গোমস্তাপুরে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পোসালু উৎসব

39

আল-মামুন বিশ্বাস, গোমস্তাপুর :

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে নবান্নর অংশ হিসেবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পোসালু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। পুনর্ভবা নদী ঘেঁষা রহনপুর পৌর এলাকার বাবুরঘোন মহল্লায় চলে এই উৎসব।  শনিবার দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যদিয়ে পরিণত হয় প্রাণের উৎসবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে নবান্ন উৎসবকে তুলে ধরতে রহনপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিক মমতাজ বেগম এই পোসালু উৎসবের আয়োজন করেন। তাকে এই উৎসবে সহায়তা করেন স্থানীয় গ্রামের নারী ও এলাকার শিক্ষার্থীরা। পুরো এলাকাটিতে ওইদিন উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।
এলাকার শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের প্রিয় শিক্ষিকার কাছে অনুপ্রাণিত হয়ে পোসালু উৎসবে অংশ নিয়েছেন। এর আগের বছরগুলো মমতাজ আপা পিঠা উৎসব করেছিলেন। এবার তিনি পোসালু উৎসব করেছেন। তারা এই উৎসব পালনের জন্য গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, আলু, ডিম, তেল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করেন।
এদিকে গ্রামের নারীরাসহ শিক্ষার্থীরা হলুদ শাড়ি পরে, হরেক রকমের ফুলের মালায় সেজে উৎসবে অংশ নেন।
পোসালু উৎসবে সকালে ঢেঁকিতে ধান ভেঙে চাল সংগ্রহ করা হয়। সে চাল মাটির তৈরি কড়াইয়ে ভাজা হয়। পরে ভাজা চালের সঙ্গে তিল দিয়ে জাঁতায় ভেঙে ভুজাকোটা তৈরি করা হয়। ওই সময় ঢেঁকি ও জাঁতার ছন্দ পরিণতি পায় গীত সংগীতে। পরে নদী থেকে লাইন ধরে কলসে করে পানি ওঠা, রান্নার সময় একসাথে বসে ডিমের খোসা ছড়ানো, এক অন্যরকম আমেজ বিরাজ করে উৎসবে। এছাড়া গ্রামের নারীদের মেয়েলি গীতে শিক্ষার্থীরাও কোমর দুলিয়ে নেচে ওঠেন।
রহনপুর জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হাবিব সাত্তার বলেন, এই উৎসবে অংশ নিতে পেরে বেশ ভালো লাগছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরেছেন মমতাজ বেগম। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে তার ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ভেসে আসছে বলে জানান।
পোসালু উৎসব দেখতে আসা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সজীব জানান, উৎসবটির কথা সকালে শুনেই বাবাকে নিয়ে দেখতে এসেছি। আমি কখনো এসব দেখিনি। ভালো লাগল। তাকে মেয়েলি গীত ভালো লেগেছে। একসঙ্গে খেতে বসে অন্যরকম আনন্দ অনুভূতিও হয়েছে, জানান সজীব।
রহনপুর ইউসুফ আলী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাদিকুল ইসলাম বলেন, নতুন ধানের নতুন চালে হরেকরকম খাবার ও পিঠাপুলিতে মেতে উঠে গ্রামের মেয়েরা। তবে এখন তেমনটা দেখা যায় না। প্রতি বছর মমতাজ বেগম গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্য তুলে ধরে উৎসব পালন করেন। আজ (গতকাল শনিবার) তিনি পোসালু উৎসব করলেন।
রহনপুর পৌরসভার কাউন্সিলর ও ওই গ্রামের বাসিন্দা মোহসিন আলী বলেন, মমতাজ বেগম ও তার সহযোগীদের আমিসহ গ্রামের লোকজন সবসময়ই উৎসাহ দিয়ে থাকি। সেই সাথে তাকে সহযোগিতা করা হয়।
এ বিষয়ে উৎসবের মূল উদ্যোক্তা শিক্ষিক মমতাজ বেগম বলেন, নানা-নানিসহ আত্মীয়স্বজনরা বহু যুগ ধরে পিঠাপুলি বানিয়ে খাওয়াতেন। এ বছর পিঠা উৎসব পালন করা হয়নি। তবে অন্যান্য আয়োজন করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য তুলে ধরতে তিনি এবার পোসালু উৎসব করেছেন। তিনি জানান, গ্রামের নারী-পুরুষসহ ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে এই উৎসব আয়োজনে সহায়তা করেছে। এছাড়া পুরনো খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
পোসালু উৎসবে অংশ নেনÑ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক উপপরিচালক আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস, তাঁর পত্নী রহনপুর জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিক হাবিবা সাত্তার, রহনপুর ইউসুফ আলী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম, মহিপুর কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. শহীদ সারওয়ার আলো, নারী কাউন্সিলর জাহানারা পারভীনসহ অনেকে।