ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে ব্যস্ত কৃষক এগিয়ে চলেছে বোরো আবাদ

24

আল-মামুন বিশ্বাস

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘন কুয়াশাকে উপেক্ষা করে বোরো আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা। প্রতিদিন শিশিরভেজা ভোর থেকে শুরু করে বোরো চাষাবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। কয়েক বছর ধরে ধানের দাম ভালো পাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
এবার চাঁপইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলায় ৪৯ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর মধ্যে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২৬ হাজার ২৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে রোপণ কাজ অর্জিত হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক বোরো আবাদের পরিসংখ্যান মতে, সদর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৫০ হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ২০৫ হেক্টর, শিবগঞ্জ উপজেলায় ৭ হাজার ৫০ হেক্টরের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর, গোমস্তাপুর উপজেলায় ১৬ হাজার ২০০ হেক্টরের মধ্যে অর্জিত হয়েছে ১১ হাজার ৮৪০ হেক্টর, নাচোল উপজেলায় ৮ হাজার ২০০ হেক্টরের মধ্যে অর্জিত অয়েছে ৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর এবং ভোলাহাট উপজেলায় ৫ হাজার ৮৫০ হেক্টরের মধ্যে অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমি।
এবার নির্ধারিত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ব্রিধান-২৮, ২৯, ৩৬, ৫৭, ৫৮, ৫০, ৬৩, ৮৪, ৮৬, ৮৮, ৮৯, ৯১, ৯২ ও ৯৬; বঙ্গবন্ধু-১০০; জিরাশাইল প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে হাইব্রিড ধানের মধ্যে এসিআই ১, ২; ইস্পাহানি ১, ২; সেচগোল্ড, নবীন ও রুপালি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম এইসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরে উপজেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৭০ মেট্রিক টন। এছাড়া বোরো বীজতলা তৈরি করা হয়েছে ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে উফশী জাতের বীজতলা ১ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে। বীজতলার মধ্যে জিরা ৩৫০ হেক্টর, ব্রিধান-৮১ হচ্ছে ২৩০ হেক্টর, ব্রিধান-৩৬ হচ্ছে ১৮০ হেক্টর, ব্রিধান-২৯ হচ্ছে ৭০ হেক্টর, ব্রিধান ৮৯ হচ্ছে ৬০ হেক্টর, ব্রিধান-৮৪ হচ্ছে ৫০ হেক্টর, ব্রিধান-২৮ হচ্ছে ৩০ হেক্টর, ব্রিধান-৫৮ হচ্ছে ২০ হেক্টর, ব্রিধান-৮৬ হচ্ছে ১৫ হেক্টর, ব্রিধান-৮৮ হচ্ছে ১৫ হেক্টর, ব্রিধান-৯২ হচ্ছে ৯.৯৮৪ হেক্টর, বঙ্গবন্ধু-১০০ হচ্ছে ০.০১৭ হেক্টর জমিতে।
এছাড়া হাইব্রিড জাতের বীজতলা রয়েছে ২০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে এসএলএইটএইচ হচ্ছে ৫ হেক্টর, নবীন ৩.৫ হেক্টর, রুপালি-৭ হচ্ছে ৪.৫ হেক্টর, এসিআই-১ হচ্ছে ৩.৫ হেক্টর, টিয়া হচ্ছে ২.৫ হেক্টর ও তেজগোল্ড ১ হেক্টর জমিতে বপন করা রয়েছে ।
বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, শীতকে উপেক্ষা করে বোরো চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষকরা। অনেকে জমি তৈরি করছেন। কেউ ট্রাক্টর দিয়ে হালচাষ দিচ্ছেন। কেউ নলকূপ বা বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ডিপ থেকে সেচ নিচ্ছেন। আবার অনেকে মাথায় বীজ নিয়ে জমিতে যাচ্ছেন। কেউবা জমিতে জৈব বা রাসায়নিক সার দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঠা-ার মধ্যেও কৃষকদের মাঝে ফুরফুরে মেজাজ দেখা গেছে।
গোমস্তাপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মাঠগুলোতে পুরো দমে চলছে বোরো চাষাবাদের কার্যক্রম।
রহনপুর পৌর এলাকার কৃষক বদিউজ্জামান জানান, রহনপুর পৌর এলাকার কাশিমপুর মাঠে ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন তিনি। তবে ধান রোপণের জন্য শ্রমিক অতিরিক্ত মজুরি নিচ্ছেন। গতবছর জিরা ধান চাষবাদ করে লাভবান হয়েছেন, এবারো সে আশায় আবাদ করেছেন বলে জানান তিনি।
পার্বতীপুর ইউনিয়নের কৃষক রাসেল আলী জানান, এ বছর সার, তেলের দাম বেশি। এছাড়া শ্রমিক মজুরি নিচ্ছে বেশি। তিনি ৭ বিঘা জমি চাষাবাদ করছেন। চলতি মৌসুমে ধানের দাম বেশি হলে এ খরচ পুষিয়ে লাভবান হওয়ার আশা করছেন।
চারা রোপণের শ্রমিক আনিসুর রহমান বলেন, কয়েক বছর করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে আছি। এ পরিস্থিতিতে এলাকায় কাজ খুবই কম। শীতের ভোরে জমিতে কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে। ৪৫০ টাকা মজুরিতে তিনি বিভিন্নজনের জমিতে কাজ করছেন বলে জানান শ্রমিক আনিসুর।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সীমা কর্মকার বলেন, বোরো মৌসুমে এবার বীজতলায় তেমন ক্ষতি লক্ষ করা যায়নি। বীজতলার চারার ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য বীজতলার ওপর সকাল-সন্ধ্যা পলিথিন দিয়ে রাখা, দড়ি দিয়ে শিশির ভাঙ্গা, বীজতলা থেকে বীজ রোপণের পূর্বে বীজতলায় পানি রাখা, রোপণের সময় লাইন, লোগো ও পার্চিং করে ধান রোপণ করার জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেয়া হয়েছে কৃষকদের। এছাড়া বিভিন্ন ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং মাঠ দিবস পালন করা হয়েছে।
এদিকে অধিকাংশ মাঠের জমিতে ধানের চারা রোপণের কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করছেন কৃষকরা। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ১১ হাজার হেক্টরের অধিক জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে।
সীমা কর্মকারের ধারণা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলিত মৌসুমে বোরো ধান লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হবে।