ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং কেড়েছে ১৫ প্রাণ ভেঙেছে ১০ হাজার ঘরবাড়ি

4

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তা-বে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিত্রাংয়ের আঘাতে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন।
কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলায় ঘরের ওপর গাছ পড়ে একই পরিবারের তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান মেহেবুব তিনজন নিহতের তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, সোমবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার হেসাখাল গ্রামের একটি ঘরের ওপর বড় গাছ ভেঙে পড়ে। এতে বাবা, মা ও মেয়ে গুরুতর আহত হয়। তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা হলেনÑ নিজাম উদ্দিন (২৮), তার স্ত্রী সাথী আক্তার (২৪) ও মেয়ে লিজা (৪)।
ভোলা জেলার দৌলতখান ও চরফ্যাশন উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তা-বে গাছের চাপায় নারীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেনÑ সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মফিজুল হক (৬৫), দৌলতখান পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের বিবি খতেজা (৮০) ও চরফ্যশন উপজেলার হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের মনির স্বর্ণকার (৩৫)।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা এস এম দেলোয়ার হোসাইন মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সিরাজগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন জানানÑ জেলার সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের পূর্বমোহন ও শিল্পপার্কের মাঝখানে যমুনা নদীর ক্যানেলে সিত্রাংয়ের প্রভাবে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে একটি নৌকা ডুবে যায়। এতে মা ও ছেলের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেনÑ উপজেলার পূর্বমোহনপুর গ্রামের খোকনের স্ত্রী আয়েশা খাতুন (২৮) ও তার ছেলে আরাফাত হোসেন (২)।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল মনসুর জানানÑ সিত্রাংয়ের প্রভাবে গাছ চাপায় দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাতে উপজেলার পাঁচ কাহিনীয়া ও বাঁশবাড়িয়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেনÑ পাঁচ কাহিনীয়া গ্রামের রেজাউল খাঁর স্ত্রী শারমিন বেগম (২৫) ও বাঁশবাড়িয়া গ্রামের হান্নান তালুকদারের স্ত্রী রুমিছা বেগম (৬৫)।
মুন্সীগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ইয়াসিনা ফেরদৌস জানান, সোমবার রাতে লৌহজং উপজেলার কনকসারে ঘরের ওপর গাছ চাপা পড়ে মা আসমা বেগম (২৮) ও মেয়ে সুরাইয়ার (৪) মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল রাজ্জাক গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আছে।
বরগুনা জেলার সদর উপজেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর ইউনিয়নের সোনাখালী বাজার এলাকায় গাছ চাপা পড়ে আমেনা খাতুন নামের এক শতবর্ষীর মৃত্যু হয়েছে। বুড়িরচর ইউপির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির জানান, সোমবার রাত ৮টার দিকে ঘরে বসে ভাত খাচ্ছিলেন আমেনা খাতুন। এ সময় ঘরের পাশে থাকা একটি গাছ উপড়ে তার ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের নিচে চাপা পড়েন তিনি। পরে তাকে মৃত অবস্থায় ঘরের নিচ থেকে উদ্ধার করে স্বজনরা।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী আহম্মেদ জানান, ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
নোয়াখালী জেলার চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেব প্রিয় দাশ জানানÑ সুবর্ণচরে গাছের চাপায় এক শিশু মারা গেছে। নিহত শিশুর নাম স্নেহা (১)। সে ওই উপজেলার পূর্ব চরবাটা গ্রামের হাবিবিয়া গ্রামের অ্যাডভোকেট আবদুল্লার মেয়ে। সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার পূর্ব চরবাটা গ্রামের হাবিবিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ উল আলম জানান, সোমবার গভীর রাতে উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ধ্বজনগর গ্রামে ঝড়ের সময় ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে জয়নাল আবেদীন ভুইয়া নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সে ওই গ্রামের মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাতে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং পরবর্তী সার্বিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও ১ হাজার মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য টিন ও নগদ অর্থ দেয়া হবে। আগামীকাল বুধবার থেকে এ সহায়তা দেয়া শুরু হবে। প্রকৃত ক্ষতির চিত্র জানতে আরো ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে।
এনামুর রহমান বলেন, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জে দুজনকে এ সহায়তা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সুদহীন ঋণ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে দেশে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আমরা তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৭ হাজার আশ্রয় কেন্দ্রে ১০ লাখ মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় শেষে মধ্যরাত থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। সকালের মধ্যে সবাই আশ্রয় কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন।