পরিচর্যার নতুন নতুন কৌশল শিখিয়েছে, বালাই দমনে বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে আমচাষিদের অবহিত করেছে, সাময়িকভাবে আম সংরক্ষণের জন্য হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি প্রচলন করেছে, একই গাছে অনেক জাতের আম ফলানোর ধারণা দিয়েছে। আর এগুলোর পাশাপাশি ১৭টি নতুন জাতের আম উদ্ভাবন করেছে। গবেষণা কর্তৃপক্ষ যেগুলোকে উদ্ভাবন বলছেন সেগুলো হচ্ছে, বিদেশী জাত এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উপযোগী হলে দেশের জন্য উন্মুক্ত করেছেন, দেশী জাতের সাথে বিদেশী জাতের এবং উদ্ভাবিত জাতের সাথে উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে নতুন জাত উপহার দিয়েছেন; যার নাম দেয়া হয়েছে বারি-১ থেকে বারি-১৭ পর্যন্ত।
এতে দুই ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তাহলো সংকরায়নের জন্য যে দেশী জাত ব্যবহার করা হলো তার নাম মুছে দেয়া হলো। ফলে সেই জাতটি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দ্রুততর করা হলো। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবিত জাতটিকে শুধুমাত্র ‘বারি’ পরিচয় না দিয়ে দেশীয় জাতটির নাম জুড়ে দিয়ে স্বীকৃতি দিলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জীবিত রাখা যেত। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অত্যন্ত ভালো জাতের আম দিলসাদ, কুমাপাহাড়ী, বৃন্দাবনী, সাঠিয়ার ক্যাড়া, কাঁচমিষ্টি, ভাদ্রি, মধুচুসকি, মি¯্রকিান্ত, মোহনভোগ প্রভৃতি জাত নিয়ে গবেষণা উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। এছাড়া আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে গবেষণা এগোতে পারেনি।
পোকার আক্রমণ থেকে আমকে রক্ষার জন্য ফ্রুটব্যাগ একটি উন্নত প্রযুক্তি। তবে এটি আম গবেষণাগারের উদ্ভাবিত কোনো প্রযুক্তি নয়। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে একজন গবেষণা কর্মকর্তার হাত ধরেই চীন থেকে ফ্রুটব্যাগ আমদানি করা হয়। আমসমৃদ্ধ দেশগুলোতে ফ্রুটব্যাগের ব্যবহার গত প্রায় একদশক ধরে হয়ে আসছে। কিন্তু এ বিষয়ে স্থানীয় গবেষকরা আমচাষিদের অবহিত করেননি। বিশেষত যারা ওইসব ফলসমৃদ্ধ দেশে অভিজ্ঞতা নিতে অথবা পিএইচডি করতে গেছেন। ততদিনে ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। যাই হোক, দেরিতে হলেও ফ্রুটব্যাগ নিরাপদ বিষমুক্ত আম উৎপাদনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছে। এতে আমচাষিরা ভীষণ উপকৃত হয়েছে। পূর্বে শুধু পোকার আক্রমণেই প্রায় এক-চতুর্থাংশ আম নষ্ট হয়ে যেত। ২০১৮ সালে প্রথম এই ব্যাগের ব্যবহার শুরু হয় এবং জনপ্রিয়তা পায়। ফলে ২০২১ সালে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই ১২ কোটি ব্যাগ ব্যবহার হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। যার অর্ধেকই ফজলি ও আশ্বিনা। দুটিই নাবি জাতের আম এবং তখনই পোকার আক্রমণ বেশি হয়। এখন অবশ্য সব আমেই ব্যাগ ব্যবহার হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যবহৃত ব্যাগের সংখ্যা যদি ১২ কোটি হয়, তাহলে প্রতিটি ৪ টাকা হিসেবে ৪৮ কোটি টাকার ব্যাগ বিক্রি হয়েছে। তাহলে সারা দেশে অন্ততপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ব্যাগের ব্যবসা হচ্ছে প্রতিবছর।
ফ্রুটব্যাগের ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলের শিশু-কিশোরেরা কাজ পেয়েছে। কারণ গাছের মগডালগুলোতে বড় মানুষ উঠতে পারে না। তাই মই এবং কানাওয়ালা বাঁশ ব্যবহার করে শিশু-কিশোরদের গাছে উঠিয়ে ফ্রুট ব্যাগ পরানো হচ্ছে। এ থেকে শিশু-কিশোররাও আম মৌসুমে প্রতিদিন ২০০-২৫০ টাকা আয় করতে পারে। তবে সেটা ‘শিশুশ্রম’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ফ্রুটব্যাগের বড় সুবিধা হয়েছে যে, ঘন সবুজ রঙের আম আকর্ষণীয় হলুদ রং ধারণ করে। তবে মিষ্টতা কমে যায়। আর কম মিষ্টি আম বিদেশীরা পছন্দ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে, আমরা ৬০/৭০ টাকা কেজি দরে পেয়ারা খাই। সেগুলো পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাতে পেয়ারা দাগমুক্ত করা যায় না এবং তা বিদেশেও রপ্তানি করা যায় না। অথচ আমাদের দেশের পেয়ারার মান ও পুষ্টিগুণ আপেলের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। তাই পেয়ারার জন্য গবেষকরা উন্নতমানের ব্যাগ উদ্ভাবনে মনোযোগী হলে পেয়ারা রপ্তানি করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশেই ফ্রুটব্যাগ তৈরি হচ্ছে, এমনকি চাঁপাইনবাবগঞ্জেও।
ফ্রুটব্যাগ আম রক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে এবং সেইসাথে নতুন ব্যবসার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

অপরিচিত ১০০ জাতের নামকরণ ও বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত বা চিহ্নিত আমের জাত ছিল। আরো অনেক আম ছিল, যেগুলোর নাম বা জাত চিহ্নিত করা হয়নি। এগুলোর মধ্যে আরো ১০০ জাতকে সম্প্রতি চিহ্নিত করে সেগুলোর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে নতুন নামকরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত ‘আমের জাত চিহ্নিত ও নামকরণ কমিটি’ এক বছরের অধিক সময় ধরে এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করেছেন। ১৩ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির মধ্যে ছিলেন কৃষিবিদ, গবেষণা কর্মকর্তা, উদ্যানতত্ত্ববিদ, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সাংবাদিক প্রতিনিধি। শুধু তাই নয়, ১০০টি প্রচলিত এবং ১০০টি নতুনভাবে চিহ্নিত আমের ছবি গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য সংবলিত একটি সুন্দর রঙিন বই “ম্যাঙ্গোপিডিয়া” প্রকাশ করা হয়; যা আমের ইতিহাসে নতুন সংযোজন এবং ফলকেন্দ্রিক এমন প্রকাশনা দেশে এটাই প্রথম।
প্রশাসনের আরো একটি স্মরণযোগ্য কর্ম হচ্ছেÑ ঐতিহাসিক রাজার বাগানকে বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ঐতিহাসিক বিদ্যুৎ আন্দোলন খ্যাত কানসাটের অদূরে আব্বাসবাজারে দুশো বছরেরও পুরনো একটি আমবাগান ছিল; যা রাজার বাগান হিসেবে খ্যাত।
১৮০০ সালে এই এলাকার নীলকর সাহেব মি. হল নীল চাষের পাশাপাশি আমবাগান করার ব্যাপারে উৎসাহী হন এবং ১০০ বিঘা জমির ওপর বিভিন্ন ভালো জাতের আমবাগান করেন। মি. হল এদেশ ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে কোনো এক সময়ে বাগানটি ময়মনসিংহের জমিদার সূর্যকান্ত আচার্যের তিন সহোদরের কাছে বিক্রি করে দেন। যিনি এই এলাকায় ‘কুঁজে রাজা’ নামে পরিচিত ছিলেন। কানসাট বাজারের কাছে তিনি এক বিশাল রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। যার ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি প্রতœতত্ব বিভাগের রক্ষা করা উচিৎ।
দেশ ভাগের পর সেই জমিদার ভারতে চলে গেলে ওই রাজপ্রাসাদসহ আমবাগানটি সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। তখন থেকে প্রশাসনের কর্তারা বাগানের আম প্রতি বছর লিজ দিতেন। বাগানটির সর্বোচ্চ লিজ মূল্য হয় ২০ লাখ টাকা। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ছিল বাগানটির খ্যাতি। কিন্তু বাগানটির পরিচর্যার ক্ষেত্রে প্রশাসনের যেমন কোনো ভূমিকা ছিল না, তেমনি লিজগ্রহীতারাও যতœ নিত না। বরং বহু পুরনো গাছ কেটে সয়লাব করেছে। ফলে বাগানটি আগাছা আর জঙ্গলে ভরে যায় এবং মাদকসেবীর আখড়ায় পরিণত হয়। অন্যদিকে কিছু অবৈধ দখলদার বাগানের জমি দখল করে বাড়িঘর করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সাংবাদিকরা বারবার পত্রিকায় লিখেছেন, এই বাগানটি গবেষণার জন্য উর্বর ক্ষেত্র হতে পারে। ভূমি বিভাগ জনস্বার্থে বাগানটি গবেষণা কেন্দ্রের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের ওই পরামর্শ কোনো কাজে আসেনি। অবশেষে প্রশাসন ভিন্নভাবে হস্তক্ষেপ করে। দূরদর্শী জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগানটির চারপাশে ১০ ফুট উঁচু প্রাচীর ও একটি দৃষ্টিনন্দন গেট নির্মাণ করেন। সেখানে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সাথে পরামর্শক্রমে ভবিষ্যতে আমের মিউজিয়াম করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং নাম দেন ‘বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম’।
বর্তমানে সেখানে ৬০ জাতের ২৫০টি আমগাছ রয়েছে। এই মিউজিয়ামের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম হচ্ছেÑ আমগাছগুলোর জাত চিহ্নিত করে নম্বর ও লেবেল দেয়া, আম জাতগুলোকে সংরক্ষণ করা, বিদেশ থেকে আনা বারোমাসি জাত ও বিলুপ্ত প্রায় জাতের আমগাছ রোপণ করে সত্যিকার অর্থে একটি আমগাছের সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম গড়ে তোলা। মাতৃগাছ থেকে জার্ম প্লাজম প্রক্রিয়ায় এসব জাতকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া। আম থেকে তৈরি আমচুর, আচার, আমতা, জুস, পাল্প প্রভৃতি শিল্পকে বিকশিত করে রপ্তানিকেন্দ্রিক কর্মকা- গতিশীল করা। এখানে আম-সম্পর্কিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত করা; যেন আমের ইতিহাস ও অস্তিত্ব রক্ষা হয় এবং ইতিহাস প্রাণবন্ত হয়, জ্ঞানের প্রসার ঘটে।
সর্বোপরি এই বাগানটিকে ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম বা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এজন্য আম প্রদর্শনী, ট্যুরিস্টদের গাড়ি পার্কিং, থাকার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সহজ প্রাপ্তিসহ সকল সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করা। যেন মিউজিয়ামটি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হতে পারে। তবে এই কাজের গতি কতদিন বহাল থাকবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে ।

[চলবে]

সামসুল ইসলাম টুকু : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক