গৌড় নিয়ে গড়িমসি নওদায় বুদ্ধের হাসি

111

15102015-Tahkhana-Complex

গৌড় বাংলা বা গৌড় বঙ্গ শব্দবন্ধ কানে মন্ত্রের মত বাজে। গৌড়, বঙ্গ, পুন্ড্র, বরেন্দ্র, মগধ, রাঢ় প্রভৃতির দুচ্ছেদ্য ইতিহাসই বাংলাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস। গৌড়ের গোড়াপত্তন নিয়ে আলো আঁধারী থাকলেও বলা যায় শশাঙ্কের শাসন আমলেই (৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ-৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ) স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গৌড়ের সূচনা। গৌড়াধিপ শশাঙ্ক থেকে ক্ষমতা বদলের বিভিন্ন ডামাডোলের ভিতর পাল, সেন, পাঠান, সুলতান হয়ে মোঘল শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এই অঞ্চলের উত্থান-পতনের সাক্ষী দূর্গনগরী গৌড়। প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে পরবর্তী প্রায় সহ¯্র বছরে শুধু রাজ্য মাত্র না থেকে সাম্রাজ্য, ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, বৈভব আর সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় গৌড়। কিন্তু ইতিহাস সবসময় সরল রেখায় চলে না। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগের পর গৌড় তথা বাংলা দখল কেন্দ্রীক পুনঃ পুনঃ যুদ্ধ, আত্মকলহ, গুপ্ত হত্যা ও বহুবিধ অনুষঙ্গে গৌড়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর শাসনামল (১৪৯৪-১৫১৯) সহ পরবর্তী মুসলিম শাসকদের শাসনামলে যে সুসংহত, সুরক্ষিত ও সুরম্য দুর্গনগরী গড়ে উঠেছিল ঘন ঘন রাজধানী পরিবর্তনে তথা “গৌড়সে আর তাঁড়সে” এবং গঙ্গার গতি প্রবাহের পরিবর্তন, যুদ্ধ, লুণ্ঠন প্রভৃতি কারণে গৌড় নগরী আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে। “মরার উপর খাঁড়ার ঘা” এর মত ১৫৭৬ এ প্রাদুর্ভাব ঘটে প্লেগ রোগের। প্রায় ১২ লক্ষ লোকের ঘন বসতিপূর্ণ নগরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে মহামারী আকারে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, পরিবেশ ও জলের ভয়াবহ দূষণ, অরাজকতা প্রভৃতি কারণে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয় একদা ঈর্ষা জাগানো, বিষয় বৈভব আর সৌন্দর্যের প্রতীক গৌড় নগরী। প্রাসাদ, বড় বড় অট্টালিকা, সুরম্য উদ্যান, প্রশস্ত সুসজ্জিত রাস্তা, উপাসনালয় পরিত্যাক্ত হয়ে পরিণত হয় পশুপাখিদের অভয় আশ্রমে। পরবর্তী সময়ে গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তন এবং ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ভূমিকম্পে অবশিষ্ট সমূহের অনেকাংশেই বিধ্বস্থ হয়। মাটির প্রকার ও পরিখা বেষ্টিত সুরক্ষিত দূর্গনগরী গৌড়ের পতন ও ধ্বংসের কারণ ছিল তৎকালীন ও তৎপরবর্তী শাসক বর্গের উদাসীনতা, অবহেলা, শোষণ এবং লুণ্ঠন মানসিকতা। নগরীর চারিদিকে মাটির দেয়াল বা গড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহমান জলের ধারার গতিপথ বন্ধ হয়ে যায় বিভিন্ন কারণে। দূষিত হয়ে পড়ে জলরাশি। রাজকার্যে জড়িত আমাত্য, সৈনিক, ব্যবসায়ী, ভাগ্যান্বেষী, সাহিত্য প্রেমী, অভিজাত মুসলিম প্রভৃতি ঘরানার মানুষের আনাগোনা ও পদভারে নগরী তখন জনাক্রান্ত। লক্ষ লক্ষ মানুষের চাপ ও অন্যান্য বাস্তবানুগ কারণে নগরীকে সম্প্রসারিত করা হয়েছিল দক্ষিণপূর্ব বরাবর কোতয়ালী দরজা থেকে বর্তমান বাংলাদেশ অংশে। কিন্তু পরিতাপ ও বিস্ময়ের বিষয় জনস্বাস্থ্য, পয়ঃনিষ্কাশন, পরিবেশ দূষণ, নদী ভাঙ্গন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস পূর্ববর্তী শাসক বর্গের কোন মনোযোগ পায়নি। ঘন ঘন শাসক গোষ্ঠীর পরিবর্তন এবং গৌড়ের ধনরাশি এবং ক্ষমতার প্রতি তাদের নির্লজ্জ আকর্ষণই ছিল এই উদাসীনতা, অবহেলা ও গড়িমসির কারণ। মোঘল, নবাব, বৃটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলেও কিংবদন্তীতুল্য সমৃদ্ধ নগরটির হয়নি যথাযথ মূল্যায়ন বা সংরক্ষণ। পক্ষান্তরে শাসকদের গোচরেই ঘটেছে বড় বড় প্রতœতাত্ত্বিক মর্যাদা ও গুরুত্বের ভবনগুলোর ক্ষতিসাধন। চুরি ও লুট হয়েছে লুকিয়ে রাখা ধনরাশি, ভবনের নির্মান সামগ্রী, ব্যবহার্য উপকরণাদী। ধনসম্পদ, স্বর্ণ ও রোপ্য মুদ্রার আশায় ব্যাপক লুটতরাজ ও ভাগ্যান্বেষীদের যত্রতত্র খনন ও অনুসন্ধান ভাগ্যাহত গৌড়কে ঠেলে দেয় আরও ধ্বংস ও বিরাণভূমির পরিণতি লাভের দিকে। এমনকি নবাবদের কোষাগারে গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে আয়কৃত অর্থ জমার ঘটনাও ছিল সাধারণ। ইংরেজ আমলেও টিকেথাকা স্থাপত্য প্রত্মসম্পদ এবং নগর গৌড় নিয়ে গড়িমসি ছিল রহস্যময়। পাকিস্তান আমলের গুরুত্বহীনতা খুব স্বাভাবিক। তবে মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক প্রাচীন ও প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে উদাসীনতা বেদনা দায়ক। গৌড় নিয়ে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ, গবেষক, ইতিহাসবিদসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিস্ময়বোধক। জনসংখ্যার আধিক্য, নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও নিরাপত্তাজনিত কারণে গৌড় নগরীর সে সময়ের সম্প্রসারিত অংশের প্রায় সবটুকুই বর্তমান বাংলাদেশের অর্ন্তগত। গৌড়ের মূল অংশসহ সম্প্রসারিত অংশের বহু ঐতিহাসিক ও প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশেষ প্রযতœ, সংরক্ষণ এবং অনুসন্ধানের অভাবে নষ্ট হচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলার ইতিহাসের তমাসাছন্ন একটি নাম নওদা। নওদা নদীয়া, নওদীহ বা নোদীয় নামেও পরিচিত। বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়েছিল বখতিয়ার খলজীর নদীয়া দখল ও গৌড় বা লখনৌতি জয়ের মধ্য দিয়ে ১২০৪ বা ১২০৫ খ্রীষ্টাব্দে। তৎকালীন রাজা লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৬) সে সময়ে নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন-এ কথা ঐতিহাসিক ভাবে সিদ্ধ হলেও নদীয়ার অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও গবেষণার বিষয়। কাজী মীনহাজ-ই-সিরাজ রচিত “তবকাত-ই-নাসিরী” গ্রন্থের অনুবাদক, বিশিষ্ট গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়াসহ অনেক প-িতজনের মতে বখতিয়ার খলজি লক্ষণ সেনের যে রাজধানী জয় করেছিলেন তা পশ্চিমবঙ্গের তীর্থক্ষেত্র নবদ্বীপ নয়। বরং তা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর রেল স্টেশনের পূর্ব-উত্তরে অবস্থিত নওদা। গৌড় লক্ষণাবতী থেকে ৩০/৩৫ কিঃমিঃ দূরত্বে অবস্থিত নওদাকে কেন্দ্র করে ১৫/১৬ বর্গমাইল আয়তনের জনপদ বা নগরীর প্রমাণ ও নিদর্শন দেখা যায় মীরাপুর, পাথরপূজা, রহনপুর, ভাগলপুর, প্রাসাদপুরের প্রভৃতি স্থান জুড়ে। হিন্দুবৌদ্ধ যুগে এখানে প্রাচীন নগরী থাকার গবেষকদের মতামত ও ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে ২০০৮ খ্রীষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারী নওদায় উদ্ধারকৃত বুদ্ধের মূর্তি। বরাভয় বা অভয়দান মুদ্রার স্মিত হাস্যের বৌদ্ধ মূর্তিটি নওদার প্রাচীনত্ব ও গুরুত্বকে বাড়িয়ে ইতিহাসের নব-অধ্যায় উন্মোচনের নতুন প্রেক্ষিত তৈরী করেছে। “অজ্ঞাতকুলশীল” বলে রহনপুরের সন্নিকটের নওদার প্রতি অবহেলার জবাব দিতে প্রয়োজন বড় উদ্যোগ ও প্রয়াস। কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্র,বাৎসায়নের কামসূত্র, পাণিনীর ব্যাকরণ, সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্য বা অন্যান্য সূত্রে গৌড়, বঙ্গ, বরেন্দ্র কী গুরুত্বে উল্লেখিত বা আলোচিত হয়েছে তার চেয়ে বড় বিষয় এই অভীধা গুলো বর্তমান বাংলাদেশ তথা গৌড় বাংলা বা গৌড় বরেন্দ্র জনপদের মানুষের মনন ও চেতনে কী অভিজ্ঞান তৈরী করে।
আমাদের তথা এই জনপদের মানুষের প্রয়োজন দেশ ও জাতির পথরেখা চেনার আকাঙ্খা, পূর্ব পুরুষদের জীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য সংগ্রাম আর সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ এবং সর্বদা ক্রিয়াশীল মনন ও সজাগচিত্ত বিকাশে দৈনিক গৌড় বাংলা কাজ করবে পত্রিকাটির জন্মদিনে এই কামনা করি।

লেখক: শিক্ষক ও সাস্কৃতিক কর্মী রহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ