চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ॥ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আস্থার সংকটে, আম বাগানে নেই প্রাণচাঞ্চল্য

174

13236044_10206382990228710_548824388_n (Small)আমের শহর, আমের রাজধানী যে যেভাবেই বলা হোক না কেন বিপুল পরিমাণ সুস্বাদু আম উৎপাদনের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের খ্যাতি দেশজুড়ে। গোপালভোগ, ক্ষিরসা, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, বৃন্দাবনিসহ বাহারী নামের আমের উৎপাদন হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। আর মৌসুমে আম বাণিজ্যও হয় প্রায় এক-দেড় হাজার কোটি টাকার। কিন্তু গেল বছর জেলার আম বাণিজ্যে নামে ধ্বস। অনেক ব্যবসায়ী হারিয়ে বসেন তাদের পূঁজি। এক দিকে মৌসুম জুড়ে ছিল রমজান মাস অন্যদিকে আম বাজারজাতকরণ শুরুর ক্ষেত্রে প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময় সীমা। গেল বছরের ধাক্কা এখনো যেন রয়ে গেছে জেলার আম বাণিজ্যে। সরেজমিনে এলাকা ঘুরে বিভিন্ন মালিক বা চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, প্রকৃত বাগান মালিকরা তাঁদের বাগান পূর্বের বছরের বিক্রি মূল্যে অর্ধেক দামেও বিক্রি করতে পারচ্ছেননা আম বাগান চাষি বা ব্যবসায়ীদের কাছে। এমন অবস্থায়, এবছর আবারও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আম পাড়ার সময় বেঁধে দেয়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আম চাষী বা ব্যবসায়ীরা। জেলা শহরে কয়েকটি আম বাগান ঘুরে বিষয়টি আঁচ করা গেছে, দেখা গেছে, ব্যবসায় আস্থার সংকটে আম বাগানে নেই কোন প্রাণচাঞ্চল্য।  চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের সোনার মোড় এলাকার আম ব্যবসায়ী আনোয়ার পারভেজ রনি সরকার পাড়া এলাকায় তার বাগানে এই প্রতিবেদককে গত ৪-৫ দিন আগে একটি গাছ থকে পাকা আম পেড়ে দেখান। তিনি বলেন, তার বাগানে গুটি জাতের অন্তত ১০০ টি গাছ রয়েছে, এই গাছ গুলোতে আম পাকতে শুরু করেছে, আগামী ৭ দিনের মধ্যে তা বাজারজাত করণের উপযোগী হবে। এই সময় তিনি বলেন, গতবছর তিনি ৩৪ লাখ টাকার আম বাগানে মাত্র ৪ লাখ টাকার আম বিক্রি করতে পেরেছিলেন। গেল বছরের এত টাকা লোকসানের কারণ হিসাবে তিনি বলেন, প্রশাসন আম পাড়ার সময় বেঁধে দেওয়ায় অধিকাংশ আম গাছেই পেকে পড়ে গেছে, এছাড়াও প্রাকৃতিক কারনেও আমের ফলন কম হয়েছিল। এছাড়া এক সাথে সব আম বাজারে উঠায় ভালো দাম পাওয়া যায়নি। ঐ বাগানি আরও বলেন, এক সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এবার কোন সময় বেঁধে দেওয়া হবে না, আমরা এবার একটু আশাবাদি ছিলাম হয়ত ব্যবসা ভালো হবে, কিন্তু গত কয়দিন আগে শুনলাম ২৫ তারিখের আগে আম ভাঙ্গা যাবে না বলে জেলায় সরকারি সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২৫ তারিখে আম পাড়লে আমি যে গাছের নিচে এখন দাঁড়িয়ে আছি, সেটির অর্ধেক আমই এর আগেই পেকে পড়ে যাবে, ফলে অর্ধেক আম বাজারে তুলতে পারব। এখন আপনি বলেন, আমরা আর্থিক ভাবে কতটা ক্ষতির মুখে পড়ব। তিনি বলেন বাজারে কেউ যদি ফরমালিন দিয়ে আম বিক্রি করে তাহলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যেত, কিন্তু আমাদের গাছের আম পেকে পড়বে আমরা বসে বসে দেখব এটা কি হয়।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর এলাকার আম ব্যবসায়ী তোরাব আলি জানান, গত মৌসুমে প্রশাসনের চাপে আমরা ঠিকমত আম পাড়তে পারেনি ফলে আম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দেড় লাখ টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছিল। এবার এখন থেকেই আম পাকতে শুরু করেছে। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আম ভেঙ্গে বিক্রি করা শুরু করতে না পারলে একশ গাছে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হবে। খাসের হাটের পাক্কু বলেন আমার ৯ শ থেকে এক হাজার মণের আম বাগান কিনেছি, তার মধ্যে প্রায় ৬শ মণ ন্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর ও গুটি হবে আশা করছি। কিন্তু ২৫ মে’র আগে আম না ভাঙ্গার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বো। কারণ, বিভিন্ন জাতের কিছুকিছু গুটি আম এখনই পাকতে শুরু করেছে, তবে এটা ঠিক যে সব ধরনের আম এখনই পাকবে না। যে গাছগুলোতে আগে মুকুল এসছে সে গাছগুলোতে ফলও আগে এসছে আর পাকছেও আগে। বলেন ঐ গাছগুলোতে এখনও আরো ১২-১৩ দিন কি গাছে আম টিকবে, অর্ধেকের বেশি পড়েই যাবে অথবা এলাকার লোকজনের কাছে অল্পমূল্যে বিলাতে হবে। গতবার আমার প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার লোকসান হয়েছিল।
মনাকষা’র আম ব্যবসায়ী আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, সরকারের কাছে আকুল আবেদন, যেন এ সিন্ধান্ত পবিবর্তন করেন। কারণ আমাদের জেলাায় যদি ২৫ মের পর আম ভাঙ্গা শুরু হয়, তাহলে বিরাট ক্ষতির সম্মুখিন হবো আমরা। কারণ বর্তমানে সাতক্ষিরা মেহেরপুরসহ দেশের ২২ জেলায় আম উৎপাদন হচ্ছে ঐ জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে আম ভাঙ্গতে শুরু করেছে, তাঁদের আমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বাজারগুলো সায়লাভ। তারা বর্তমানে হিমসাগর, ন্যাংড়া, গোপাল ভোগ আম মণ প্রতি ২৫-২৬শ টাকা দর পাচ্ছে। আর গুটি আম বিক্রি করছে ১৪-১৫শ টাকা মণ দরে। যা আজ থেকে ১৫দিন পর হিমসাগর, ন্যাংড়া, গোপালভোগ আম মণ প্রতি এক হাজার থেকে ১২শ টাকা মণ দরে এবং গুটি ৮শ থেকে ৯শ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হবে আমাদের। ফলে অনেক বড় ক্ষতি হবে। এসময় তিনি বলেন, তার নিজের কেনা ও বাড়ির প্রায় ৫শ টি আম গাছ আছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই ন্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ ও গুটি। যদি এখন থেকে আম বিক্রি করতে না পারেন তাহলে তিনি আর্থিক ভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শত শত কোটি টাকার আম উৎপাদনের পিছনে প্রান্তিক আম চাষী ও ব্যবসায়ীদের বড় অংকের ঋণ সহায়তা দিয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন ব্যাংক ও সরকারি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গেল বছর ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে এই সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। নতুন করে ঋণ সহায়তা পাচ্ছেন না অনেকে। তবে জেলার সবচেয়ে বড় আমবাজার কানসাট আম বাজার আড়ৎদার সমিতির সভাপতি আবু তালেব বলেন, ২৫ মে পর্যন্ত আম বাজারজাত না করার যে সময়সীমা দেয়া হয়েছে তা ঠিক আছে। এতে ব্যবসায়িদের ক্ষতির আশংকা নেই। ফরমালিন বা কোন কেমিক্যাল দিয়ে যেন কেউ আম পাকাতে না পারে সেজন্য এখন থেকেই প্রকৃত আম ব্যবসায়ি ও প্রশাসনকে নজরদরি করতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বয়োজোষ্ঠ্য ব্যাক্তি যিনি আধুনিক কৃষক হিসাবেও পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা মনিম উদ দৌলা চৌধুরী আম পাকার বিষয়ে খনার বচন উল্লেখ করে বলেন ‘‘আম বৈশাখের শেষ ও জোষ্ঠ মাসের শুরুতেই পাকে। গোপালভোগ আম এখন পাকতে শুরু করেছে, সাধারণ গোপালভোগ আম জোষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহেই বাজার থেকে শেষ হয়ে যায়। প্রশাসনের নির্ধারিত সময় ২৫ তারিখ, মানে আরো ১০ দিন আছে, এই ১০ দিনে আম পেকে পেকে পড়ে যাবে, এটা অন্যায়, এতে কৃষক/ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়বে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ তারিখ যে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে, তা আরো কিছু দিন এগিয়ে নেয়া উচিত ছিল। অন্তত ৫ দিন এগিয়ে ২০ তারিখ নির্ধারণ করলে যুক্তিযুক্ত হত”।
এদিকে গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, এ সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জমির উদ্দীন বলেন, ‘সরকারিভাবে আম পাড়ার তারিখ নির্ধারণে অনেক আম ব্যবসায়ী অখুশি হন। কিন্তু, বাস্তবতা হলো গত দুই দিনে একাধিক আম ব্যবসায়ী আমার কাছে এসেছেন আগাম আম পাকিয়ে কীভাবে বাজারে ছাড়া যায় সেই মেডিসিনের পরামর্শ নিতে।’ ‘তাই জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত’, যোগ করেন এই বিজ্ঞানী ।
সম্প্রতি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির উপস্থাপক হানিফ সংকেতের একটি লেখায় আম পাড়ার সময় নির্ধারণের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত¦ গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হাহিম রেজা বলেন, পাকা আম সংগ্রহের ব্যাপারে কখনোই নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া ঠিক নয়। প্রাকৃতিকভাবে পাকার পরেই আম সংগ্রহ করা উচিত। কারণ, তাপমাত্রা, পরিবেশ, আমের জাত ও অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতের আম পাকে। তাই বিভিন্ন স্থানে এসব আম সংগ্রহ করার সময়েরও তারতম্য ঘটে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নির্ধারিত সময় সিমা বেঁধে দেয়া হলেও, রাজশাহীতে আম পাড়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোন সময় সীমা বেধে দেয়া হয়নি। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দীন এই প্রতিবেদককে জানান, এই ধরনের কিছু করা হয়নি, তবে এলাকা ভিত্তিক আম ব্যবসায়ীদের মোটিভেশন করা হচ্ছে, জাত ভিত্তিক আম পাড়ার সময়েই তাঁরা যেন আম পেড়ে-পরিপক্ক আম বাজারজাত করে।

এই বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থে আলোচনা করেই আগামী ২৫ মে পর্যন্ত আম বাজারজাত না করার জন্য বলা হয়েছে। তবে এই সময়ের আগেই যদি গুটি আম পাকে তবে কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা আছেন তারা দেখে ব্যবস্থা নেবেন। কৃষকের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ করা হবেনা বলে তিনি জানান। তবে তিনি এও বলেন-এখনও ল্যাংড়া বা ফজলি আম পাকার সময় হয় নি-কেউ যেন অন্যকোনভাবে পাকানোর চেষ্টা না করে সেই জন্যই সময় সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যদি করে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকানো রোধের লক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কক্ষে কৃষি কর্মকর্তা, আম বিজ্ঞানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের প্রতিনিধি ও আম ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দবে নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ২৫ মের আগে আম বাজারজাত না করার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২২ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৭ লাখ আম গাছ আছে।
তাই অত্র অঞ্চলের প্রধান অর্থকরি ফসল আম রক্ষায় বা অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনস্বার্থে জেলার আম ব্যবসা কীভাবে গেল বছরের ধকল কাটিয়ে লাভবান হতে পারে সেই দিকে আরো বেশি সুনজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।