ঘনীভূত হচ্ছে মিসরীয় বিমান নিখোঁজের রহস্য

79

05-Misor

মিসরের নিখোঁজ বিমান নিয়ে ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার গুঞ্জন উঠলেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য কারণ সন্ত্রাসবাদ নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আবার কারপাথোস দ্বীপের কাছাকাছি আকাশে দেখা এক আগুনের কু-লিকেও নিখোঁজ বিমানের ধ্বংসাবশেষ ভাবছেন কেউ কেউ। বিমান থেকে বিপদ সঙ্কেত এসেছিল কিনা, তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি। সবমিলে বিমান নিখোঁজের কারণ-উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা।
এদিকে নিখোঁজ বিমানের সন্ধানে দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাপক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রিসের কারপাথোস দ্বীপ এলাকায় গ্রিস, মিসর, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সেনা ইউনিট একযোগে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্যারিস থেকে বুধবার রাতে ছেড়ে যাওয়া ইজিপ্ট এয়ারের এমএস ৮০৪ ফ্লাইটটি কায়রোর সময় রাত ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিমানটি ফ্রান্সের শার্ল দা গল বিমানবন্দর ছাড়ে বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৯ মিনিটে। কায়রোর স্থানীয় সময় রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটির অবতরণ করার কথা ছিল। এয়ার ইজিপ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, নিখোঁজ হওয়ার আগে বিমানটি ৩৭ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ছিল। ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল দিয়ে ওড়ার সময় এটি নিখোঁজ হয়। বিমানটিতে তিনটি শিশুসহ ৬৬ জন আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন মিসরীয়, ১৫ জন ফরাসি, একজন ব্রিটিশ, দুজন ইরাকি ছাড়াও কানাডা, কুয়েত, বেলজিয়াম, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, সুদান, শাদ ও পর্তুগালের নাগরিক রয়েছেন।
ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার গুঞ্জন
গত বৃহস্পতিবার রাতে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে বলে গুঞ্জন উঠলেও পরে খবরটির সত্যতা পাওয়া যায়নি। গ্রিসের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, নিখোঁজ এয়ারবাস এ৩২০ অনুসন্ধান অভিযান চালানোর সময় সাগরে ভেসে আসা বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। এর আগে গ্রিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন,ক্রিট দ্বীপের ২৩০ মাইল দক্ষিণে কিছু প্লাস্টিকের টুকরা এবং দুটি লাইফ জ্যাকেট পাওয়া গেছে। গ্রিসের বিমান দুর্ঘটনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আথানাসিয়োস বলেছেন, কারপাথোসের কাছে লাইফ জ্যাকেটসহ যেসকল বস্তু পাওয়া গেছে তা এ ৩২০ বিমানের নয়। অথচ গত বৃহস্পতিবার নিখোঁজ হওয়া মিসরীয় বিমানটি এ ৩২০।
সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কা
বিমানটি যখন নিখোঁজ হয় তখন আবহাওয়া ভালো ছিল। গ্রিক বিমান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বলছে, কিয়া দ্বীপ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বিমানটির পাইলটের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তবে পাইলট সে সময় কোনও ধরনের সমস্যার কথা জানাননি। এদিকে বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির চেয়ে সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কাকে জোরালো করে দেখছে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ। ওই বিমানের বিধ্বস্ত অংশ খুঁজে পেতে ভূমধ্যসাগরে যখন অনুসন্ধান তৎপরতা চলছে ঠিক সে সময় মিশরের বিমান পরিবহন মন্ত্রী শেরিফ ফাথি এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সংযোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কায়রোতে মন্ত্রী শেরিফ ফাথি বলেন, ‘পুরো পরিস্থিতি ভালো করে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বিমানটির যান্ত্রিক ত্রুটি থাকার সম্ভাবনার চেয়ে বিমানটির সঙ্গে অন্য কোনও কিছু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেটা সন্ত্রাসী হামলাও হতে পারে। এই বিমান বিধ্বংসের কারণ যদি সন্ত্রাসী তৎপরতা হয়, তাহলে ফ্রান্সকে নিরাপত্তাজনিত ফাঁকফোঁকরের জন্য দায়ী করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি এটা প্রমাণিত হয় যে এই ঘটনাটি ছিল সন্ত্রাসী কাজ, তা হলে আমাদেরকে এটা জানতে এবং মানতে হবে যে এই বিমানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফ্রান্স থেকে, মিসর থেকে নয়।’ এর আগে অক্টোবরে সিনাইয়ের শার্ম আল-শাইখ থেকে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ যাওয়ার পথে একটি রুশ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ আরোহীর সবাই নিহত হন। মস্কোর পক্ষ থেকে পরে বলা হয়,বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ওই বিমান বিধ্বস্ত করা হয়। সেসময় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস সংশ্লিষ্ট সিনাইভিত্তিক একটি গোষ্ঠী হামলার দায় স্বকিার করেছিল।
এদিকে ফ্রান্স বলছে তারা আগে থেকেই কোনও কিছু বলতে রাজি নয়। তবে কোনও ধরনের সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছে না তারা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন বিমানটির সঙ্গে কী হয়েছে তা উদঘাটন করা তাদের দায়িত্ব। এরইমধ্যে মিসরীয় তদন্ত দলের সঙ্গে কাজ করতে তিনজন তদন্তকারী ও একজন প্রযুক্তি উপদেষ্টাকে পাঠিয়েছে ফ্রান্স।
বিমানটি কি আকাশে বিস্ফোরিত হয়েছে?
গ্রিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের খবরে বলা হয়, একটি মার্চেন্ট জাহাজের ক্যাপ্টেন কারপাথোস দ্বীপের ১৩০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে আকাশে আগুনের কু-লী দেখেছেন। খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, স্যাটেলাইট ছবি দেখে এখন পর্যন্ত বিস্ফোরণের চিহ্ন পাননি তারা। তবে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে কোনও ধরনের সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। সেটা হতে পারে যান্ত্রিক ত্রুটি, সন্ত্রাসবাদ কিংবা পাইলটের ইচ্ছেকৃত কর্মকা-।
বিমান থেকে বিপদ সংকেত আসা নিয়ে বিভ্রান্তি
বিমান থেকে বিপদ সংকেত এসেছিলো কিনা সে প্রশ্নেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার দুই ঘণ্টা পর এমএস ৮০৪ ফ্লাইটটি থেকে একটি বিপদ সংকেত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। মিসরের সেনাবাহিনী এ ধরনের সংকেত পেয়েছে বলে জানানো হয়। তবে মিসরের সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এ ধরনের কোনও বিপদ সংকেত পাওয়া যায়নি।গ্রিসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পানোস কাম্মেনোস এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিমানটি সাগরে পড়ার আগে আকাশে দুইবার চক্কর খেয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন।তিনি বলেন, ফ্লাইটএমএস৮০৪ মিসরের আকাশসীমায় প্রবেশ পরপরই ৯০ ডিগ্রি বামে এবং ৩৬০ ডিগ্রি ডানে চক্কর খায়। এরপর বিমানটি ৩৭ হাজার ফুট থেকে নেমে ১৫ হাজার ফুটে উড়তে থাকে এবং রাডার থেকে হারিয়ে যায়।
বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার
গত বছরের নভেম্বরে প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালো করা হয়। এয়ার ইজিপ্টের নিখোঁজ হওয়া বিমানটি সর্বশেষ ফ্রান্সের শার্লস দ্য গল বিমানবন্দর থেকে ছেড়েছিল। আর তাই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখছে ফ্রান্স। এছাড়া বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার আগের ২৪ ঘণ্টায় যেসব বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল সেগুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ওই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরিত্রিয়া ও তিউনিসিয়ায়ও অবতরণ করেছিল বিমানটি। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান